১. ভূমিকা: ‘নূর’ কেন কুরআনের কেন্দ্রীয় রূপক?
কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা‘আলা নিজেকে, তাঁর হিদায়াতকে, ওহীকে এবং ঈমানকে ‘নূর’ তথা আলো বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গভীর, শৈল্পিক ও তাত্ত্বিক আয়াত হলো সূরা আন-নূর ২৪:৩৫। এ আয়াতকে মুফাসসিরগণ ‘আয়াতুন নূর’ বা ‘আলোর আয়াত’ নামে চিহ্নিত করেছেন। ইমাম গাজালী رحمه الله তাঁর ‘মিশকাতুল আনওয়ার’ গ্রন্থটি পুরোটাই এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন।
আয়াতটি:
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
[আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনের নূর। তাঁর নূরের উপমা হলো যেন একটি তাক, যার মধ্যে আছে একটি প্রদীপ; প্রদীপটি আছে কাঁচের আবরণে। কাঁচটি যেন একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র, যা প্রজ্বলিত করা হয় বরকতময় যয়তুন বৃক্ষের তেল দ্বারা, যা পূর্বেরও নয়, পশ্চিমেরও নয়। তার তেল এমন যে, আগুন স্পর্শ না করলেও তা আলো দিতে উদ্যত। নূরের উপর নূর। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর নূরের দিকে হিদায়াত দেন। আল্লাহ মানুষের জন্য উপমা বর্ণনা করেন। আর আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।] সূরা আন-নূর ২৪:৩৫
এই প্রবন্ধে আমরা আয়াতটির শাব্দিক, রূপক, আকীদাগত ও হাদিসভিত্তিক ব্যাখ্যা পেশ করব।
২. শাব্দিক বিশ্লেষণ: আয়াতের মূল শব্দগুলো
১. নূর (نُورٌ) [আলো]। ইবনে আব্বাস رضي الله عنه বলেন: *“الله هادي أهل السماوات والأرض [আল্লাহ আসমান ও যমীনবাসীর হাদী] তাফসীর তাবারী ১৯/১৭৮। অর্থাৎ আল্লাহ নিজে আলো নন, বরং তিনি আলোর স্রষ্টা ও হিদায়াতদাতা। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকীদা: আল্লাহর ‘নূর’ সিফাত, মাখলুকের নূরের মতো নয়। لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ _[তাঁর মতো কিছুই নেই] সূরা আশ-শূরা ৪২:১১।
২. মিশকাত (مِشْكَاةٍ) – [তাক বা কুলুঙ্গি]। এটি দেয়ালের খোপ, যেখানে বাতি রাখলে আলো একত্রিত হয়ে বেশি ছড়ায়। রূপক অর্থে: মুমিনের বক্ষ।
৩. মিসবাহ (مِصْبَاحٌ) – [প্রদীপ]। রূপক অর্থে: ঈমান ও কুরআন।
৪. যুজাজাহ (زُجَاجَةٍ) – [কাঁচ]। স্বচ্ছ কাঁচ আলোকে বাধা দেয় না, বরং বাড়ায়। রূপক: মুমিনের স্বচ্ছ অন্তর।
৫. কাওকাবুন দুররিয়্যুন (كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ) – [উজ্জ্বল নক্ষত্র]। ‘দুররী’ মানে মুক্তার মতো ঝকঝকে। রূপক: অন্তরের ঔজ্জ্বল্য।
৬. শাজারাতিম মুবারাকাতিন যায়তুনাহ (شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ) – [বরকতময় যয়তুন বৃক্ষ]। যয়তুন/জয়তুন। রাসূল ﷺ বলেন: *“كُلُوا الزَّيْتَ وَادَّهِنُوا بِهِ فَإِنَّهُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ”* [যয়তুনের তেল খাও এবং মাখো, কেননা এটি বরকতময় গাছ থেকে] সুনান তিরমিযী ১৮৫১, হাসান।
