নিঃশব্দে শরীরে বাসা বাঁধে। টেরও পাওয়া যায় না। কিন্তু যখন টনক নড়ে, ততক্ষণে লিভারের বারোটা বেজে গিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যার পোশাকি নাম ছিল ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’, এখন তাকেই বলা হচ্ছে MASLD (Metabolic dysfunction-associated steatotic liver disease)। সাম্প্রতিক ল্যানসেট স্টাডিতে যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা দেখে ঘুম উড়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য মহলের।
ল্যানসেট গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও হেপাটোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় ভুগছেন। তবে আসল ভয়টা লুকিয়ে আছে আগামীর পরিসংখ্যানে। চিকিৎসকদের দাবি, যে হারে ওবেসিটি এবং ডায়াবেটিস (বাড়ছে, তাতে ২০৫০ সালের মধ্যে এই আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছে যাবে ২০০ কোটিতে। অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি ৫ জন মানুষের মধ্যে ১ জন এই রোগে আক্রান্ত হবেন। তাই প্রায় অধিকাংশই আক্রান্ত হবেন ফ্যাটি লিভার ডিজিজে।
কেন হয় এই ‘মেটাবলিক’ লিভার ডিজিজ?
শরীরের বিপাকীয়সমস্যার কারণেই লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে। আগে একে শুধু লাইফস্টাইল জিডিড বলা হলেও, এখন একে বলা হচ্ছে ‘গ্লোবাল মেটাবলিক হেলথ ক্রাইসিস’। মূলত যে কারণগুলো এর নেপথ্যে দায়ী:
টাইপ ২ ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি লিভারের কোষের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
স্থূলতা ও হাই বিএমআই: শরীরের বাড়তি ওজন লিভারের চারধারে ফ্যাটের স্তর তৈরি করে।
উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল: মেটাবলিক সিনড্রোম লিভারের রক্ত সঞ্চালনেও ব্যাঘাত ঘটায়।
সেডেন্টারি লাইফস্টাইল: হাঁটাচলা না করা বা শরীরচর্চার অভাব এই রোগকে ত্বরান্বিত করছে।
লক্ষণ নেই, কিন্তু বিপদ মারাত্মক
এই রোগের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল এটি ‘সাইলেন্ট কিলার’। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনও লক্ষণই প্রকাশ পায় না। অনেকে বছরভর ফ্যাটি লিভার নিয়ে ঘোরেন, কিন্তু বুঝতেই পারেন না। যখন উপসর্গ ধরা দেয়, তখন রোগ পৌঁছে যায় পরের ধাপগুলোতে:
১. ইনফ্লামেশন (প্রদাহ): লিভার ফুলতে শুরু করে।
২. ফাইব্রোসিস: লিভারে ক্ষত বা স্কার তৈরি হয়।
৩. সিরোসিস: লিভার পুরোপুরি অকেজো হওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছায়।
৪. ক্যান্সার: শেষ পরিণতি হিসেবে লিভার ক্যান্সার দেখা দিতে পারে।
তরুণ প্রজন্মও রেহাই পাচ্ছে না
আগে ধারণা ছিল বয়স্কদের মধ্যেই লিভারের সমস্যা বেশি দেখা যায়। কিন্তু ল্যানসেটের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। নগরায়ন, প্যাকেটজাত খাবার এবং প্রসেসড ফুডের প্রতি ঝোঁক বর্তমান যুবসমাজকে এই বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই ঝুঁকি দ্রুতহারে বাড়ছে।
এরাজ্যে যে যে কারণে বাড়ছে এই অসুখ
