ঢাকা , শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ , ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মতিহারে গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, পরিবারের দাবি হত্যা দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে মাইনুল হক কে চান সর্বস্তরের মানুষ পীরগঞ্জে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত পীরগঞ্জে কবরের কঙ্কাল চুরি আতঙ্কে আছে উপজেলা বাসী দুর্গাপুর-পুঠিয়ায়: অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রকল্পের আওতায় অটোরিকশা, অটোমিল ও ট্রাইসাইকেল বিতরণ প্রতি ঘরে স্বাস্থ্য শিক্ষা কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠিত নিসচা রাজশাহী জেলা শাখার সাধারন সভা রাজশাহীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্মার্ট ব্যাংকিং প্রসারে কাজ করবে পূবালী ব্যাংক, ভূমিমন্ত্রী কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে মান্দায় আশ্রয়ণ পল্লীর ২’শ পরিবার পানিবন্দি লালপুরে রান্না ঘরে গোখরা সাপের ৩০ বাচ্চা মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে সরকার সবসময় থাকবে-ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু ব্যবসা ও ফ্ল্যাট বিক্রির নামে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, আইনের আশ্রয়ে ভুক্তভোগীরা হযরত আল্লামা মুফতি মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ:) : ইলম ও যুহদের মাকাম-মর্তবায় এ কালের মানুষের জন্যে উপমা হয়ে থাকবেন চলনবিলে বেড়েছে দেশি মাছের আমদানি সিংড়ায় এমপি আনুর নির্দেশনায় হিয়ালা বিলের কচুরিপানা অপসারণ কাজের উদ্বোধন লালপুরে পিতার বিরুদ্ধে কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগ, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার নেকমরদ চৌরাস্তা - মাজার মসজিদ রাস্তাটি যেন এক ‘মৃত্যুফাঁদ’, চরম ভোগান্তিতে হাজারো মানুষ নগরীর ৬ থানা পুলিশের অভিযানে মাদক কারবারি ও সেবনকারী গ্রেফতার ৯ প্যারাগ্লাইডারের পর বিমান বানিয়ে তাক লাগালেন সেই মারুফ ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে বড় ভাইয়ের মৃত্যু

হযরত আল্লামা মুফতি মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ:) : ইলম ও যুহদের মাকাম-মর্তবায় এ কালের মানুষের জন্যে উপমা হয়ে থাকবেন

  • আপলোড সময় : ১১-০৭-২০২৬ ০৭:১৫:০৬ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১১-০৭-২০২৬ ০৭:১৫:০৬ অপরাহ্ন
হযরত আল্লামা মুফতি মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ:) : ইলম ও যুহদের মাকাম-মর্তবায় এ কালের মানুষের জন্যে উপমা হয়ে থাকবেন হযরত আল্লামা মুফতি মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ:) : ইলম ও যুহদের মাকাম-মর্তবায় এ কালের মানুষের জন্যে উপমা হয়ে থাকবেন
প্রথিতযশা ইসলামী চিন্তাবিদ, ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ, আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি’র ইন্তেকাল ব্রিটেনবাসী আলেম সমাজ এবং সাধারণ মানুষের কাছে এক দ্বীনী অভিভাবক হারানোর মতো।

৯১ বছরের এই বিশেষজ্ঞ আলেম ব্রিটেনের বাঙ্গালী বা বাংলাদেশীদের জন্য ছিলেন গর্বের ধন। একজন প্রবীণ আলেমে দ্বীন যিনি ইলম ও আ’মালের চর্চায় ছিলেন অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। ব্রিটেনে বসবাসকারী উলামা সমাজে যাঁর অবস্থান ছিল শীর্ষে। উস্তাদতুল্য এবং অনেকের সরাসরি উস্তাদও ছিলেন তিনি।