৭. লা শারকিয়্যাতিন ওয়ালা গারবিয়্যাতিন (لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ) – [পূর্বেরও নয়, পশ্চিমেরও নয়]। অর্থাৎ গাছটি খোলা মাঠে, সারাদিন রোদ পায়। তাই তেল সবচেয়ে খাঁটি। রূপক: ওহী মানবীয় প্রভাবমুক্ত, খাঁটি।
৮. নূরুন ‘আলা নূর (نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ) – [নূরের উপর নূর]। ইবনে কাসীর رحمه الله বলেন: ফিতরাতের নূর + ওহীর নূর = দ্বিগুণ আলো। তাফসীর ইবনে কাসীর ৬/৬৮।
৩. রূপক ব্যাখ্যা: চার স্তরের আলো
মুফাসসিরগণ এ উপমাকে চার স্তরে ভাগ করেছেন:
উপমা রূপক অর্থ দলীল
১. মিশকাত [তাক] মুমিনের বক্ষ أَفَمَن شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ [আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্য প্রশস্ত করেছেন] সূরা আয-যুমার ৩৯:২২
২. মিসবাহ – [প্রদীপ] অন্তরে ঈমানের আলো وَمَن لَّمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُورًا فَمَا لَهُ مِن نُّورٍ [আল্লাহ যার জন্য আলো রাখেননি, তার কোনো আলো নেই] সূরা আন-নূর ২৪:৪০
৩. যুজাজাহ – [কাঁচ] স্বচ্ছ ক্বলব রাসূল ﷺ বলেন: “القلوب أوعية... فأحبها إلى الله أرقها وأصفاها” [অন্তরগুলো পাত্র... আল্লাহর কাছে প্রিয় হলো কোমল ও স্বচ্ছ] মুসনাদ আহমাদ ১০৯৫২
৪. যয়তুনের তেল [জ্বালানি] বিশুদ্ধ ফিতরাত + ওহী فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا [আল্লাহর ফিতরাত, যার উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন] সূরা আর-রূম ৩০:৩০ ‘নূরুন আলা নূর’ মানে: যখন ফিতরাতের তেল ওহীর আগুনের সংস্পর্শে আসে, তখন অন্তর ‘উজ্জ্বল নক্ষত্রের’ মতো হয়।
৪. আকীদাগত মতবাদ: আল্লাহর ‘নূর’ সিফাতের ব্যাখ্যা
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অবস্থান:
১. আল্লাহ ‘নূর’ – এটি সিফাত ফে‘লিয়্যাহ ও সিফাত যাতিয়্যাহ। তিনি হাদী, মুনাওবির। সহীহ মুসলিম ১৮১ : “حجابه النور لو كشفه لأحرقت سبحات وجهه ما انتهى إليه بصره من خلقه” [তাঁর পর্দা নূর; যদি তিনি তা উন্মোচন করেন, তবে তাঁর চেহারার জ্যোতি সৃষ্টির যেখানে দৃষ্টি পৌঁছে সব পুড়িয়ে দেবে]।
২. মাখলুকের নূরের সাথে তুলনা করা তাশবীহ, যা বাতিল।
৩. মু‘তাযিলারা বলে ‘নূর’ মানে শুধু হিদায়াত। ইবনে তাইমিয়্যাহ رحمه الله বলেন: বরং আল্লাহ নিজেই নূর, এবং তিনি হিদায়াতের নূরও সৃষ্টি করেন। মাজমু‘ ফাতাওয়া ৬/৩৮৬।
সূফী ব্যাখ্যা: ইমাম গাজালী ‘নূর’ কে পাঁচ ভাগ করেন: ইন্দ্রিয়ের নূর, আকলের নূর, ক্বলবের নূর, রূহের নূর, এবং আল্লাহর নূর। সর্বোচ্চ নূর আল্লাহ। মিশকাতুল আনওয়ার, পৃ. ৪৫।
৫. সংশ্লিষ্ট হাদিস: নূরের বাস্তব রূপ*
১. দু‘আ আন-নূর:* রাসূল ﷺ সিজদায় পড়তেন:
*“اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا، وَفِي بَصَرِي نُورًا، وَفِي سَمْعِي نُورًا... [হে আল্লাহ, আমার অন্তরে নূর দিন, দৃষ্টিতে নূর দিন, শ্রবণে নূর দিন...] সহীহ বুখারী ৬৩১৬, সহীহ মুসলিম ৭৬৩_। এটি আয়াতুন নূরের আমলী রূপ।
