কাজ করতে করতে এক দিন মনে হল, এ ভাবে চলছে না আর। জীবন বড্ড একঘেয়ে। দিনের পর দিন সেই একঘেয়েমি বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো মনের জোর আর এক চিলতে অবশিষ্ট নেই। কারণ, মনে কিছুই দাগ কাটছে না। যা করছেন, যা দেখছেন, শুনছেন, অনুভব করছেন, তার কোনওটিই নাড়া দিচ্ছে না মস্তিষ্কে। ভাল লাগা তো নেই-ই, মন্দ বোধও হচ্ছে না আর। কোনও কিছুতে উৎসাহ নেই, নেই আশা। যা আছে, তা কেবলই একরাশ ‘না-থাকা’র সমষ্টি! এমন একটি শূন্যতা সমানে মাথায় টোকা দিতে শুরু করলে কী করতে ইচ্ছে করবে?
কারও মনে হতেই পারে সব ছেড়েছুড়ে ‘সন্ন্যাস’ নেওয়ার কথা। আবার কেউ নিজেকে ও ভাবেই টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেও পারেন— যত দূর টানা যায়। এক লেখিকা এমন পরিস্থিতিতে এক ‘কঠিন’ সিদ্ধান্ত নিলেন।
লেখিকার নাম এমা গ্যানন। তাঁর বাড়ি লন্ডনে। গল্প এবং প্রবন্ধ, দু’ই-ই লেখেন। জনপ্রিয় একটি পডকাস্ট চালান। নামী পত্রিকায় নিয়মিত কলামও বেরোয় তাঁর। অর্থনৈতিক ভাবে স্বচ্ছলই বলা চলে। ব্যক্তিগত জীবনেও অ-সুখের কারণ ঘটেনি তেমন। অন্তত যা যা ঘটলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা, তেমন কিছু তো নয়ই। আপাতদৃষ্টিতে ‘সুখী’ এমা এক দিন এক বন্ধুর সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন বিলাসবহুল রিসর্টে। সেখানে স্পা করানোর সময়ে তার প্রথম ‘প্যানিক অ্যাটাক’ হয়। জীবনে প্রথম এমন হল তাঁর। আচমকাই একটা শূন্যতাবোধ দুমড়েমুচড়ে দিতে শুরু করল তাঁর সম্পূর্ণ সত্তাকে। মনে হল, শরীরের সঙ্গে মনের আর বনছে না। রিসর্টের নয়নভিরাম পরিবেশ, স্পায়ের যত্ন— কোনও কিছুতেই শান্তি পেলেন না। এমা ক্রমশ ডুবে যেতে শুরু করলেন এক অজানা ভয়ের অন্ধকারে।
এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া স্বাভাবিক। এমাও গিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি জানতে পারেন তাঁর সমস্যার নাম। ওই যে দমবন্ধ অনুভূতি, অন্ধকারের মধ্যে ডুব যেতে যেতে প্রাণ খুলে শ্বাস নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা, শরীর থেকে মন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অনুভব— তা আদতে এক ধরনের মনোরোগ। কথ্য ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘বার্ন আউট’। যার আক্ষরিক অর্থ, প্রাণশক্তির ফুরিয়ে যাওয়া। তবে এ ক্ষেত্রে শরীরের নয়, শক্তি ফুরোয় মনের। মনোরোগ চিকিৎসক এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক শ্রীময়ী তরফদার বলছেন, ‘‘এমন ঘটনা যে কোনও মানুষের সঙ্গেই ঘটতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে তিনি সুখী কিংবা সফল হতেই পারেন। তার সঙ্গে বার্ন আউটের সম্পর্ক নেই কোনও। কর্পোরেট দুনিয়ায় অতিরিক্ত চাপে এমন বার্ন আউট হামেশাই হচ্ছে। যাঁরা সমস্যায় পড়ছেন, তাঁদের মনে হতেই পারে উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন, লক্ষ্যহীন এক শূন্য জীবন কাটাচ্ছেন।’’ ঠিক যেমনটি হয়েছিল ওই লেখিকার ক্ষেত্রেও।
