সাভারে পুলিশি অভিযানের সময় পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে মনোয়ারুল হোসেন বকশী (২৯) নামে এক ছাত্রদল নেতার মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) একটি পাঁচতলা ভবনে এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মনোয়ারুলের ভাগনে শাহরিয়ার কবির সৌমিক প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে গত ২৩ জুলাই রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে মিম নামে এক কিশোরীকে নিয়ে সাভারে তার নানা জাফর আলীর বাসায় আসেন। জাফর আলী বিপিএটিসিতে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কর্মরত।
এ ঘটনায় কিশোরীর পরিবার পীরগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় কিশোরীর অবস্থান সাভারের বিপিএটিসিতে শনাক্ত করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে তাকে উদ্ধারে পীরগঞ্জ থানার একটি দল সাভারে আসে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন পীরগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কনক রঞ্জন বর্মণ। তাদের সহযোগিতা করে সাভার থানা পুলিশ।
সাভার থানা পুলিশের ভাষ্য, পীরগঞ্জ থানা পুলিশের দল রাতে বিপিএটিসির নিরাপত্তা প্রহরী জাফর আলীর পাঁচতলা ভবনের বাসায় অভিযান চালায়। এ সময় সাভার থানা পুলিশের সদস্যরা বাইরে অবস্থান করছিলেন। অভিযানে সৌমিক ও ওই কিশোরীকে বাসায় পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে মনোয়ারুল ছাদ থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন।
পরে আহত অবস্থায় মনোয়ারুলকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত মনোয়ারুল হোসেন বকশী ছিলেন জাফর আলীর ছেলে। তিনি পরিবারের সঙ্গে বিপিএটিসির একটি পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলায় বসবাস করতেন। তিনি সাভার থানা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ছিলেন।
তবে ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় প্রতিবেশী রাসেল মনি অভিযোগ করেন, রাতে বিকট শব্দ শুনে বাইরে এসে তিনি ভবনের ছাদে একজন পুলিশ সদস্যকে দেখতে পান। তখন নিচে মনোয়ারুলের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। কয়েক মিনিট পর ওই পুলিশ সদস্য ছাদ থেকে নেমে একটি মাইক্রোবাসে ওঠেন এবং পরে অন্য পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
মনোয়ারুলের বাবা জাফর আলী বলেন, রাতে পুলিশ তাঁর বাসায় নাতি সৌমিক ও মিমকে খুঁজতে তল্লাশি চালায়। তাদের না পেয়ে একজন পুলিশ সদস্য ছাদের দিকে যান। পরে অন্য পুলিশ সদস্যরাও ছাদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে ওই সদস্য দ্রুত নিচে নেমে আসেন এবং অন্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাদের কিছু জানাননি বলেও দাবি করেন তিনি।
ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান বলেন, মনোয়ারুল অত্যন্ত ভদ্র ছেলে ছিলেন। তাঁর মৃত্যু রহস্যজনক। প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে দ্রুত সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, পীরগঞ্জ থানা পুলিশের অভিযানে সাভার থানা পুলিশ শুধু সহযোগী হিসেবে ছিল। সাভার থানা পুলিশের সদস্যরা বাসার ভেতরে তল্লাশিতে অংশ নেননি। তল্লাশি চালিয়েছে পীরগঞ্জ থানা পুলিশের সদস্যরা।
তিনি আরও বলেন, মনোয়ারুল নিচে পড়ে যাওয়ার পর পীরগঞ্জ থানা পুলিশের সদস্যরা সাভার থানাকে কিছু না জানিয়ে কীভাবে ঘটনাস্থল ত্যাগ করলেন, বিষয়টি তাঁর কাছেও বিস্ময়কর। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনার তদন্তে পুলিশের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
অন্যদিকে, পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পীরগঞ্জ থানার এসআই কনক রঞ্জন বর্মণ। তাঁর দাবি, তারা বাসার ভেতরে জাফর আলী ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় নিচে বিকট শব্দ শুনে বাইরে এসে একজন যুবককে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে জাফর আলী জানান, পড়ে যাওয়া যুবকটি তাঁর ছেলে মনোয়ারুল।
ঘটনার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মনোয়ারুল কীভাবে পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে গেলেন এবং ঘটনার সময় সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা কী ছিল—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই এসব প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
প্রতিনিধি :