২. কিয়ামতের দিন নূর: “بَشِّرِ الْمَشَّائِينَ فِي الظُّلَمِ إِلَى الْمَسَاجِدِ بِالنُّورِ التَّامِّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ” [অন্ধকারে মসজিদে হেঁটে যাওয়াদের পূর্ণ নূরের সুসংবাদ দাও কিয়ামতের দিন] সুনান আবু দাউদ ৫৬১, সহীহ।
৩. কুরআন নূর: *“وَأَنزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُّبِينًا” [আমি তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট নূর নাযিল করেছি] সূরা আন-নিসা ৪:১৭৪। তাই হাফেজ শুধু মুখস্থ করলে হবে না, নূর অর্জন করতে হবে।
৬. শিক্ষা ও সমাজে প্রয়োগ*
১. শিক্ষা: মাদ্রাসায় ‘হিফজ’ এর সাথে ‘ফাহম’ যুক্ত করতে হবে। নইলে ‘মিশকাত’ থাকবে, কিন্তু ‘মিসবাহ’ জ্বলবে না। *“أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ”* _[তারা কি কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর করে না?] সূরা আন-নিসা ৪:৮২।
২. পরিবার: যয়তুনের মতো ‘লা শারকিয়্যাহ ওয়ালা গারবিয়্যাহ’ – সন্তানকে পূর্ব-পশ্চিমের চরমপন্থা থেকে মুক্ত রেখে মধ্যপন্থী নূর দিতে হবে। “وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا” [এভাবে আমি তোমাদের মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি] সূরা আল-বাকারা ২:১৪৩।
৩. *রাষ্ট্র:* নেতৃত্বের তেল হতে হবে যয়তুনের মতো খাঁটি – দুর্নীতিমুক্ত। তবেই সমাজ ‘কাওকাবুন দুররী’ হবে। “إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا” [আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানত তার হকদারকে দিতে] সূরা আন-নিসা ৪:৫৮।
৭. উপসংহার: ‘নূরুন আলা নূর’ কিভাবে অর্জিত হবে?*
১. *ফিতরাত সংরক্ষণ – শিশুকে গুনাহ থেকে বাঁচাও, যেন তেল ‘ইয়াকাদু যায়তুহা ইউদীউ’ হয়।
২. ওহীর আগুন – কুরআন-সুন্নাহর ইলম। “قَدْ جَاءَكُم مِّنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ” [তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নূর ও সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে] সূরা আল-মায়িদাহ ৫:১৫।
৩. তাযকিয়া – অন্তরকে কাঁচের মতো স্বচ্ছ করা। *“قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا” [সফল সে, যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করল] সূরা আশ-শামস ৯১:৯।
যখন এই তিন একত্র হয়, তখনই বান্দা ‘নূরুন আলা নূর’ লাভ করে। আর আল্লাহ বলেন: *“يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ” [আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর নূরের দিকে হিদায়াত দেন] সূরা আন-নূর ২৪:৩৫।
আমরা দু‘আ করি: *اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنْ أَهْلِ النُّورِ [হে আল্লাহ, আমাদের নূরের অধিকারী বানান]। আমীন।
লেখক :
প্রকৌ : মির্জা শ. হাসান
BSC, Llb, EMBA (aprd. HRM)
গেস্ট লেকচারার, সাংবাদিক, ইসলামী দায়ী।
Cell: 8801771743317,8801907711359.
লেখক :
প্রকৌ : মির্জা শ. হাসান
BSC, Llb, EMBA (aprd. HRM)
গেস্ট লেকচারার, সাংবাদিক, ইসলামী দায়ী।
Cell: 8801771743317,8801907711359.
ধর্ম ডেস্ক