এ সমস্যা মোকাবিলার অনেক ধরনের উপায় আছে। এমা যদিও কোনও সহজ রাস্তা নেননি। তিনি বলছেন, ‘‘সে দিন থেকে এক অদ্ভূত উদাসীনতা ভর করল আমার উপরে। বাড়ি ফিরে আমার প্রিয় বন্ধুকে দেখেও কোনও বিকার হল না। উল্টে নববর্ষ উদ্যাপনে বাজি পুড়তে দেখে আচমকাই প্রচণ্ড রেগে গিয়ে অশান্তি করলাম।’’ এমা বুঝতে পারছিলেন, সমস্যা বাড়ছে। বুকের উপর সব সময় একটা পাথর চেপে বসে আছে। মাঝে মধ্যেই সেই শূন্যতাবোধ ফিরে ফিরে আসছে। হচ্ছে প্যানিক অ্যাটাক। এই সব সমস্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাথার চুলও কমতে শুরু করল এক মাসের মধ্যে। এমা বলছেন, ‘‘নিজের অবস্থা দেখে নিজেই বিস্মিত হচ্ছিলাম। আর আমার কানে একটা কণ্ঠস্বর সমানে বলছিল, ‘এই জীবন তুমি চাওনি। তাই এই জীবনে এ বার ইতি টানা দরকার’।’’ শেষমেশ এমা সেই অন্তরাত্মার স্বরে সারা দিলেন। ঠিক করলেন, ওই জীবনে তিনি ইতি টানবেন।
বদল: সেখান থেকেই তাঁর জীবনের মোড় বদলে যাওয়ার শুরু। যদিও এমা তখনও তা জানতেন না। অনির্দিষ্ট কালের জন্য নিজেকে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিলেন লেখিকা। ঠিক করলেন, অন্তত একটি বছর কিচ্ছুটি করবেন না। লেখা নয়, পেশাগত দায়িত্ব নয়, সামাজিকতা নয়, কিচ্ছু নয়। যে কয়েকটি দায়িত্ব পালন না করলেই নয়, সেগুলি ছাড়া সব কাজ বাতিল করে দিলেন। ফলে বন্ধ হল তাঁর ছ’বছর ধরে তিলে তিলে খ্যাতি লাভ করা পডকাস্ট। বন্ধ হল নিয়মিত উপার্জনের জায়গাগুলিও। এমনকি, ছোটবেলার বন্ধুর বিয়েতেও গেলেন না।
টিকে থাকা: ফলে ওই একটি বছরে অনেক কিছু বদলাল তাঁর জীবনে। হাতে অর্থের জোগান নেই। তাই ব্যয় কমাতে হল। খাওয়া জরুরি। ফ্যাশন নয়। তাই খুব প্রয়োজনীয় না হলে পোশাক, প্রসাধনী কিছুই কিনতেন না। ওয়াইন খাওয়ার অভ্যাসটিও ছাড়তে হল। এ ছাড়া মুখ চালানোর জন্য যে সমস্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া হয়। তা-ও বন্ধ করতে হল। এমা বলছেন, ‘‘নিজেকে বললাম, ‘বাড়িতে অতিথি এলে তো চিপস-ভাজাভুজি খেতে দাও না। নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াও। সেটা নিজের জন্যই বা করবে না কেন।’ ফলে খাওয়ার রুটিন পুরোপুরি বদলাল।’’ খাওয়ার ব্যাপারে গোটা একটা বছর একটি বিষয়ই মাথায় রেখেছিলেন এমা। পুষ্টির অভাব যেন না হয়।
কান্না: তাঁর আবেগ সামলাতে সাহায্য করেছিল সুরের দুনিয়া। এমা বলছেন, ‘‘নিজে কী অনুভব করছি, তার সবটুকু নিজের কাছেই স্বীকার করতে পারতাম না। সব অনুভূতি চেপে রেখে দিতাম। গান আমার সেই সমস্ত অনুভূতির আগল খুলে দিল। বহু বছর পর প্রথম নিজের প্রত্যেকটা অনুভূতি সম্পূর্ণ অনুভব করতে শুরু করলাম আমি।’’ কাঁদার জন্য নানা রকমের দুঃখের গানের একটি প্লে লিস্ট বানিয়ে নিয়েছিলেন এমা। কারণ, তাঁর মতে, ‘‘মন খুলে কাঁদার জন্যও সাহস লাগে। সেটা সবাই পারে না।’’
