নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: অভাবের সংসার। জীবিকার তাগিদে বরফ বিক্রি শুরু করেছিলেন আজিজুর রহমান (৭০)। কিন্তু সেটা ভালো চলছিল না। বরফ বিক্রি ছেড়ে দিয়ে শুরু করলেন কদমার (এক ধরনের মিষ্টান্ন) ব্যবসা। সাইকেলে চড়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন সেই কদমা। ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক গ্রামে গিয়ে একজনের কাছে একটা বানর দেখতে পান। বানরটা দেখে খুব কৌতূহল হয় তাঁর। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন বানরটি বিভিন্ন খেলা দেখাতে পারে। শর্ত সাপেক্ষে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন বানরটিকে। সেই থেকে বানর খেলা দেখানো পেশা আজিজুরের।
৪২ বছর ধরে এভাবেই বিভিন্ন গ্রামে বানর খেলা দেখান চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার আজিজুর রহমান।
সম্প্রতি কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বানর নিয়ে বললেন নানা মিশ্র অভিজ্ঞতার কথা। আলাপচারিতায় জানা গেল, প্রতিদিন সকাল হলেই একটি সাইকেলে দুইটি বানর নিয়ে বের হয়ে যান তিনি। প্রচারণার জন্য সাইকেলে লাগানো থাকে একটি মাইক। সারাদিন এলাকার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে খেলা দেখান। গোমস্তাপুর ছাড়াও নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, ভোলাহাট, শিবগঞ্জ, পোরশা, নিয়ামতপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়ান। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ডেকে নিয়ে যায় খেলা দেখানোর জন্য। গ্রামে ঢুকেই মাইকে বানর খেলার ঘোষণা দিলেই ছোট ছোট বাচ্চারা জড়ো হয়ে যায়। বড়রাও এই খেলা উপভোগ করে৷
বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে খেলা দেখিয়ে কোনোদিন ১০০ টাকা আর ১ কেজি চাল, কোনোদিন ২ কেজি চাল ৩০০ টাকা। আবার কোনোদিন ৫০০ টাকা আর ৫ কেজি চাল পাওয়া যায়। এই আয়ের মধ্যে প্রতিদিন দুটো বানরকে ১০০-১৫০ টাকার খাবার খাওয়াতে হয়।
তিনি আরও জানালেন, এই বানর খেলা দেখাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। ভেঙেছেন এক পা। তারপরেও থেমে নেই তিনি।
আজিজুর রহমানের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আর ছেলররা বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। এখন স্ত্রী আর দুই বানর নিয়েই তাঁর জীবন সংসার।
আলাপচারিতায় জানালেন, প্রথম বানর আনার পর সেই বানর দিয়ে ১২ বছর খেলা দেখিয়েছেন। এরপর বানরটা মারা যায়। পরে সিরাজগঞ্জ গিয়ে আরেকটা বানর কিনে আনেন। বর্তমানে দুইটা বানর আছে। একটির নাম মৌসুমী আরেকটার নাম মধু। মৌসুমী খেলা দেখাতে পারে। মধু এখনও 'প্রশিক্ষণে' রয়েছে।
আজিজুর রহমান জানালেন, ৪২ বছর ধরে বানর খেলা দেখাতে দেখাতে বানরের সঙ্গে জীবনটা মিশে গেছে। এখন বানর ছাড়া একটা দিনও থাকতে পারবো না।
তিনি আরও জানালেন, 'মোবাইল ফোনের কারণে ছেলেপেলেরা আগের মতো আর বানর খেলা দেখতে চায় না। মাইকিং করেও জড়ো করা যায় না। মোবাইল ছেলেপেলেকে নষ্ট করে দিয়েছে। বেশিরভাগ ছেলেপেলে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। তাছাড়া নিজেরও বয়স হয়েছে। আগের মতো সাইকেল চালানো যায় না। এজন্য আগের চাইতে ইনকাম কমে গেছে। তারপরও টুকটাক খেলা দেখায়।'
নিজস্ব প্রতিবেদক