তালিকা হচ্ছে এলাকাবিচ্ছিন্ন এমপিদের


অনলাইন ডেস্ক , আপডেট করা হয়েছে : 02-03-2023

তালিকা হচ্ছে এলাকাবিচ্ছিন্ন এমপিদের

টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে হার্ডলাইনে হাঁটছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জন্য তালিকা করছেন এলাকাবিচ্ছিন্ন এমপিদের। প্রতি ছয় মাস পর পর জরিপ করছেন সরকারপ্রধান। বিভিন্ন সংস্থা ও প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব টিম এ জরিপ করছে। এসব জরিপের ভিত্তিতেই মিলবে আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন। বর্তমান সংসদে থাকা অনেক হেভিওয়েট এমপি-মন্ত্রী এ তালিকায় আছেন বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিগত যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে চ্যালেঞ্জিং হবে- এমন কথা দলীয় ফোরাম ও সংসদীয় দলের সভায় এমপি-নেতাদের জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সে জন্য দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় এমপিদের এলাকামুখী হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে সরকারের উন্নয়ন প্রচারে জোর দিয়েছেন তিনি। বেশির ভাগ এমপি সেই নির্দেশ উপেক্ষা করেছেন। বিগত কয়েকটি জরিপে অনেক এমপির বিরুদ্ধে ভয়াবহ তথ্য এসেছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করতে গিয়ে কোনো কোনো মন্ত্রী-এমপির কর্মকাণ্ডে বিস্মিত স্বয়ং দলীয় প্রধান। গত চার বছরে এক দিনের জন্যও এলাকায় যাননি মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য এমন তথ্যও পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, নির্বাচনী এলাকার নেতা-কর্মীরা ঢাকায় এসে এমপি-মন্ত্রীদের সাক্ষাৎ পান না। কারও কারও বাড়ির দরজা থাকে বন্ধ। এতে হতাশ তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।

তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই নৌকা নিয়ে এমপি হয়ে আর এলাকায় পা রাখেননি। কেউ কেউ বছরে একবার-দুবার গেলেও সরকারি প্রোগ্রাম শেষ করে ওইদিনই ঢাকায় চলে আসেন। দলীয় কার্যালয়ে পা রাখেননি কখনো। তারা তৃণমূল নেতা-কর্মীদের এড়িয়ে চলেন। তাদের ধারণা, নৌকা হলেই পাস করা যায়। দলীয় নেতা-কর্মীর প্রয়োজন পড়ে না। সে কারণে এলাকায় কোনো যোগাযোগ রাখেন না। অনেকেই নিজ এলাকার নেতা-কর্মীদের দম্ভোক্তি করে বলেন, আমার এমপি হওয়ার পেছনে ‘তোমাদের’ (তৃণমূল নেতা-কর্মী) অবদান কী? সে কারণে ফোন ধরার প্রয়োজনবোধও করেন না অনেকে। কেউ কেউ এলাকা দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন আত্মীয়-স্বজন, শ্যালক, ভগ্নিপতি, ভাই-ভাগিনাদের। এমন এমপিদের কেউ কেউ আবার মন্ত্রিসভায়ও রয়েছেন। শুধু তৃণমূল নেতা-কর্মীই নয়, আওয়ামী লীগের সিনিয়র একাধিক নেতা এমনকি মন্ত্রিসভার একাধিক সিনিয়র সদস্য কথা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, ‘অনেকেই মন্ত্রিসভায় আছেন, তারা এতই ব্যস্ত যে, দলের সিনিয়র নেতা কিংবা সিনিয়র মন্ত্রীদের ফোন ধরার সময় পান না। একাধিকবার ফোন করলে ফোন রিসিভ করেন সেসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর এপিএস। ‘স্যার মিটিংয়ে ব্যস্ত’-ব্যস। পরে কখনো ফোন ব্যাক করেন, কখনো সে সৌজন্যবোধটুকুও দেখান না কেউ কেউ।

