শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে একসময় রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে খেজুরের রস সংগ্রহকে ঘিরে দেখা যেত ব্যস্ততা ও উৎসবমুখর পরিবেশ। কাকডাকা ভোরে রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে বসে কাঁচা খেজুরের রস বিক্রির সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। নগরায়নের আগ্রাসন, অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত রোপণের অভাবে রাজশাহী অঞ্চলে খেজুর গাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে, ফলে বিলুপ্তির মুখে পড়ছে গ্রামীণ এই ঐতিহ্য।
সরেজমিনে রাজশাহীর পবা, কাটাখালি ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যেখানে একসময় রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ খেজুর গাছ ছিল, সেখানে এখন গাছের অস্তিত্ব প্রায় নেই। কোথাও দু-চারটি গাছ দেখা গেলেও সেগুলো অযত্নে পড়ে থাকায় রস সংগ্রহের উপযোগী নয়।
পবা উপজেলার পুড়া পুকুর গ্রামের বাসিন্দা মাইনুল ইসলাম বলেন, আগে ভোরে রাস্তার ধারে কাঁচা খেজুরের রস নিয়ে বিক্রেতারা সারিবদ্ধভাবে বসে থাকত। এখন আধুনিকতার ছোঁয়া আর কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য ইতিহাস হয়ে গেছে। গ্রামে খেজুর গাছ বলতে গেলে নেই।
কাটাখালি পৌরসভার বাসিন্দা আরিফ হোসেন জানান, শীতের সকালে খেজুরের রসের ঘ্রাণ, মিষ্টি রোদ আর কৃষক-কৃষাণির হাসি গ্রামীণ জীবনে প্রাণ ফিরিয়ে আনত। এখন সেই খেজুর গাছই বিলুপ্তির পথে, সঙ্গে দেখা দিয়েছে রসের সংকট।
গোদাগাড়ী উপজেলা ও থানার রাজাবাড়ী এলাকার ডলার বলেন, খেজুরের রস দিয়ে পায়েস-পিঠার উৎসব, গভীর রাতে হাঁড়ি থেকে রস চুরি করে খাওয়ার স্মৃতি এখনো অনেকের মনে অম্লান। কিন্তু মেঠোপথে খেজুর গাছের সারি আর গাছে ঝুলন্ত হাঁড়ির দৃশ্য আর দেখা যায় না।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খেজুর গাছ সাধারণত পরিকল্পিতভাবে রোপণ না করে প্রকৃতির নিয়মেই রাস্তার ধারে বা পতিত জমিতে জন্মাত। এই গাছ দিয়ে জ্বালানি বা আসবাবপত্র তৈরি না হওয়ায় এবং বসতবাড়ির কাছে থাকলে শিকড় দেয়াল ও মেঝে ক্ষতিগ্রস্ত করার আশঙ্কায় অনেকেই গাছ কেটে ফেলেন। এছাড়া অসাধু ব্যক্তিরা সরকারি রাস্তার পাশের খেজুর গাছ কেটে ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করছে। সস্তা হওয়ায় ইটভাটার মালিকরাও এসব গাছ কিনে ব্যবহার করছেন। তদারকির অভাব ও নতুন চারা রোপণ না হওয়াও বিলুপ্তির বড় কারণ।
এ বিষয়ে পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (৩৬তম বিসিএস) মোঃ আব্দুল মান্নান বলেন, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে মানুষ আম, লিচু, পেয়ারা ও অন্যান্য ফলজ গাছ বেশি রোপণ করছেন, কিন্তু খেজুর গাছের চারা রোপণে আগ্রহ নেই। এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার বা বিশেষ উদ্যোগও দেখা যায় না।
তিনি আরও বলেন, বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগ নিলে আবার খেজুর গাছের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব। পবা উপজেলা ও রাজশাহীর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত একটি করে খেজুরের চারা রোপণ করা হলে শিক্ষার্থীরা একদিকে খেজুর ফল পাবে, অন্যদিকে শীতকালে টাটকা রসের স্বাদ নিতে পারবে।
তবে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার আগে নিপা ভাইরাসের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা ও পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে রাজশাহীর গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ খেজুর গাছ ও শীতের রসের ঐতিহ্যকে আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এদিকে, রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী নাটোর জেলায় খেজুর ও আখের রসের সংকটকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ কারখানায় ভেজাল গুড় উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শীত মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বাঘা, চারঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা গোপন কারখানা ও হাট-বাজারে রাসায়নিকভাবে তৈরি গুড়ে সয়লাব হয়েছে বাজার।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র্যাব ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অভিযানে দেখা গেছে, এসব কারখানায় খেজুর বা আখের রস ছাড়াই পরিশোধিত চিনি, কাপড়ের রং, ফিটকিরি, হাইড্রোজ, চুন ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে গুড় তৈরি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি হিসেবে প্লাস্টিক পোড়ানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। জব্দ করা নমুনার পরীক্ষায় বিপজ্জনক রাসায়নিকের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ইব্রাহীম হোসেন জানান, এসব কারখানায় চিনি, রং, হাইড্রোজসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক উপাদান মিশিয়ে গুড় তৈরি করা হচ্ছিল। এসব গুড়ে খেজুর বা আখের রসের কোনো অস্তিত্বই নেই, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি কম দামে ভেজাল গুড় বিক্রি হওয়ায় খাঁটি গুড় উৎপাদকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, যা ঐতিহ্যবাহী গুড় শিল্পের টিকে থাকাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
র্যাব-৫ এর রাজশাহীর উপ-অধিনায়ক মেজর মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এরা মাদকের চেয়েও খারাপ কাজ করছে। ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে গুড় তৈরি করে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, রাসায়নিক দ্রব্যাদি কোনোভাবে স্বাস্থ্যের জন্য না। এটা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকারক।