২০০১ সনে ইংল্যান্ডে মাত্র পাড়ি জমিয়েছি, অবস্থানস্থল লুটন শহর। আমার শশুর মহুদয়ের কাছে জানতে চাইলাম ‘লেস্টারের ছাহেব’ সম্পর্কে। তখনও আমি জানতাম না তিনি যে তাঁর উস্তাদ। আমার শশুর মাওলানা ক্বারী আব্দুল কাদির ছাহেব সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠ সৎপুর দারুল হাদীস কামিল মাদরাসায় লেস্টারের ছাহেবকে উস্তাদ হিসেবে পেয়েছিলেন। তিনি তাঁকে ফোন করলেন। আমি এই প্রথম লেস্টারের ছাহেবের সাথে কথা বলি। এর পর থেকে লেস্টারের ছাহেব আমার খোঁজ-খবর নিয়েছেন। আমি তাঁকে এক সাদা মনের উদার প্রাজ্ঞ আলেমে দ্বীন মুরব্বী রূপে পেয়েছি।

বাংলাদেশে আমার কর্মস্থল ঢাকায় মাসিক পরওয়ানা পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা কালীন সময়ে (১৯৯২-২০০১) ইংল্যান্ডের যে সম্মানিত আলেম ছাহেবের নাম আমি খুব বেশী করে জানতাম, বিশেষতঃ পরওয়ানা সম্পাদক ছাহেবজাদা মাওলানা হুছাম উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী এবং ছাহেব পরিবারের অন্যান্যের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের বিষয়-আশয়ের সাথে আমার যে যোগসূত্র বা যোগাযোগ গড়ে ওঠে, উনাদের মুখে যে নামটি বেশী করে উচ্চারিত হতো, তিনি হলেন ‘লেস্টারের ছাহেব’। মানুষ তাঁকে ‘লেস্টারের ছাহেব’ নামেই জানতো। ইংল্যান্ডের লেস্টার শহর, বিলেতে তাঁর প্রাথমিক কর্মস্থল ছিল। লেস্টারের দারুস সালাম মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও খতীব ছিলেন তিনি। যুগ বরেণ্য ওলীয়ে কামেল হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর শায়খ এবং উস্তাদ ছিলেন। তিনি ‘খলীফায়ে ফুলতলী’ হিসেবে ইংল্যান্ডে তাঁর সম্মানিত শায়খের প্রতিনিধিত্ব করতেন। এই সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব তাঁকে এক বিশিষ্ট অবস্থানে উন্নীত করেছিল। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা তাঁকে ইংল্যান্ডের সকল মাক্তাব-তানযীম বা মাসলাকের উলামা ও বিশিষ্টজনদের মাঝে স্বকীয় বৈশিষ্ট এনে দিয়েছিল। নিজের মাসলাক বা তানযীমভুক্ত মানুষের কাছে তিনি তখন পরিচিত ছিলেন ‘লেস্টারের ছাহেব’ আর সর্বমহলের উলামা-জনতা তাঁকে ‘আল্লামা ছাহেব’ নামে জানতো।

‘আল্লামা মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী ছাহেব ইন্তেকাল করেছেন’, এই সংবাদ শুনে ভাবতে থাকি, আল্লাহ পাক যমীন থেকে তাঁর প্রিয় বান্দাহ আলেমে দ্বীনকে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে যমীনকে যে ইলমশূন্য করে দিবেন, এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ তো আমার চোখের সামনে। আমার সম্পর্কিত বয়স্ক সম্মানিত কেউ কেউকে সংবাদটি জানাবার তাগিদ অনুভব করলাম। শুনে আল্লাহর বান্দাহগণ ব্যথাভরা কন্ঠে বললেন, ‘আহ! আমরা একজন অভিভাবক হারালাম, একজন নির্ভরশীল দ্বীনী অভিভাবক হারিয়েছি আমরা।’ অনেকে তো এমনও বললেন, ‘ইংল্যান্ডে বসবাসকারী আলেমদের মধ্যে তিনিই বেশী কাজ করেছেন।’ তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে দেখেছেন এবং তাঁর কর্মতৎপরতার সাক্ষী যাঁরা তাঁদের মূল্যায়নে, ‘তিনি ছিলেন সুন্নীয়তের এক শক্তিশালী স্তম্ভ।’ কয়েক দশক ধরে ইংল্যান্ডের যমীনে তাঁর তা’লিম-তরবিয়তে ধন্য মানুষের সংখ্যা একেবারে কম হবেনা।
 
