ইরান যুদ্ধের থেকে শিক্ষা নিয়ে পরমাণু অস্ত্র নীতিতে এ বার বড় বদল আনল উত্তর কোরিয়া বা ডিপিআরকে (ডেমোক্র্যাটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া)। সূত্রের খবর, সেখানে বলা হয়েছে, সংঘাত পরিস্থিতি বা গুপ্তঘাতকদের হাতে দেশের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) কিম জং-উনের মৃত্যু হলে বা তিনি অক্ষম হয়ে পড়লে সেনাবাহিনীকে স্বয়ংক্রিয় আণবিক হামলার অনুমোদন দেবে পিয়ংইয়ং!
চলতি বছরের ২২ মার্চ পার্লামেন্ট তথা সর্বোচ্চ গণপরিষদের (সুপ্রিম পিপল্স অ্যাসেম্বলি) ১৫তম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন করে উত্তর কোরিয়ার কিম সরকার। খুব দ্রুতই সেই খবর প্রকাশ্যে আনেন দক্ষিণ কোরিয়ার (রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা আরওকে) গোয়েন্দারা। পাশাপাশি, বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিম সরকারের সংবিধান সংশোধনীর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য ইতিমধ্যেই জোগাড় করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা এনআইএস (ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস)। সোলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পাঠানো হয়েছে সেই ফাইল। যদিও এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কোনও বিবৃতি দেয়নি তারা।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ ভাবে ইরান আক্রমণ করে মার্কিন ফৌজ। যুদ্ধের প্রথম দিনই তাদের হামলায় প্রাণ হারান তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) তথা শিয়া ধর্মগুরু আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। পাশাপাশি, মৃত্যু হয় তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্য-সহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ সেনা কমান্ডারের।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই ঘটনার পরই সতর্ক হন কিম। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় তাঁর মৃত্যু হলে কী ভাবে প্রত্যাঘাত শানাবে উত্তর কোরিয়া? তারই নীলনকশা তৈরিতে কোমর বেঁধে লেগে পড়ে পিয়ংইয়ং। দেশের সর্বোচ্চ গণপরিষদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সেটা যে পূর্ণতা পেয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন সোলের বিখ্যাত কুকমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্দ্রেই ল্যাঙ্কভ। তাঁর কথায়, ‘‘পরমাণু হামলার কথা উত্তর কোরিয়া এই প্রথম বলছে, এমনটা নয়। যদিও তাতে ছিল না কোনও প্রাতিষ্ঠানিক সিলমোহর। কিন্তু, এ বার তো আইনে পাল্টা আণবিক আক্রমণের সবুজ সঙ্কেত একরকম দিয়েই দিলেন কিম।’’
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ল্যাঙ্কভ বলেন, ‘‘মার্কিন-ইজ়রায়েল যৌথ হামলায় ইরানের কী দশা হয়েছে, সেটা ভাল করে পর্যবেক্ষণ করেছে পিয়ংইয়ং। ওই লড়াইয়ের প্রথম দিনই তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করে দেয় ওয়াশিংটন ও তেল আভিভের বিমানবাহিনী। সেটা কিম তথা উত্তর কোরিয়ার মনে তৈরি করেছে আতঙ্ক। সেই ভয় থেকেই ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তিনি।’’
অন্য দিকে সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশের বক্তব্য, ইরানের কায়দায় উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালানো মার্কিন বায়ুসেনার পক্ষে কার্যত অসম্ভব। কারণ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপদ্বীপীয় রাষ্ট্রটি সারা বিশ্বের থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে বললে অত্যুক্তি হবে না। সেই কারণেই কিমের সুরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করা বেশ কঠিন।
সামরিক বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বছরের পর বছর ধরে হাতেগোনা বিদেশির ভিসা মঞ্জুর করেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটিতে বেসরকারি সিসিটিভি পরিকাঠামো প্রায় নেই বললেই চলে। পাশাপাশি, ইন্টারনেটের ব্যবহারকেও অত্যন্ত সঙ্কুচিত করে রেখেছে পিয়ংইয়ং। শুধু তা-ই নয়, বিদেশি কূটনীতিক, স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যবসায়ী, এমনকি পর্যটকদের উপরেও নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে থাকে কিম প্রশাসন।