সূত্রমতে, কোনো কোনো এমপি এলাকায় গেলেও দলীয় নেতা-কর্মী বাদ দিয়ে নিজস্ব বলয় নিয়ে চলাফেরা করেন। আওয়ামী লীগকে পাশ কাটিয়ে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ‘এমপি লীগ’ ‘ভাই লীগ’ ‘সহমত লীগ’ ‘আত্মীয় লীগ’ নিয়ে থাকেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেন। এসব এমপির বিরুদ্ধে মুখ খোলা শুরু করেছেন তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। কোনো কোনো এমপির বিরুদ্ধে দলীয় নেতা-কর্মীরা সংবাদ সম্মেলন করেছেন। কেউ কেউ লিখিত অভিযোগ করছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে। কোনো কোনো এমপির ইন্ধনে দলীয় নেতা-কর্মীও হত্যার শিকার হয়েছে মর্মে সংবাদ পরিবেশন হয়েছে। জলমহাল দখল, সরকারি খাস পুকুর দখল, বাড়িঘর দখলসহ নানা অভিযোগ উঠছে কোনো কোনো এমপির বিরুদ্ধে। আবার নির্বাচনী এলাকায় স্কুল, কলেজসহ হাটবাজারের নিয়ন্ত্রণ এমপিদের আত্মীয়-স্বজনদের কবজায়। ফলে নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগের স্তূপ জমা পড়ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই এমন অভিযোগ বাড়ছে।

 

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরামের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থীর ওপর এবার ভরসা করতে চান দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী পরিবর্তনের সম্ভাবনা অনেকটাই নিশ্চিত। কারণ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত এমপিদের বাদ দিয়ে উজ্জ্বল ভাবমূর্তির প্রার্থীর হাতে নৌকা তুলে দিতে পারলে জয়ের ব্যাপারে অনেকখানি নির্ভার থাকা যাবে। বিতর্কিত এমপিদের পরিবর্তন না করে আবারও মনোনয়ন দেওয়া হলে দলের ভাবমূর্তি যেমন নষ্ট হবে, তেমনই ওই প্রার্থীদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে। সে জন্য যাদের কারণে দলের ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে তারা ‘শাস্তিস্বরূপ’ আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার টিকিট পাবেন না বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের প্রধান, দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণতা ও দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়েছে, তেমনি দলকেও এগিয়ে নিতে চান তিনি। তাই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যারা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত, পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি এমন সম্ভাব্য ব্যক্তিদেরই নৌকা দেবেন বলে ধারণা। কোনোভাবেই এলাকা বিচ্ছিন্ন, অজনপ্রিয় ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দেবেন না।’

দল ও সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরামের একাধিক সূত্র জানায়, মন্ত্রী-এমপিদের কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহের এ কাজটি নিয়মিতই করা হয়। তাদের কর্মকাণ্ড মনিটরিং অতীতেও হয়েছে। কিন্তু অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছেন বর্তমান সংসদে সরকারি দলের অনেক এমপি। তারা বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের আওয়ামী লীগে এনে যেমন পুনর্বাসন করেছেন, তেমনি আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন পৃথক বলয়। তাদের ভেদ করে মন্ত্রী-এমপিদের কাছে যেতে পারেন না আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা। চলতি বছরের শেষে বা আগামী বছরের শুরুতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। এই নির্বাচনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকেই বেছে নেবেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপিকা ড. সুলতানা শফি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যার এলাকায় সুনাম রয়েছে, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত, দলীয় নেতা-কর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে-এমন ব্যক্তিকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া উচিত। কারণ, সৎ, যোগ্য ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলেই সহজে বিজয় লাভ করা সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, ‘যারা এলাকায় যান না, দলীয় নেতা-কর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক নেই তাদের মনোনয়ন দিলে জয়লাভের ঝুঁকি থাকে।’

দলীয় হাইকমান্ডের সূত্রগুলো আরও জানায়, আগামী নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পার পাওয়ার কোনো সুযোগ তারা আর এখন দেখছেন না। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন হয়েছে। আগামী দিনে এর প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে আগামী বছর অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন হতে পারে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামুখর। এ জন্য মন্ত্রী-এমপিদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা এ সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতই প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করছেন বলে জানা যায়। দলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে।


Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204  Thana : Motihar,Rajshahi
Email : [email protected], [email protected]