একজন বিশেষজ্ঞ আলেম যাঁর কর্মশীল জীবন মানুষের কাছে সত্যিকার অর্থেই দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছিল - তিনি তা ছিলেন। তা কর্মস্থল হোক বা নিজের বাড়ি হোক অথবা সফরকালীন সময়ই হোক, তাঁর জীবনাচার এবং ইখলাসপূর্ণ নেক আমলের উদাহরণ সংগতিপূর্ণ গাম্ভীর্যে অত্যুজ্জ্বল ছিল। দরবেশী জীবনবোধ যা তিনি লালন করতেন ও পালন করতেন, তা নিজের পরিবার-পরিজনেরও প্রাত্যহিক আচরণ সৌন্দর্যে পরিণত করেছিলেন। খুবই কাছ থেকে দেখেছেন, এমন মানুষদের অকৃত্রিম - বিশুদ্ধ স্বীকারোক্তি আমাকে বলতে বাধ্য করছে যে, সাধারণ মানুষজনই শুধু নয়, অনেক আলেম ও দায়ী’ হযরাতকেও উপাদান গ্রহণ করার মতো পরহেজগারীর নমুনা তিনি অন্দরে ও বাইরে ধারণ করতেন।
অনেক সময় মানুষের জটিল বা প্যাচানো গুণ - বৈশিষ্ট্য বহু সুন্দরতাকে দুর্বোধ্যতায় আচ্ছন্ন করে দেয়। মানুষের অকৃত্রিম - আন্তরিক সারল্য হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম গুণ - আল্লামা দুবাগী ছিলেন এমনই এক গুণসম্পন্ন মানুষ, যিনি ছিলেন জটিলতামুক্ত নিজস্বতায় ভরপুর। তাঁর সম্পর্কে সম্মন্ধিত উক্তিগুলো যা তাঁর গুণগ্রাহীগণ ইতোমধ্যে চর্চা করতে শুরু করেছেন - সরল আল্লাহওয়ালা প্রাজ্ঞ একজন ছিলেন তিনি; মেহমান নেওয়াজ, উদার, স্নেহপরায়ণ এক মুরব্বীকে আমরা হারিয়েছি; অধ্যাবশায়ী এক জ্ঞানপিপাষু গুণী মানুষ আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন; নির্ভরযোগ্য আলেমে দ্বীন হিসাবে মানুষের কাছে তাঁর অসামান্য গ্রহণযোগ্যতা ছিল; সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর কাছে মকবুলিয়ত বা গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে বিশ্বাসীদের এই চর্চা একজন মানুষের জীবনে পরম প্রাপ্তি নয়কি!
 