ইরানে কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র লক্ষ করা গিয়েছে। তেহরান কখনওই বিদেশিদের প্রবেশের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। ফলে খুব সহজেই সাবেক পারস্যের হাঁড়ির খবর জোগাড় করে ফেলে ইজ়রায়েল। পাশাপাশি, লড়াইয়ের সময় সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার সিসিটিভি এবং অন্যান্য ডিজিটাল পরিষেবাকে হ্যাক করতে পেরেছে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও আলি খামেনেইয়ের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত ঢিলেঢালা। সেখানে সর্ব ক্ষণ নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার ঘোরাটোপে থাকেন কিম। রাস্তায় বার হলে তাঁকে ঘিরে থাকে ভারী হাতিয়ারে সজ্জিত একাধিক গাড়ির কনভয়। তা ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিমানযাত্রা এড়িয়ে চলেন তিনি।
গত তিন বছরে বিদেশযাত্রা বলতে এক বার মাত্র রাশিয়া সফর করেছেন কিম। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব ইউরোপের দেশটির দূর প্রাচ্য এলাকায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেখা যায় তাঁকে। এই ধরনের দূরপাল্লার সফরে সাঁজোয়া ট্রেন ব্যবহার করে থাকেন তিনি। আর তাই ঝটিতি হামলায় কিমকে উড়িয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে খুবই কঠিন।
অধ্যাপক ল্যাঙ্কভ জানিয়েছেন, সামরিক ক্ষেত্রে একটি জায়গায় উত্তর কোরিয়ার বেশ দুর্বলতা আছে। সেটা হল যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক নজরদারি, যা আটকানো কিমের পক্ষে সম্ভব নয়। পিয়ংইয়ঙের আশঙ্কা, মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্যের উপর নির্ভর করে সুপ্রিম লিডারকে নিকেশের চেষ্টা চালাবে আমেরিকা। সেই ভয় থেকেই পরমাণু নীতি সংশোধন করেছে তারা।
১৯৫০-’৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধে সোলকে খোলাখুলি ভাবে সমর্থন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে লড়াইয়ের গোড়ার দিকে সাফল্য পেলেও পিয়ংইয়ং তা বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি। ওই সময় তাদের পিছনে ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না)। তা সত্ত্বেও আমেরিকার বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণে পিছু হটতে বাধ্য হয় ডিপিআরকে।
কোরীয় যুদ্ধে একরকম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় পিয়ংইয়ং। পরবর্তী দশকগুলিতে উত্তর কোরিয়াকে কোণঠাসা করতে তার ঘাড়ে বিপুল নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি বিশ্ব। ডিপিআরকে অবশ্য তাতে দমে যায়নি। উল্টে পরমাণু শক্তি অর্জনে আদাজল খেয়ে লেগে পড়ে তারা। ২০০৯ সাল আসতে আসতে এই গণবিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরি করে ফেলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই উপদ্বীপীয় রাষ্ট্র।
২০১৮ সাল আসতে আসতে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলে উত্তর কোরিয়া। ফলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরে আণবিক হামলা চালানো কিম-ফৌজের পক্ষে একেবারেই কঠিন নয়। তা ছাড়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হলে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আমেরিকার ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলিকেও পিয়ংইয়ং ছেড়ে কথা বলবে না বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময় থেকেই জাপানের সুরক্ষার দায়িত্বভার নিজেদের কাঁধে তুলে নেয় ওয়াশিংটন। গত আট দশক ধরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিতে মোতায়েন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ফৌজ। একই কথা সোলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোরীয় যুদ্ধের পর সেখানে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে আমেরিকা।
গত ৭ মে রাষ্ট্রপুঞ্জের সম্মেলনে পরমাণু নীতি নিয়ে বড় ঘোষণা করেন উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধি। তিনি জানিয়েছেন, আণবিক হাতিয়ারের ক্ষেত্রে কোনও রকমের চুক্তিতে আবদ্ধ থাকবে না পিয়ংইয়ং। তাঁর কথায়, ‘‘পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে কোনও রকমের বাহ্যিক চাপ সহ্য করব না আমরা।’’
২০০৩ সালে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে সরে আসে উত্তর কোরিয়া। ২০২৬ সালের মধ্যে ছ’বার আণবিক হাতিয়ারের পরীক্ষা চালিয়েছে পিয়ংইয়ং। সুইডেনের প্রতিরক্ষা নজরদার সংস্থা ‘স্টকহলোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বা সিপ্রির দাবি, বর্তমানে কিমের হাতে আছে কয়েক ডজন পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, সেই কারণেই এখনও পর্যন্ত সরাসরি উত্তর কোরিয়াকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেননি কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে কিমের সংবিধান পরিবর্তনের পর ওয়াশিংটনের পক্ষে চুপ করে থাকা অসম্ভব। ফলে আগামী দিনে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার সামরিক উত্তেজনা বাড়বে বলেই মনে করছেন তাঁরা।