এ ধরনের ভেজাল গুড় দীর্ঘদিন সেবনে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা, শিশুদের বিকাশগত ব্যাধি এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি ক্ষতি হবে।
সরেজমিনে রাজশাহীর পবা, কাটাখালি ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যেখানে একসময় রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ খেজুর গাছ ছিল, সেখানে এখন গাছের অস্তিত্ব প্রায় নেই। কোথাও দু-চারটি গাছ দেখা গেলেও সেগুলো অযত্নে পড়ে থাকায় রস সংগ্রহের উপযোগী নয়।
পবা উপজেলার পুড়া পুকুর গ্রামের বাসিন্দা মাইনুল ইসলাম বলেন, আগে ভোরে রাস্তার ধারে কাঁচা খেজুরের রস নিয়ে বিক্রেতারা সারিবদ্ধভাবে বসে থাকত। এখন আধুনিকতার ছোঁয়া আর কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য ইতিহাস হয়ে গেছে। গ্রামে খেজুর গাছ বলতে গেলে নেই।
কাটাখালি পৌরসভার বাসিন্দা আরিফ হোসেন জানান, শীতের সকালে খেজুরের রসের ঘ্রাণ, মিষ্টি রোদ আর কৃষক-কৃষাণির হাসি গ্রামীণ জীবনে প্রাণ ফিরিয়ে আনত। এখন সেই খেজুর গাছই বিলুপ্তির পথে, সঙ্গে দেখা দিয়েছে রসের সংকট।
গোদাগাড়ী উপজেলা ও থানার রাজাবাড়ী এলাকার ডলার বলেন, খেজুরের রস দিয়ে পায়েস-পিঠার উৎসব, গভীর রাতে হাঁড়ি থেকে রস চুরি করে খাওয়ার স্মৃতি এখনো অনেকের মনে অম্লান। কিন্তু মেঠোপথে খেজুর গাছের সারি আর গাছে ঝুলন্ত হাঁড়ির দৃশ্য আর দেখা যায় না।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খেজুর গাছ সাধারণত পরিকল্পিতভাবে রোপণ না করে প্রকৃতির নিয়মেই রাস্তার ধারে বা পতিত জমিতে জন্মাত। এই গাছ দিয়ে জ্বালানি বা আসবাবপত্র তৈরি না হওয়ায় এবং বসতবাড়ির কাছে থাকলে শিকড় দেয়াল ও মেঝে ক্ষতিগ্রস্ত করার আশঙ্কায় অনেকেই গাছ কেটে ফেলেন। এছাড়া অসাধু ব্যক্তিরা সরকারি রাস্তার পাশের খেজুর গাছ কেটে ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করছে। সস্তা হওয়ায় ইটভাটার মালিকরাও এসব গাছ কিনে ব্যবহার করছেন। তদারকির অভাব ও নতুন চারা রোপণ না হওয়াও বিলুপ্তির বড় কারণ।
এ বিষয়ে পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (৩৬তম বিসিএস) মোঃ আব্দুল মান্নান বলেন, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে মানুষ আম, লিচু, পেয়ারা ও অন্যান্য ফলজ গাছ বেশি রোপণ করছেন, কিন্তু খেজুর গাছের চারা রোপণে আগ্রহ নেই। এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার বা বিশেষ উদ্যোগও দেখা যায় না।
তিনি আরও বলেন, বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগ নিলে আবার খেজুর গাছের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব। পবা উপজেলা ও রাজশাহীর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত একটি করে খেজুরের চারা রোপণ করা হলে শিক্ষার্থীরা একদিকে খেজুর ফল পাবে, অন্যদিকে শীতকালে টাটকা রসের স্বাদ নিতে পারবে।
তবে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার আগে নিপা ভাইরাসের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা ও পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে রাজশাহীর গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ খেজুর গাছ ও শীতের রসের ঐতিহ্যকে আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এদিকে, রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী নাটোর জেলায় খেজুর ও আখের রসের সংকটকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ কারখানায় ভেজাল গুড় উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শীত মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বাঘা, চারঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা গোপন কারখানা ও হাট-বাজারে রাসায়নিকভাবে তৈরি গুড়ে সয়লাব হয়েছে বাজার।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র্যাব ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অভিযানে দেখা গেছে, এসব কারখানায় খেজুর বা আখের রস ছাড়াই পরিশোধিত চিনি, কাপড়ের রং, ফিটকিরি, হাইড্রোজ, চুন ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে গুড় তৈরি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি হিসেবে প্লাস্টিক পোড়ানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। জব্দ করা নমুনার পরীক্ষায় বিপজ্জনক রাসায়নিকের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ইব্রাহীম হোসেন জানান, এসব কারখানায় চিনি, রং, হাইড্রোজসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক উপাদান মিশিয়ে গুড় তৈরি করা হচ্ছিল। এসব গুড়ে খেজুর বা আখের রসের কোনো অস্তিত্বই নেই, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি কম দামে ভেজাল গুড় বিক্রি হওয়ায় খাঁটি গুড় উৎপাদকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, যা ঐতিহ্যবাহী গুড় শিল্পের টিকে থাকাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
র্যাব-৫ এর রাজশাহীর উপ-অধিনায়ক মেজর মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এরা মাদকের চেয়েও খারাপ কাজ করছে। ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে গুড় তৈরি করে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, রাসায়নিক দ্রব্যাদি কোনোভাবে স্বাস্থ্যের জন্য না। এটা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকারক।
এ ধরনের ভেজাল গুড় দীর্ঘদিন সেবনে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা, শিশুদের বিকাশগত ব্যাধি এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি ক্ষতি হবে।
মোঃ মাসুদ রানা রাব্বানী :