আমি বা আমরা যে তাঁর পরিপূর্ণ - নিবিড় সান্নিধ্য নিতে পারিনি, আক্ষরিক অর্থেই এটা সত্য। তিনি সকল বয়সের এবং সকল স্তরের আলেমগণকে সঙ্গ দিতে পছন্দ করতেন। বার্ধক্যের ভার আর শারীরিক সুস্থতার অল্পতা তিনি ভুলে যেতেন যখন আমাদের মতো বয়স এবং ইলমে অতিশয় তারতম্যপূর্ণ নবীনদের সাথেও আলোচনায় বসতেন। ব্যথা আর বেদনার ভারে অনেকের মতো আমিও কাতর হয়েছি, বিদ্ধ হয়েছি শোকাবহ খবরটির নিদারুণ আঘাতে। অনেকেই হয়তো বলবেন, তাঁর ইন্তেকাল পরিণত বয়সেই হয়েছে, কিন্তু আফসোস! আমরা একজন উঁচু স্তরের আলিমে দ্বীনকে হারিয়েছি, এক মুত্তাকী আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ - অভিভাবককে হারিয়েছি, হারিয়েছি আল্লামা মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী ছাহেবকে; যিনি ইলম ও যুহদের মাকাম-মর্তবায় এ কালের মানুষের জন্যে দৃষ্টান্ত-উপমা হয়ে থাকবেন।
বাংলাদেশের সিলেট জেলার বিয়ানী বাজার থানার দুবাগ গ্রামে ১৯২৯ সনে তাঁর জন্ম। সে সময়ের বরেণ্য উলামা, মুহাদ্দিসীন ও ফকীহ মুহাক্কিক উস্তাদগণের কাছে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে একজন মুহাদ্দিস এবং ফকীহ হিসাবে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে নিজের প্রজ্ঞা ও মেধার নজির রাখেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেক মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফকীহগণ বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের বাইরে শিক্ষা বিস্তারে এখনও খেদমত করে যাচ্ছেন। ১৯৭৮ সন থেকে লেস্টার শহরের দারুস সালাম মসজিদের খতীব হিসেবে ব্রিটেনে তাঁর কর্মজীবনের শুরু। তিনি তাঁর মুক্তাদি, মুসাল্লি ও মসজিদ কেন্দ্রিক জনসাধারণকে প্রাত্যহিক বিষয়ের তা’লিম ও তারবিয়ত দিয়ে এতই প্রাজ্ঞ করে তুলেন যে, শুনা যায় এই সকল মানুষের সংস্পর্শে এসে ভিন্নভাষী উলামা কেরামগণও তাঁর সম্পর্কে এক সময় উচ্চ ধারণা পোষণ করতে শুরু করেন। তাঁর ছাত্রজীবনেও কিতাব অধ্যায়নে বিস্ময়কর দক্ষতা তাঁকে তাঁর সময়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে আলোচনার কেন্দ্র করে তুলেছিল। ব্রিটেনের কর্মজীবনে তাঁর অসামান্য কর্মশীলতার নযীর বিভিন্ন বিষয়ের উপর বিভিন্ন ভাষায় রচিত অনেকগুলো মূল্যবান কিতাব। বাংলাভাষী এই বিশেষজ্ঞ আলেম যিনি তাঁর মূল্যবান লেখনী দ্বারা ব্রিটেনবাসী মুসলমানদের জন্য তো বটেই, সকল শ্রেণীর মানুষের জন্যেই অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। আমরা এ পর্যায়ে তাঁর লিখিত কিতাবাদী থেকে কয়েকটির উল্লেখ এখানে করতে পারি: মানাছুল মুফতী (উর্দু), আল মাসাইলুন্নাদিরাহ, ফাতওয়ায়ে মুজাহিদিয়া, মীলাদে বেনযীর, এক নজরে হজ ও যিয়ারত, এতিম প্রসঙ্গে, পুণ্যের দিশারী, ফাতেহা ও কবর যিয়ারতের মাসাইল, সুন্নাত ও নফল নামাজের জরুরি মাসাইল, দোয়ার মাহাত্ম্য, মানাছুল মুফতীর বঙ্গানুবাদ, বিবিধ মাসাইল, কদম বুছির তথ্য, জানাজার নামাজের পর দোয়া করা মুস্তাহাব, শবে-কদরের তাৎপর্য, ফাদায়েলে শবে-বরাত, শিফায়ে রূহ, প্রশ্নউত্তর প্রভৃতি।
বিলেতে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষী সমাজের এক প্রতিকৃত আলেম ছিলেন তিনি, যিনি তাঁর লেখনীর খিদমতের মধ্য দিয়ে নিজে জাগরুক থেকেছেন এবং জাগিয়ে রেখেছেন মানুষকেও। পুস্তক প্রকাশ করা ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়ে সহজতর উপস্থাপনায় প্রচারিত তাঁর অতি প্রয়োজনীয় ফতওয়াবলী ছিল কমিউনিটির জন্য দিকদর্শনের মতো। দ্বীনী নানাবিধ খেদমতে সম্পৃক্ততা সত্বেও কিতাব রচনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে আল্লামা দুবাগী (রহ:) সমাজ ও জাতির প্রতি যেমন কল্যাণকর অবদান রেখেছেন, তেমনি নিজের কর্ম-কুশলতায় একাগ্র অধ্যাবসার নজির রাখতেও সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লামা মুহম্মদ ইকবাল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কত সুন্দর ও গভীর দর্শনের চোখে একজন লেখক, কবি অথবা মুসান্নিফের কর্মবিশালতার পেছনে তাঁর একাগ্রচিত্ত বৈশিষ্টকে ফুটিয়ে তুলেছেন:

“আত্তার হো, রুমী হো,
রাযী হো, গাজালী হো;
কুছ হাত নেহী আতা
বে আহে সাহার গাহী।”
(সূফী সম্রাট আত্তার হোন,
বিশ্বপ্রেমী রুমী হোন,
মহাজ্ঞানী রাযী অথবা গাজালী-ই হোন,
এমন কোন সৃষ্টিশীল হাত আসেনি,
যে নিদ্রাহীন বিপন্ন রাত যাপন করে ভোর করেনি।)

