২৩ মে ২০২২, সোমবার, ১১:০২:০২ পূর্বাহ্ন


প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় লিঙ্গের নারীরা অভিনয়ে সুযোগ পাচ্ছে না!
তামান্না হাবিব নিশু :
  • আপডেট করা হয়েছে : ১০-০৫-২০২২
প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও  তৃতীয় লিঙ্গের নারীরা অভিনয়ে সুযোগ পাচ্ছে  না! প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় লিঙ্গের নারীরা অভিনয়ে সুযোগ পাচ্ছে না!


আলিয়া ভাটের ‘গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি’ ছবিতে রাজিয়া বাঈয়ের চরিত্রে বিজয় রাজের কাস্টিং নিয়ে বেশ কিছুদিন জোরালো চর্চা চলেছিল। অনেকেই বলছিলেন, তৃতীয় লিঙ্গের চরিত্র পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে কেন আজও পুরুষকেই নারী সাজানো হয়? ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এই লঘুতা থেকে আর কবে বেরিয়ে আসবে?

শুধু তো ‘গাঙ্গুবাই’ নয়, টলিউডের পর্দাতেও এই একই প্রতিফলন দেখা যায়। ‘নগরকীর্ত্তন’ ছবিতে তৃতীয় লিঙ্গের চরিত্রে দেখা গিয়েছিল ঋদ্ধি সেনকে। এমন আরও উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ইন্ডাস্ট্রির আনাচে কানাচে।

অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে অনেক। ছোট হোক বা বড়, আজকাল পর্দায় তৃতীয় লিঙ্গের চরিত্রে বাস্তব কাস্টিংও হচ্ছে। এমনকি কোথাও কোথাও নারী চরিত্রেই রূপান্তরিত নারীকে কাস্ট করা হয়েছে। হইচইয়ের নতুন ওয়েব সিরিজ ‘মন্টু পাইলট’-এর দ্বিতীয় সিজনে তেমনই এক চমকের নাম ‘সুজি’। সুজিত ভৌমিক। আপাদমস্তক নারী তিনি। হয়ে আসা নয়, হয়ে ওঠা নারী সুজিত। দেবালয় ভট্টাচার্যের পরিচালনায় ‘মন্টু পাইলট ২’-তে তাঁর কাস্টিং তাক লাগিয়ে দিয়েছে সকলকে। ধন্য ধন্য করছেন দর্শকরাও।

ওয়েব সিরিজের কাহিনি অনুযায়ী নীলকুঠির বেশ্যালয়ে বিবিজানের ডান হাত এই সুজি। স্বল্প স্ক্রিন টাইমেই নিজের সেরাটা দিয়েছেন তিনি। তাঁর অভিনয় প্রশংসিতও হয়েছে সমালোচক মহলে।

কিন্তু ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে ভারতীয় সমাজের, বিশেষত অভিনয় জগতের ভাবনাচিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে সরব হয়েছেন অভিনেত্রী সুজি। তাঁর বক্তব্য, এখনও সিনেমা বা সিরিয়ালে হাতেগোনা কিছু চরিত্রেই ডাক পড়ে তাঁর এবং তাঁর মতো বাকিদের। সাধারণ নারী-পুরুষের চরিত্রে কেন কোনও রূপান্তরিত নারী বা পুরুষ অভিনয়ের সুযোগ পান না? প্রশ্ন তুলেছেন সুজি।

নারী বা পুরুষের চরিত্র তো দূর, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তৃতীয় লিঙ্গের চরিত্রেও অভিনয়ের জন্য তাঁদের ডাক পড়ে না বলে জানিয়েছেন তিনি। ছেলেদের মেয়ের মতো সাজিয়ে তুলে ধরা হয় পর্দায়। ছক ভাঙা চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়োন সেই পুরুষ অভিনেতা। অথচ ওই একই চরিত্র হয়তো আরও বেশি জলজ্যান্ত হয়ে উঠতে কোনও সত্যিকারের তৃতীয় লিঙ্গের কাস্টিংয়ে।

এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ‘মন্টু পাইলট’-এর পরিচালক দেবালয় ভট্টাচার্যের প্রশংসা করেছেন সুজি। তবে তাঁর বক্তব্য, ইন্ডাস্ট্রির সকলেই যদি এমন করে ভাবেন, যদি যে কোনও চরিত্রেই রূপান্তরিত নারী বা পুরুষকে সত্যিকারের নারী বা পুরুষের মর্যাদা দেওয়া হয়, তবে তাঁদের কাজের সুযোগ ও পরিসর দুটোই বাড়বে। সমাজে আরও মন খুলে বাঁচতে পারবেন তাঁরা।

কিছুদিন আগে শহর কলকাতার বুকেই অপ্রীতিকর একটি ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল অভিনেত্রী সুজি ভৌমিককে। পার্কস্ট্রিট এলাকার একটি বিলাসবহুল হোটেলের নাইটক্লাবে সময় কাটাতে গিয়েছিলেন সুজি। প্রতি শুক্রবার পার্ক হোটেলের ‘তন্ত্রা’তে থাকে লেডিস নাইট। অর্থাৎ মেয়েদের জন্য প্রবেশ বিনামূল্যে। খবর পেয়ে সেখানেই শুক্রবার গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অভিযোগ, তাঁকে সেখানে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র ট্রান্স বলে, রূপান্তরিত নারী বলেই নাইটক্লাবে ঢুকতে পারেননি সুজি। রাতেই ফেসবুক লাইভ করে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। বলেন, ওই ‘তন্ত্রা’য় ঢুকতে গেলে প্রথমে কর্মচারীরা তাঁকে জানান সেদিন ক্লাব মেম্বার ছাড়া আর কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। পরে সুজি জানতে পারেন, ট্রান্স বলেই তাঁর সঙ্গে এই বঞ্চনা করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে যে মহিলারা ছিলেন তাঁদের পরে ওই ক্লাবে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। এতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন তিনি। ফেসবুক লাইভে গোটা বিষয়টি জানিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেন সমাজের দিকে। রূপান্তরিত নারী বলে তাঁদের সঙ্গে আজও পদে পদে কেমন বঞ্চনা করা হয় শুক্রবারের ঘটনাই তার প্রমাণ।

সুজি ভৌমিকের বক্তব্য, সমাজে এই বঞ্চনা নেই, আসলে সমাজের ঠেকেদাররাই এসবের মূলে রয়েছেন। ট্রান্সজেন্ডার শিল্পীদের সমাজে মাথা তোলার সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না। অভিনয় জগতে তাঁদের কালেভদ্রে ডাক পড়ে। কেন প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তা প্রদর্শনের সুযোগটুকুও পাবেন না সুজিরা? প্রশ্নটা উঠে গেল আরও একবার।