চলতি বছরের ২২ মার্চ পার্লামেন্ট তথা সর্বোচ্চ গণপরিষদের (সুপ্রিম পিপল্স অ্যাসেম্বলি) ১৫তম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন করে উত্তর কোরিয়ার কিম সরকার। খুব দ্রুতই সেই খবর প্রকাশ্যে আনেন দক্ষিণ কোরিয়ার (রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা আরওকে) গোয়েন্দারা। পাশাপাশি, বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিম সরকারের সংবিধান সংশোধনীর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য ইতিমধ্যেই জোগাড় করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা এনআইএস (ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস)। সোলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পাঠানো হয়েছে সেই ফাইল। যদিও এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কোনও বিবৃতি দেয়নি তারা।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ ভাবে ইরান আক্রমণ করে মার্কিন ফৌজ। যুদ্ধের প্রথম দিনই তাদের হামলায় প্রাণ হারান তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) তথা শিয়া ধর্মগুরু আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। পাশাপাশি, মৃত্যু হয় তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্য-সহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ সেনা কমান্ডারের।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই ঘটনার পরই সতর্ক হন কিম। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় তাঁর মৃত্যু হলে কী ভাবে প্রত্যাঘাত শানাবে উত্তর কোরিয়া? তারই নীলনকশা তৈরিতে কোমর বেঁধে লেগে পড়ে পিয়ংইয়ং। দেশের সর্বোচ্চ গণপরিষদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সেটা যে পূর্ণতা পেয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন সোলের বিখ্যাত কুকমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্দ্রেই ল্যাঙ্কভ। তাঁর কথায়, ‘‘পরমাণু হামলার কথা উত্তর কোরিয়া এই প্রথম বলছে, এমনটা নয়। যদিও তাতে ছিল না কোনও প্রাতিষ্ঠানিক সিলমোহর। কিন্তু, এ বার তো আইনে পাল্টা আণবিক আক্রমণের সবুজ সঙ্কেত একরকম দিয়েই দিলেন কিম।’’
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ল্যাঙ্কভ বলেন, ‘‘মার্কিন-ইজ়রায়েল যৌথ হামলায় ইরানের কী দশা হয়েছে, সেটা ভাল করে পর্যবেক্ষণ করেছে পিয়ংইয়ং। ওই লড়াইয়ের প্রথম দিনই তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করে দেয় ওয়াশিংটন ও তেল আভিভের বিমানবাহিনী। সেটা কিম তথা উত্তর কোরিয়ার মনে তৈরি করেছে আতঙ্ক। সেই ভয় থেকেই ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তিনি।’’
অন্য দিকে সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশের বক্তব্য, ইরানের কায়দায় উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালানো মার্কিন বায়ুসেনার পক্ষে কার্যত অসম্ভব। কারণ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপদ্বীপীয় রাষ্ট্রটি সারা বিশ্বের থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে বললে অত্যুক্তি হবে না। সেই কারণেই কিমের সুরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করা বেশ কঠিন।
সামরিক বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বছরের পর বছর ধরে হাতেগোনা বিদেশির ভিসা মঞ্জুর করেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটিতে বেসরকারি সিসিটিভি পরিকাঠামো প্রায় নেই বললেই চলে। পাশাপাশি, ইন্টারনেটের ব্যবহারকেও অত্যন্ত সঙ্কুচিত করে রেখেছে পিয়ংইয়ং। শুধু তা-ই নয়, বিদেশি কূটনীতিক, স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যবসায়ী, এমনকি পর্যটকদের উপরেও নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে থাকে কিম প্রশাসন।
ইরানে কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র লক্ষ করা গিয়েছে। তেহরান কখনওই বিদেশিদের প্রবেশের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। ফলে খুব সহজেই সাবেক পারস্যের হাঁড়ির খবর জোগাড় করে ফেলে ইজ়রায়েল। পাশাপাশি, লড়াইয়ের সময় সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার সিসিটিভি এবং অন্যান্য ডিজিটাল পরিষেবাকে হ্যাক করতে পেরেছে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও আলি খামেনেইয়ের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত ঢিলেঢালা। সেখানে সর্ব ক্ষণ নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার ঘোরাটোপে থাকেন কিম। রাস্তায় বার হলে তাঁকে ঘিরে থাকে ভারী হাতিয়ারে সজ্জিত একাধিক গাড়ির কনভয়। তা ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিমানযাত্রা এড়িয়ে চলেন তিনি।