‘সমাজ ও জাতির জন্যে একজন আলেমে দ্বীন আকাশের তারকার মতো’—রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক বাণীতে এমনই বলেছেন। তারকাতুল্য আলেম, সমাজ ও জাতির জন্য আদর্শ হবেন। রাসূলে করীমের এই বাণীতেই বলা হয়েছে—‘রাতের অন্ধকারে সমুদ্রের নাবিকরা যেমনি তারকা দেখে দিক খোঁজে নেয়, তেমনি মানুষ আলেমের কাছে সঠিক দিক দির্দেশনা পেয়ে থাকে।’ রাসূল করীমের বাণীর আলোকে সে আলেম হবেন যোগ্যতর আলেম, বড় আলেম, মানুষ তাকওয়া-পরহেজগারীর দৃষ্টান্ত পরিলক্ষণ করবে যাঁর আমাল ও আ’দাতের অনুশীলনে। আলেমের নিজের জিন্দেগী তো উপস্থাপিত গ্রহণযোগ্যতার মানদন্ডে উত্তির্ণ হবেই, তাঁর সংশ্লিষ্ট সীমার একান্ত বিষয়-আশয়গুলিও শুদ্ধতার বিচারে পরিহারযোগ্য নয়, তা সুনিশ্চিত হতে হবে। আমাদের এ কালে ‘বড় আলেম’ হিসেবে অভিধেয় ব্যক্তির বৈশিষ্ট-রূপ প্রায়শই খ্যাতির মোড়কের চাকচিক্যের উপর নির্ধারিত হয়ে থাকে। শুদ্ধতা এবং সুস্থতা যখন শীর্ণতার বিবেচনায় নিরূপণ হতে চলেছে, তখন ‘বড়’র সংজ্ঞা ‘ক্ষুদ্রতার’ সাপেক্ষে বিশেষিতকরণ হতে পারবে না কেন! এ প্রসঙ্গে আমাদের এক সম্মানিত উস্তাদের তাৎপর্যপুর্ণ কিছু বক্তব্যের কথা মনে পড়ছে। মাদ্রাসা-ই আলিয়া ঢাকার শায়খুল হাদীস আল্লামা ওয়াজীহ উদ্দীন লক্ষিপুরী আমাদেরকে বুখারী শরীফের প্রথম দিনের ক্লাসে ইলম, উলামা এবং মাদ্রাসা-ই আলিয়া ঢাকার বিশেষত্ব, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিষয়ে গভীর আলোচনার পেক্ষিতে এমন সব কথামালা বলছিলেন, যা সাতাশ বছর আগের তিন শ’য়ের অধিক ছাত্রদের মধ্যে বসে থেকে শুনা কথাগুলোর তীক্ষ্ণ, গভীর প্রভাব এখনও আমি অনুভব করি। তাঁর কথাগুলো একাধারে একজন শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতো শুনাচ্ছিল। অর্থাৎ না শুনে না মেনে তোমাদের উপায় নেই—এমনই নিশ্চিত করে উপস্থাপন করা তাঁর কথাগুলো। প্রথমে বললেন আক্বিদা দুরুস্তের কথা। তাঁর ভাষায়, ‘হাদীস শরীফ পড়তে এসেছ, তো আক্বিদা দুরুস্ত না করে উপায় নেই।’ এর পর বললেন, ইলমের গুরুত্ব ও আলেমের দায়বদ্ধতার বিষয়-আসয় সম্পর্কে। সব শেষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে মাদ্রাসা-ই আলিয়া ঢাকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্যের দিকগুলো। এ পর্যায়ে আমাদের ক্লাসরুমের ব্রেঞ্চ, টেবিল, শিক্ষকের চেয়ার এবং ডেস্ক দেখিয়ে বলতে থাকলেন, “এই বেঞ্চে আমিও বসে একদিন ক্লাস করেছি, আর শিক্ষকের আসনে বসা ছিলেন বরেণ্য মুহাদ্দিস মুফতিয়ে আজম হযরত আমীমুল ইহসান মুজাদ্দিদী বারাকাতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। আমি ভাবিনি তাঁর আসনে বসে একদিন আমার মতই বসে থাকা ছাত্রদের পড়াব। তিনি তখনকার সময়ের বড় আলেম ছিলেন, অনেক বড় আলেম ছিলেন! এখন লোকে আমাদেরকেও বড় আলেম বলে; আর তোমাদেরকেও একদিন বড় আলেম বলবে! আর বেলম গাছের লাকড়িকেও লোকে উত্তম কাঠ হিসেবে ব্যবহার করবে !” শায়খুল হাদীসের কথাগুলো নিয়ে আমি এখনও চিন্তা-ভাবনা করি আর উর্দু এই কবির কবিতার সাথে বাস্তবতার মিল খোঁজি—
“ হামারে বা’দ যমানে মে
কেউঁ না খাক উড়ে;
কেহ কারওয়ান কে পিচ্ছে
গুবার রহতা হায়।”
(আমাদের পরের যুগ-যামানায় ধুলা উড়তে দেখা যাবে বলে মনে হয়না;
কারণ কাফেলা যখন কোন স্থান ত্যাগ করে চলে যায়, তখন তাদের বাহন ঘোড়া বা উটের মল-গোবর পড়ে থাকতেই দেখা যায়।)
মনের গহীনে বেদনার সুর সতত অনুরণিত হয় - আমাদের মাথার তাজসকল হারিয়ে যাচ্ছেন। যুগ-যামানার দৃষ্টান্তের মতো ইলম ও আ’মালের খাজানাগুলো মাটির কুটুরিতে সমাহিত হচ্ছেন। আলোগুলো নিভে যাচ্ছে, পেছনের অন্ধকার রুখতে আমাদের যে অনেক আলোর প্রয়োজন।
আমরা এই কথায় প্রত্যয়ী যে, মুফতিয়ে যামান আল্লামা দুবাগী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর কর্মের বিশালতায় বেঁচে থাকবেন। আমাদের নিবেদন, আল্লাহ তাঁর জীবনের নেক আমলগুলো কবুল করুন, আল্লাহ তাঁকে সর্বোচ্চ জান্নাতের বাসিন্দা করুন। আমরা তাঁর ত্যাগ, ধৈর্য্য, অধ্যাবসায় ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা থেকে যেন আলোকিত হতে পারি।