বন্ধু: জীবনে বন্ধু থাকা দরকার। সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এটাই উপলব্ধি করেছিলেন এমা। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর জীবনের সেরা বন্ধুদের ওই সময়েই চিনেছেন তিনি। এমা বলছেন, ‘‘সেই সময় আমি পুরোপুরি বেকার ছিলাম। কিছুই করতাম না। অনেক সময় এমনও হত, কয়েক দিন স্নান করলাম না। একই প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিলাম হয়তো। আমাকে ওই ভাবে দেখেও যে বন্ধুরা সঙ্গ ছাড়েনি, পাশে এসে বসেছে, আমার কিছু না বলাকে পাত্তা দেয়নি— আজ তারাই আমার বন্ধু।’’ এমা মনে করেন, তাঁর ‘বার্ন আউট’ কাটিয়ে ওঠার ওই সময়কালে যে ক’টি প্রাপ্তি হয়েছে, তার একটি অবশ্যই ওই বন্ধুরা।’’
আবিষ্কার: ওই একটি বছরকে এমা ব্যাখ্যা করেছেন ‘ইয়ার অফ নাথিং’ বা ‘শূন্যের বছর’ বলে। আর শূন্যের বছরেই সেরা জিনিসটি খুঁজে পেয়েছেন তিনি। এমা জানিয়েছেন, সেটা নিজেকে আবিষ্কার। ওই সময়টায় এমা ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর পুরনো বাড়িতে, যেখানে তাঁর বাল্যকাল থেকে যৌবন ছোঁয়া বছরগুলি কেটেছে। এমা বলেছেন, ‘‘অল্পবয়সি আমি যেখানে সময় কাটাতে ভালবাসতাম, সেখানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছি।’’ ফলে তাজা হয়েছে স্মৃতি। কমবয়সি এমা যে স্বপ্ন দেখতেন, যে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতেন, তা নতুন করে মনে পড়েছে। যা জীবনের লক্ষ্য নতুন করে খুঁজে পেতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে তাঁকে। হয়তো সে জন্যই এখন এমার অফিসের র্যাকে রাখা থাকে ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় বই, তাঁর হাতে বানানোর পুঁতির গয়না সাজানো থাকে তাঁর শোওয়ার ঘরের দেওয়ালে। যাতে তাঁর নিজেকে খুঁজে পেতে আর অসুবিধা না হয়।
জীবনবোধ: ‘বার্ন আউট’-এর পর্ব এখন অতীত। এমা জীবনকে নতুন করে দেখতে শুরু করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ওই একটি বছর আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল তাঁর জীবনে। আসলে যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিই ভাল থাকার উপায় শিখিয়ে দিয়ে যায়। এমা তাঁর ওই এক বছরের জীবন নিয়ে একটি বইও লিখেছেন। সেখানে তিনি বলছেন, ‘‘এখনও আমি প্রতি সপ্তাহে সময় বার করে নিজের সঙ্গে একান্তে কথা বলি। নিজেকে প্রশ্ন করি, ভাল আছো তো? কেমন চলছে সব? তাতে নিজের খেয়াল রাখতে সুবিধা হয়।’’
বার্ন আউট আসলে কী?
মনরোগ চিকিৎসক শ্রীময়ী বলছেন, ‘‘মনস্তত্ত্বের ক্লাসে আমরা এই অবস্থাকে বোঝানোর সময় বলি— ‘একটা বাতিকে যদি দু’দিক থেকে জ্বালানো হয় তবে তো তা তাড়াতাড়ি পুড়ে যাবেই’। বার্ন আউট আসলে তা-ই। যখন মানুষ নিজের ক্ষমতার থেকে বেশি করতে শুরু করেন, সেটা যেমন ব্যক্তিগত জীবনে হতে পারে, পেশা জীবনেও হতে পারে, তখনই আচমকা মনে হতে পারে আর কিছু করার ক্ষমতা নেই।’’ তার কারণ, ক্ষমতার বেশি কাজ করতে করতে মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
সমাধান কী ভাবে?