ভুল খাদ্যাভ্যাস (কার্বোহাইড্রেট ট্র্যাপ): লাল চাল বা মিলেটের বদলে অতিরিক্ত সাদা চাল, ময়দা ও চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া।
স্কিনি ফ্যাট: অনেককে রোগা দেখালেও কায়িক শ্রমের অভাবে তাঁদের পেটের ভেতরের অঙ্গে (লিভারে) চর্বি জমে যাচ্ছে।
তেলেভাজা ও স্ট্রিট ফুড: রাস্তার চপ, সিঙাড়া বা রোলে ব্যবহৃত ট্রান্স ফ্যাট এবং বারবার পোড়ানো তেল লিভারের চরম শত্রু।
ডেলিভারি অ্যাপের দাপট: বাড়িতে রান্নার বদলে অনলাইন অ্যাপে রেস্তোরাঁর উচ্চ ক্যালরি ও বেশি লবণের খাবার খাওয়ার প্রবণতা।
ভিটামিন-ডি-র ঘাটতি: রোদে কম বেরোনো এবং সারাদিন এসিতে থাকার ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ছে, যা লিভারে চর্বি জমায়।
ভেষজ ওষুধের অপব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই যত্রতত্র ‘ডিটক্স’ বা আয়ুর্বেদিক সাপ্লিমেন্ট খাওয়া লিভারের জন্য বিষতুল্য হতে পারে।
জেনেটিক কারণ: দক্ষিণ এশীয় হিসেবে আমাদের বংশগতভাবেই অল্প ওজনে ডায়াবেটিস ও ফ্যাটি লিভার হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
লুকানো চিনি: তথাকথিত স্বাস্থ্যকর ফলের রস বা কোল্ড ড্রিংকসে থাকা ফ্রুক্টোজ সরাসরি লিভারের ক্ষতি করে।
মানসিক চাপ ও অনিদ্রা: রাত জাগা এবং অত্যধিক স্ট্রেস শরীরের বিপাকক্রিয়া নষ্ট করে মেদ বাড়াচ্ছে।
বাঁচার উপায় কী?
গবেষকদের মতে, ওষুধের চেয়েও এই রোগের অব্যর্থ প্রতিকার হল জীবনযাত্রা পরিবর্তন। "অল্প ওজন কমানোও ম্যাজিকের মতো কাজ করতে পারে। লিভারের ফ্যাট কমাতে সঠিক ডায়েট এবং নিয়মিত শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই।"
কী করবেন:
চিনি বা অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার ডায়েট থেকে বাদ দিন। সুগার ও প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখুন। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট কায়িক পরিশ্রম করুন।
স্ক্রিনিং জরুরি: নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। আগেভাগে ধরা পড়লে এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।
ফ্যাটি লিভার মানেই লিভার ক্যানসার নয়, কিন্তু অবহেলা করলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। ল্যানসেটের এই সতর্কবার্তা আসলে মানবজাতির জন্য এক অশনি সংকেত। এখন থেকেই সচেতন না হলে, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ লিভারের অসুখে ভুগবেন।
ল্যানসেট গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও হেপাটোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় ভুগছেন। তবে আসল ভয়টা লুকিয়ে আছে আগামীর পরিসংখ্যানে। চিকিৎসকদের দাবি, যে হারে ওবেসিটি এবং ডায়াবেটিস (বাড়ছে, তাতে ২০৫০ সালের মধ্যে এই আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছে যাবে ২০০ কোটিতে। অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি ৫ জন মানুষের মধ্যে ১ জন এই রোগে আক্রান্ত হবেন। তাই প্রায় অধিকাংশই আক্রান্ত হবেন ফ্যাটি লিভার ডিজিজে।
কেন হয় এই ‘মেটাবলিক’ লিভার ডিজিজ?