কয়েক লাইন কবিতা দিয়ে শেষ করতে চাই:-
এক নিবেদিত জ্ঞানী পুরুষের কথা বলছি,
ভোরের বাতাসের সুরের সাথে যাঁর কান্নার আরতি মিশে যেত প্রতিদিন।
রাতের তারারা হেলে যায়,
আকাশের অবারিত দরোজায় ফেরেশতাদের আসা-যাওয়া চলে;
সাধক পুরুষের সেজদার মুসাল্লায় অশ্রুর শিশির কথা বলে;
নিশ্চল মগ্নতায় সকল নিস্পন্দ মুহুর্তগুলো শব্দায়মান হয়ে ওঠে -
রাব্বানা! রাব্বানা!

আমাদের চোখের সামনে যুগের সূর্যগুলো ডুবে যায়!
আলোর প্রত্যাশা নিয়ে ভোরের আকাশে খোঁজে ফেরা চোখ সন্ধ্যাকালের শোক মাহফিলে জ্যোতি ছড়ায় - কাফেলা সেই কবে চলে গেছে!
আলোর ঝিলিকগুলো বহু দূরের তারার মতো আমাদের পথ দেখায় -
মরুর বালু-রাশির মাঝে, আমরা জেগে আছি -
জেগে আছি, জ্ঞানী-সাধক পুরুষদের আলো নিয়ে।
 
লেখক: চেয়ারম্যান, ইসলামিক রিসার্স এন্ড দা’ওয়াহ কাউন্সিল ইউকে; চেয়ারম্যান, তানযীমুস সুন্নাহ ফাউন্ডেশন ইউকে; সাবেক খতিব শেডওয়েল জামে মসজিদ লন্ডন, সাবেক সিনিয়র শিক্ষক দারুল হাদিস লতিফিয়া লন্ডন, সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক পরওয়ানা ঢাকা; সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়া।

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রাজশাহীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্মার্ট ব্যাংকিং প্রসারে কাজ করবে পূবালী  ব্যাংক, ভূমিমন্ত্রী

রাজশাহীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্মার্ট ব্যাংকিং প্রসারে কাজ করবে পূবালী ব্যাংক, ভূমিমন্ত্রী