এমা যা করেছেন, সে ভাবে অনেকেই ‘বার্ন আউট’-এর সমস্যা সামলাচ্ছেন এ যুগে। শ্রীময়ী বলছেন, ‘‘অনেকেই তো এক বছর কাজ থেকে ছুটি নিচ্ছেন আজকাল। যাকে বলে সাবাটিকাল। এ ধরনের সাবাটিকাল কর্পোরেট দুনিয়ায় খুবই প্রচলিত এখন।’’ কিন্তু সব ছেড়েছুড়ে একটা বছর থাকা কি সত্যিই সম্ভব এ যুগে? মনবিদ জানাচ্ছেন, সম্ভব। তাঁর কথায়, ‘‘এটা তো নতুন কিছু নয় একেবারেই। আর তা ছাড়া এই রীতি তো আমাদের সংস্কৃতিতে অনেক দিন ধরেই রয়েছ। হাওয়াবদল করতে এক বছর কাশী যেতেন মানুষ। কিংবা মাস ছ’য়েক থেকে আসতেন দেওঘরে। সেও তো এক ধরনের সাবাটিকাল-ই।’’
তবে এর পাশাপাশি নিজেকে সময় দেওয়াও জরুরি বলে মনে করছেন মনোবিদ। তিনি বলছেন, ‘‘বার্ন আউট যাতে না হয় তার জন্য আমরা ২৪ ঘণ্টাকে তিনটি আট ঘণ্টায় ভেঙে নিতে বলি। আট ঘণ্টা ঘুম এবং বিশ্রামের জন্য। আট ঘণ্টা কাজের জন্য। আর বাকি আট ঘণ্টা বাকি সবকিছুর জন্য। এটা যদি করতে পারেন, তবে বার্ন আউটের মতো সমস্যা তৈরি হবে না।’’
এছাড়া ‘বার্ন আউট’-এর মতো মানসিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করার জন্য নিজেকে চেনাটা, নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে জানাটাও জরুরি বলে জানাচ্ছেন মনোরোগ চিকিৎসক রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বলছেন, ‘‘এই ধরনের সমস্যায় নিজে কী চাইছেন, সেটা বুঝতে পারলেই অর্ধেক লড়াই জেতা হয়ে যায়। তবে সেটা বুঝতে না পারলে একটু সময় নিয়ে একটু জায়গা বদল করলেও অনেক সময় দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে সুবিধা হয়।’’
কারও মনে হতেই পারে সব ছেড়েছুড়ে ‘সন্ন্যাস’ নেওয়ার কথা। আবার কেউ নিজেকে ও ভাবেই টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেও পারেন— যত দূর টানা যায়। এক লেখিকা এমন পরিস্থিতিতে এক ‘কঠিন’ সিদ্ধান্ত নিলেন।
লেখিকার নাম এমা গ্যানন। তাঁর বাড়ি লন্ডনে। গল্প এবং প্রবন্ধ, দু’ই-ই লেখেন। জনপ্রিয় একটি পডকাস্ট চালান। নামী পত্রিকায় নিয়মিত কলামও বেরোয় তাঁর। অর্থনৈতিক ভাবে স্বচ্ছলই বলা চলে। ব্যক্তিগত জীবনেও অ-সুখের কারণ ঘটেনি তেমন। অন্তত যা যা ঘটলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা, তেমন কিছু তো নয়ই। আপাতদৃষ্টিতে ‘সুখী’ এমা এক দিন এক বন্ধুর সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন বিলাসবহুল রিসর্টে। সেখানে স্পা করানোর সময়ে তার প্রথম ‘প্যানিক অ্যাটাক’ হয়। জীবনে প্রথম এমন হল তাঁর। আচমকাই একটা শূন্যতাবোধ দুমড়েমুচড়ে দিতে শুরু করল তাঁর সম্পূর্ণ সত্তাকে। মনে হল, শরীরের সঙ্গে মনের আর বনছে না। রিসর্টের নয়নভিরাম পরিবেশ, স্পায়ের যত্ন— কোনও কিছুতেই শান্তি পেলেন না। এমা ক্রমশ ডুবে যেতে শুরু করলেন এক অজানা ভয়ের অন্ধকারে।
এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া স্বাভাবিক। এমাও গিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি জানতে পারেন তাঁর সমস্যার নাম। ওই যে দমবন্ধ অনুভূতি, অন্ধকারের মধ্যে ডুব যেতে যেতে প্রাণ খুলে শ্বাস নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা, শরীর থেকে মন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অনুভব— তা আদতে এক ধরনের মনোরোগ। কথ্য ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘বার্ন আউট’। যার আক্ষরিক অর্থ, প্রাণশক্তির ফুরিয়ে যাওয়া। তবে এ ক্ষেত্রে শরীরের নয়, শক্তি ফুরোয় মনের। মনোরোগ চিকিৎসক এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক শ্রীময়ী তরফদার বলছেন, ‘‘এমন ঘটনা যে কোনও মানুষের সঙ্গেই ঘটতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে তিনি সুখী কিংবা সফল হতেই পারেন। তার সঙ্গে বার্ন আউটের সম্পর্ক নেই কোনও। কর্পোরেট দুনিয়ায় অতিরিক্ত চাপে এমন বার্ন আউট হামেশাই হচ্ছে। যাঁরা সমস্যায় পড়ছেন, তাঁদের মনে হতেই পারে উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন, লক্ষ্যহীন এক শূন্য জীবন কাটাচ্ছেন।’’ ঠিক যেমনটি হয়েছিল ওই লেখিকার ক্ষেত্রেও।
এ সমস্যা মোকাবিলার অনেক ধরনের উপায় আছে। এমা যদিও কোনও সহজ রাস্তা নেননি। তিনি বলছেন, ‘‘সে দিন থেকে এক অদ্ভূত উদাসীনতা ভর করল আমার উপরে। বাড়ি ফিরে আমার প্রিয় বন্ধুকে দেখেও কোনও বিকার হল না। উল্টে নববর্ষ উদ্যাপনে বাজি পুড়তে দেখে আচমকাই প্রচণ্ড রেগে গিয়ে অশান্তি করলাম।’’ এমা বুঝতে পারছিলেন, সমস্যা বাড়ছে। বুকের উপর সব সময় একটা পাথর চেপে বসে আছে। মাঝে মধ্যেই সেই শূন্যতাবোধ ফিরে ফিরে আসছে। হচ্ছে প্যানিক অ্যাটাক। এই সব সমস্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাথার চুলও কমতে শুরু করল এক মাসের মধ্যে। এমা বলছেন, ‘‘নিজের অবস্থা দেখে নিজেই বিস্মিত হচ্ছিলাম। আর আমার কানে একটা কণ্ঠস্বর সমানে বলছিল, ‘এই জীবন তুমি চাওনি। তাই এই জীবনে এ বার ইতি টানা দরকার’।’’ শেষমেশ এমা সেই অন্তরাত্মার স্বরে সারা দিলেন। ঠিক করলেন, ওই জীবনে তিনি ইতি টানবেন।
বদল: সেখান থেকেই তাঁর জীবনের মোড় বদলে যাওয়ার শুরু। যদিও এমা তখনও তা জানতেন না। অনির্দিষ্ট কালের জন্য নিজেকে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিলেন লেখিকা। ঠিক করলেন, অন্তত একটি বছর কিচ্ছুটি করবেন না। লেখা নয়, পেশাগত দায়িত্ব নয়, সামাজিকতা নয়, কিচ্ছু নয়। যে কয়েকটি দায়িত্ব পালন না করলেই নয়, সেগুলি ছাড়া সব কাজ বাতিল করে দিলেন। ফলে বন্ধ হল তাঁর ছ’বছর ধরে তিলে তিলে খ্যাতি লাভ করা পডকাস্ট। বন্ধ হল নিয়মিত উপার্জনের জায়গাগুলিও। এমনকি, ছোটবেলার বন্ধুর বিয়েতেও গেলেন না।
টিকে থাকা: ফলে ওই একটি বছরে অনেক কিছু বদলাল তাঁর জীবনে। হাতে অর্থের জোগান নেই। তাই ব্যয় কমাতে হল। খাওয়া জরুরি। ফ্যাশন নয়। তাই খুব প্রয়োজনীয় না হলে পোশাক, প্রসাধনী কিছুই কিনতেন না। ওয়াইন খাওয়ার অভ্যাসটিও ছাড়তে হল। এ ছাড়া মুখ চালানোর জন্য যে সমস্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া হয়। তা-ও বন্ধ করতে হল। এমা বলছেন, ‘‘নিজেকে বললাম, ‘বাড়িতে অতিথি এলে তো চিপস-ভাজাভুজি খেতে দাও না। নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াও। সেটা নিজের জন্যই বা করবে না কেন।’ ফলে খাওয়ার রুটিন পুরোপুরি বদলাল।’’ খাওয়ার ব্যাপারে গোটা একটা বছর একটি বিষয়ই মাথায় রেখেছিলেন এমা। পুষ্টির অভাব যেন না হয়।