গত তিন বছরে বিদেশযাত্রা বলতে এক বার মাত্র রাশিয়া সফর করেছেন কিম। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব ইউরোপের দেশটির দূর প্রাচ্য এলাকায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেখা যায় তাঁকে। এই ধরনের দূরপাল্লার সফরে সাঁজোয়া ট্রেন ব্যবহার করে থাকেন তিনি। আর তাই ঝটিতি হামলায় কিমকে উড়িয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে খুবই কঠিন।
অধ্যাপক ল্যাঙ্কভ জানিয়েছেন, সামরিক ক্ষেত্রে একটি জায়গায় উত্তর কোরিয়ার বেশ দুর্বলতা আছে। সেটা হল যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক নজরদারি, যা আটকানো কিমের পক্ষে সম্ভব নয়। পিয়ংইয়ঙের আশঙ্কা, মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্যের উপর নির্ভর করে সুপ্রিম লিডারকে নিকেশের চেষ্টা চালাবে আমেরিকা। সেই ভয় থেকেই পরমাণু নীতি সংশোধন করেছে তারা।
১৯৫০-’৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধে সোলকে খোলাখুলি ভাবে সমর্থন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে লড়াইয়ের গোড়ার দিকে সাফল্য পেলেও পিয়ংইয়ং তা বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি। ওই সময় তাদের পিছনে ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না)। তা সত্ত্বেও আমেরিকার বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণে পিছু হটতে বাধ্য হয় ডিপিআরকে।
কোরীয় যুদ্ধে একরকম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় পিয়ংইয়ং। পরবর্তী দশকগুলিতে উত্তর কোরিয়াকে কোণঠাসা করতে তার ঘাড়ে বিপুল নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি বিশ্ব। ডিপিআরকে অবশ্য তাতে দমে যায়নি। উল্টে পরমাণু শক্তি অর্জনে আদাজল খেয়ে লেগে পড়ে তারা। ২০০৯ সাল আসতে আসতে এই গণবিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরি করে ফেলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই উপদ্বীপীয় রাষ্ট্র।
২০১৮ সাল আসতে আসতে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলে উত্তর কোরিয়া। ফলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরে আণবিক হামলা চালানো কিম-ফৌজের পক্ষে একেবারেই কঠিন নয়। তা ছাড়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হলে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আমেরিকার ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলিকেও পিয়ংইয়ং ছেড়ে কথা বলবে না বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময় থেকেই জাপানের সুরক্ষার দায়িত্বভার নিজেদের কাঁধে তুলে নেয় ওয়াশিংটন। গত আট দশক ধরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিতে মোতায়েন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ফৌজ। একই কথা সোলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোরীয় যুদ্ধের পর সেখানে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে আমেরিকা।
গত ৭ মে রাষ্ট্রপুঞ্জের সম্মেলনে পরমাণু নীতি নিয়ে বড় ঘোষণা করেন উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধি। তিনি জানিয়েছেন, আণবিক হাতিয়ারের ক্ষেত্রে কোনও রকমের চুক্তিতে আবদ্ধ থাকবে না পিয়ংইয়ং। তাঁর কথায়, ‘‘পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে কোনও রকমের বাহ্যিক চাপ সহ্য করব না আমরা।’’
২০০৩ সালে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে সরে আসে উত্তর কোরিয়া। ২০২৬ সালের মধ্যে ছ’বার আণবিক হাতিয়ারের পরীক্ষা চালিয়েছে পিয়ংইয়ং। সুইডেনের প্রতিরক্ষা নজরদার সংস্থা ‘স্টকহলোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বা সিপ্রির দাবি, বর্তমানে কিমের হাতে আছে কয়েক ডজন পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, সেই কারণেই এখনও পর্যন্ত সরাসরি উত্তর কোরিয়াকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেননি কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে কিমের সংবিধান পরিবর্তনের পর ওয়াশিংটনের পক্ষে চুপ করে থাকা অসম্ভব। ফলে আগামী দিনে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার সামরিক উত্তেজনা বাড়বে বলেই মনে করছেন তাঁরা।
আন্তজার্তিক ডেস্ক