শরীরের বিপাকীয়সমস্যার কারণেই লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে। আগে একে শুধু লাইফস্টাইল জিডিড বলা হলেও, এখন একে বলা হচ্ছে ‘গ্লোবাল মেটাবলিক হেলথ ক্রাইসিস’। মূলত যে কারণগুলো এর নেপথ্যে দায়ী:
টাইপ ২ ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি লিভারের কোষের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
স্থূলতা ও হাই বিএমআই: শরীরের বাড়তি ওজন লিভারের চারধারে ফ্যাটের স্তর তৈরি করে।
উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল: মেটাবলিক সিনড্রোম লিভারের রক্ত সঞ্চালনেও ব্যাঘাত ঘটায়।
সেডেন্টারি লাইফস্টাইল: হাঁটাচলা না করা বা শরীরচর্চার অভাব এই রোগকে ত্বরান্বিত করছে।
লক্ষণ নেই, কিন্তু বিপদ মারাত্মক
এই রোগের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল এটি ‘সাইলেন্ট কিলার’। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনও লক্ষণই প্রকাশ পায় না। অনেকে বছরভর ফ্যাটি লিভার নিয়ে ঘোরেন, কিন্তু বুঝতেই পারেন না। যখন উপসর্গ ধরা দেয়, তখন রোগ পৌঁছে যায় পরের ধাপগুলোতে:
১. ইনফ্লামেশন (প্রদাহ): লিভার ফুলতে শুরু করে।
২. ফাইব্রোসিস: লিভারে ক্ষত বা স্কার তৈরি হয়।
৩. সিরোসিস: লিভার পুরোপুরি অকেজো হওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছায়।
৪. ক্যান্সার: শেষ পরিণতি হিসেবে লিভার ক্যান্সার দেখা দিতে পারে।
তরুণ প্রজন্মও রেহাই পাচ্ছে না
আগে ধারণা ছিল বয়স্কদের মধ্যেই লিভারের সমস্যা বেশি দেখা যায়। কিন্তু ল্যানসেটের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। নগরায়ন, প্যাকেটজাত খাবার এবং প্রসেসড ফুডের প্রতি ঝোঁক বর্তমান যুবসমাজকে এই বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই ঝুঁকি দ্রুতহারে বাড়ছে।
এরাজ্যে যে যে কারণে বাড়ছে এই অসুখ
ভুল খাদ্যাভ্যাস (কার্বোহাইড্রেট ট্র্যাপ): লাল চাল বা মিলেটের বদলে অতিরিক্ত সাদা চাল, ময়দা ও চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া।
স্কিনি ফ্যাট: অনেককে রোগা দেখালেও কায়িক শ্রমের অভাবে তাঁদের পেটের ভেতরের অঙ্গে (লিভারে) চর্বি জমে যাচ্ছে।
তেলেভাজা ও স্ট্রিট ফুড: রাস্তার চপ, সিঙাড়া বা রোলে ব্যবহৃত ট্রান্স ফ্যাট এবং বারবার পোড়ানো তেল লিভারের চরম শত্রু।
ডেলিভারি অ্যাপের দাপট: বাড়িতে রান্নার বদলে অনলাইন অ্যাপে রেস্তোরাঁর উচ্চ ক্যালরি ও বেশি লবণের খাবার খাওয়ার প্রবণতা।
ভিটামিন-ডি-র ঘাটতি: রোদে কম বেরোনো এবং সারাদিন এসিতে থাকার ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ছে, যা লিভারে চর্বি জমায়।
ভেষজ ওষুধের অপব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই যত্রতত্র ‘ডিটক্স’ বা আয়ুর্বেদিক সাপ্লিমেন্ট খাওয়া লিভারের জন্য বিষতুল্য হতে পারে।
জেনেটিক কারণ: দক্ষিণ এশীয় হিসেবে আমাদের বংশগতভাবেই অল্প ওজনে ডায়াবেটিস ও ফ্যাটি লিভার হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
লুকানো চিনি: তথাকথিত স্বাস্থ্যকর ফলের রস বা কোল্ড ড্রিংকসে থাকা ফ্রুক্টোজ সরাসরি লিভারের ক্ষতি করে।
মানসিক চাপ ও অনিদ্রা: রাত জাগা এবং অত্যধিক স্ট্রেস শরীরের বিপাকক্রিয়া নষ্ট করে মেদ বাড়াচ্ছে।
বাঁচার উপায় কী?
গবেষকদের মতে, ওষুধের চেয়েও এই রোগের অব্যর্থ প্রতিকার হল জীবনযাত্রা পরিবর্তন। "অল্প ওজন কমানোও ম্যাজিকের মতো কাজ করতে পারে। লিভারের ফ্যাট কমাতে সঠিক ডায়েট এবং নিয়মিত শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই।"
কী করবেন:
চিনি বা অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার ডায়েট থেকে বাদ দিন। সুগার ও প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখুন। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট কায়িক পরিশ্রম করুন।
স্ক্রিনিং জরুরি: নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। আগেভাগে ধরা পড়লে এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।
ফ্যাটি লিভার মানেই লিভার ক্যানসার নয়, কিন্তু অবহেলা করলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। ল্যানসেটের এই সতর্কবার্তা আসলে মানবজাতির জন্য এক অশনি সংকেত। এখন থেকেই সচেতন না হলে, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ লিভারের অসুখে ভুগবেন।
ফারহানা জেরিন