কান্না: তাঁর আবেগ সামলাতে সাহায্য করেছিল সুরের দুনিয়া। এমা বলছেন, ‘‘নিজে কী অনুভব করছি, তার সবটুকু নিজের কাছেই স্বীকার করতে পারতাম না। সব অনুভূতি চেপে রেখে দিতাম। গান আমার সেই সমস্ত অনুভূতির আগল খুলে দিল। বহু বছর পর প্রথম নিজের প্রত্যেকটা অনুভূতি সম্পূর্ণ অনুভব করতে শুরু করলাম আমি।’’ কাঁদার জন্য নানা রকমের দুঃখের গানের একটি প্লে লিস্ট বানিয়ে নিয়েছিলেন এমা। কারণ, তাঁর মতে, ‘‘মন খুলে কাঁদার জন্যও সাহস লাগে। সেটা সবাই পারে না।’’
বন্ধু: জীবনে বন্ধু থাকা দরকার। সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এটাই উপলব্ধি করেছিলেন এমা। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর জীবনের সেরা বন্ধুদের ওই সময়েই চিনেছেন তিনি। এমা বলছেন, ‘‘সেই সময় আমি পুরোপুরি বেকার ছিলাম। কিছুই করতাম না। অনেক সময় এমনও হত, কয়েক দিন স্নান করলাম না। একই প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিলাম হয়তো। আমাকে ওই ভাবে দেখেও যে বন্ধুরা সঙ্গ ছাড়েনি, পাশে এসে বসেছে, আমার কিছু না বলাকে পাত্তা দেয়নি— আজ তারাই আমার বন্ধু।’’ এমা মনে করেন, তাঁর ‘বার্ন আউট’ কাটিয়ে ওঠার ওই সময়কালে যে ক’টি প্রাপ্তি হয়েছে, তার একটি অবশ্যই ওই বন্ধুরা।’’
আবিষ্কার: ওই একটি বছরকে এমা ব্যাখ্যা করেছেন ‘ইয়ার অফ নাথিং’ বা ‘শূন্যের বছর’ বলে। আর শূন্যের বছরেই সেরা জিনিসটি খুঁজে পেয়েছেন তিনি। এমা জানিয়েছেন, সেটা নিজেকে আবিষ্কার। ওই সময়টায় এমা ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর পুরনো বাড়িতে, যেখানে তাঁর বাল্যকাল থেকে যৌবন ছোঁয়া বছরগুলি কেটেছে। এমা বলেছেন, ‘‘অল্পবয়সি আমি যেখানে সময় কাটাতে ভালবাসতাম, সেখানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছি।’’ ফলে তাজা হয়েছে স্মৃতি। কমবয়সি এমা যে স্বপ্ন দেখতেন, যে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতেন, তা নতুন করে মনে পড়েছে। যা জীবনের লক্ষ্য নতুন করে খুঁজে পেতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে তাঁকে। হয়তো সে জন্যই এখন এমার অফিসের র্যাকে রাখা থাকে ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় বই, তাঁর হাতে বানানোর পুঁতির গয়না সাজানো থাকে তাঁর শোওয়ার ঘরের দেওয়ালে। যাতে তাঁর নিজেকে খুঁজে পেতে আর অসুবিধা না হয়।
জীবনবোধ: ‘বার্ন আউট’-এর পর্ব এখন অতীত। এমা জীবনকে নতুন করে দেখতে শুরু করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ওই একটি বছর আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল তাঁর জীবনে। আসলে যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিই ভাল থাকার উপায় শিখিয়ে দিয়ে যায়। এমা তাঁর ওই এক বছরের জীবন নিয়ে একটি বইও লিখেছেন। সেখানে তিনি বলছেন, ‘‘এখনও আমি প্রতি সপ্তাহে সময় বার করে নিজের সঙ্গে একান্তে কথা বলি। নিজেকে প্রশ্ন করি, ভাল আছো তো? কেমন চলছে সব? তাতে নিজের খেয়াল রাখতে সুবিধা হয়।’’
বার্ন আউট আসলে কী?
