রাণীশংকৈলে ব্যাপক সরিষার আবাদ; হলুদে মোড়া গোটা উপজেলা, স্বপ্ন বুনছেন কৃষকেরা

আপলোড সময় : ২৯-০১-২০২৬ ০৩:৪২:০২ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৯-০১-২০২৬ ০৩:৪২:০২ অপরাহ্ন
শীতের নরম রোদে দূরের মাঠ যেন সোনালি ক্যানভাস। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে দুলছে সরিষার ফুল, বাতাসে যেন তাদের নীরব আশ্বাস— “ভয় নেই, এ বছর ফসল ভালোই হবে।” ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার মাঠজুড়ে এখন এমনই স্বপ্নময় দৃশ্য। এই হলুদ শুধু প্রকৃতির রঙ নয়, কৃষকের বুকভরা আশারও রঙ।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দিগন্তজোড়া মাঠ যেন হলুদের গালিচা। ফুলে ফুলে ভরা ক্ষেতে মৌমাছির গুঞ্জন, প্রজাপতির ওড়াউড়ি আর সকালের শিশিরভেজা রোদ—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজেই উৎসব করছে। এই সৌন্দর্য দেখতে ও ছবি তুলতে ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরাও।

এ বিষয়ে উপসহকারী কৃষি অফিসার সাদেকুল ইমলাম বরেন,এ বিষয়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাদেকুল ইসলাম বলেন, সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছির চাষ করলে সরিষার ফলন গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহের সময় পরাগায়নে সহায়তা করে, ফলে গাছে শুঁটি ও দানার পরিমাণ বাড়ে। এতে কৃষক যেমন বেশি ফলন পান, তেমনি মৌচাষিরাও একই ক্ষেত থেকে বিনা অতিরিক্ত খরচে মধু সংগ্রহ করে লাভবান হচ্ছেন। অর্থাৎ, একই জমি থেকে ফসল ও মধু—দুই দিকেই অর্থনৈতিক সুফল মিলছে।

এ বিষয়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকদের সঙ্গে কথা হলে তারা সরিষা চাষের লাভজনক দিকগুলো তুলে ধরেন। নন্দুয়ার ইউনিয়নের পয়গাম বিএসসি, বাচোর ইউনিয়নের আবু সালেহ, লেহেম্বা ইউনিয়নের রওশন আলী, হোসেনগাঁও ইউনিয়নের আব্দুল খালেক এবং ধর্মগড় ইউনিয়নের নাসরিন বেগম জানান, সরিষা চাষে খরচ তুলনামূলক খুবই কম।

তাদের ভাষায়, জমিতে চাষ দেওয়ার সময় শুধু গোবর সার ব্যবহার করলেই চলে। এরপর বীজ ছিটিয়ে দিলেই গাছ জন্মে যায়। গাছ কিছুটা বড় হলে একবার সেচ দিলেই ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। সাধারণত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার বা কীটনাশক তেমন প্রয়োজন হয় না।

কৃষকেরা আরও জানান, কম খরচ ও কম ঝুঁকির কারণে এবার অনেকেই সরিষা চাষে আগ্রহী হয়েছেন। বিশেষ করে কৃষি বিভাগের উদ্যোগে অনেক চাষি উচ্চফলনশীল সরিষার বীজ বিনামূল্যে পাওয়ায় আবাদ আরও বেড়েছে।

ফলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা হাসিমুখে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “বিঘাপ্রতি ৭ থেকে ৯ মণ ফলন তো হবেই, ইনশাল্লাহ।”

আমন ধান কাটার পর যে জমি একসময় পতিত থাকত, এখন সেখানেই সরিষা চাষ করে কৃষকেরা পাচ্ছেন বাড়তি আয়ের সুযোগ। স্বল্প খরচ, কম পরিচর্যা ও স্বল্প সময়ে ফলন—এই তিন কারণেই সরিষা এখন স্বপ্নের ফসল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৭,১২৫ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। অধিকাংশ কৃষক বারি-১৪, বারি-১৭, বারি-২০ ও বিনা-১১ জাতের সরিষা চাষ করছেন। দ্রুত ফলনশীল হওয়ায় বারি-১৪ জাতের প্রতি আগ্রহ বেশি।

অনন্তপুরের রবিউল মানিক, বনগাঁওয়ের গয়গাম বিএসসি, সুরেন চন্দ্র, আকবর আলীসহ অনেকেই বড় পরিসরে চাষ করেছেন। সফল কৃষক পয়গাম আলী মাস্টার বলেন, “বিঘাপ্রতি খরচ ৩–৩.৫ হাজার টাকা। গাছ ভালো হয়েছে, আবহাওয়া ঠিক থাকলে ফলনও ভালো হবে, ইনশাল্লাহ।”

হোসেনগাঁওয়ের কৃষক সাঈদ আলী জানান, গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় এবারও সরিষা চাষে আগ্রহ বেড়েছে। সরিষার মাঠ ঘিরে জমে উঠেছে মৌচাষও। ৩–৪টি স্থানে প্রায় ৪০০ মৌবাক্স বসানো হয়েছে। এতে পরাগায়ন বাড়ছে, ফলন বাড়ছে ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত। পাশাপাশি মৌচাষিরা পাচ্ছেন মধু—এক মাঠে যেন দুই ফসল, তেল আর মধু।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শহীদুল ইসলাম জানান, ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরকার তেলজাতীয় ফসলের আবাদ বাড়াচ্ছে। একটি প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। গত এক বছরে উৎপাদন দেড়গুণ বেড়েছে এবং উপজেলার ৪০–৫০ শতাংশ সরিষার চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম বলেন, এ বছর সরিষার আবাদ ব্যাপক হয়েছে এবং কৃষকদের সহায়তায় সরকারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। সব মিলিয়ে, রাণীশংকৈলের মাঠে এখন শুধু সরিষার ফুল নয়—ফুটে আছে কৃষকের ভবিষ্যতের স্বপ্নও। হলুদের এই সমারোহ যেন জানিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতি আর পরিশ্রম একসঙ্গে থাকলে ফসলও হাসে, মানুষও হাসে।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]