মনরোগ চিকিৎসক শ্রীময়ী বলছেন, ‘‘মনস্তত্ত্বের ক্লাসে আমরা এই অবস্থাকে বোঝানোর সময় বলি— ‘একটা বাতিকে যদি দু’দিক থেকে জ্বালানো হয় তবে তো তা তাড়াতাড়ি পুড়ে যাবেই’। বার্ন আউট আসলে তা-ই। যখন মানুষ নিজের ক্ষমতার থেকে বেশি করতে শুরু করেন, সেটা যেমন ব্যক্তিগত জীবনে হতে পারে, পেশা জীবনেও হতে পারে, তখনই আচমকা মনে হতে পারে আর কিছু করার ক্ষমতা নেই।’’ তার কারণ, ক্ষমতার বেশি কাজ করতে করতে মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
সমাধান কী ভাবে?
এমা যা করেছেন, সে ভাবে অনেকেই ‘বার্ন আউট’-এর সমস্যা সামলাচ্ছেন এ যুগে। শ্রীময়ী বলছেন, ‘‘অনেকেই তো এক বছর কাজ থেকে ছুটি নিচ্ছেন আজকাল। যাকে বলে সাবাটিকাল। এ ধরনের সাবাটিকাল কর্পোরেট দুনিয়ায় খুবই প্রচলিত এখন।’’ কিন্তু সব ছেড়েছুড়ে একটা বছর থাকা কি সত্যিই সম্ভব এ যুগে? মনবিদ জানাচ্ছেন, সম্ভব। তাঁর কথায়, ‘‘এটা তো নতুন কিছু নয় একেবারেই। আর তা ছাড়া এই রীতি তো আমাদের সংস্কৃতিতে অনেক দিন ধরেই রয়েছ। হাওয়াবদল করতে এক বছর কাশী যেতেন মানুষ। কিংবা মাস ছ’য়েক থেকে আসতেন দেওঘরে। সেও তো এক ধরনের সাবাটিকাল-ই।’’
তবে এর পাশাপাশি নিজেকে সময় দেওয়াও জরুরি বলে মনে করছেন মনোবিদ। তিনি বলছেন, ‘‘বার্ন আউট যাতে না হয় তার জন্য আমরা ২৪ ঘণ্টাকে তিনটি আট ঘণ্টায় ভেঙে নিতে বলি। আট ঘণ্টা ঘুম এবং বিশ্রামের জন্য। আট ঘণ্টা কাজের জন্য। আর বাকি আট ঘণ্টা বাকি সবকিছুর জন্য। এটা যদি করতে পারেন, তবে বার্ন আউটের মতো সমস্যা তৈরি হবে না।’’
এছাড়া ‘বার্ন আউট’-এর মতো মানসিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করার জন্য নিজেকে চেনাটা, নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে জানাটাও জরুরি বলে জানাচ্ছেন মনোরোগ চিকিৎসক রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বলছেন, ‘‘এই ধরনের সমস্যায় নিজে কী চাইছেন, সেটা বুঝতে পারলেই অর্ধেক লড়াই জেতা হয়ে যায়। তবে সেটা বুঝতে না পারলে একটু সময় নিয়ে একটু জায়গা বদল করলেও অনেক সময় দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে সুবিধা হয়।’’