চরে যুবককে গুলি করে হত্যা, কুষ্টিয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলন ঘিরে সন্ত্রাস ও প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে উদ্বেগ

আপলোড সময় : ০৭-০১-২০২৬ ০৭:০২:৩২ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৭-০১-২০২৬ ০৭:০২:৩২ অপরাহ্ন
নাটোরের লালপুর উপজেলায় গভীর রাতে বাড়িতে ঢুকে গুলি করে সোহেল রানা (৩৭) নামের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তার স্ত্রী সোনালী খাতুন (৩০) গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। পুলিশ ধারণা করছে, পদ্মার চরাঞ্চলে খড় কাটা নিয়ে আগে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জের ধরে এটি প্রতিশোধমূলক হামলা।

ঘটনাটি ঘটে শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ১২টার দিকে লালপুর উপজেলার বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নের করারি নওশারা চরে। দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে সোহেল রানাকে লক্ষ্য করে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। আহত স্ত্রীকে উদ্ধার করে রাজশাহীর বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানান, তার হাতে গুলির আঘাত রয়েছে।

নিহত সোহেল রানা বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নের করারি নওশারা গ্রামের কালু মণ্ডলের ছেলে। পুলিশ বলছে, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের সহিংস প্রেক্ষাপট। এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তবর্তী খানপুর-হবিরচর অঞ্চলের পদ্মার চরে খড় কাটা নিয়ে গোলাগুলি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় খানপুরের মিনহাজ মণ্ডলের ছেলে আমান মণ্ডল (৩৬) এবং শুকুর মণ্ডলের ছেলে নাজমুল হোসেন (৩৩) নিহত হন। পরদিন হবিরচর এলাকা থেকে কুষ্টিয়ার লিটন হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা, ওই ঘটনায় জড়িত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা আবারও প্রতিশোধ নিতে এই হামলা চালিয়েছে। বাঘা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুপ্রভাত মণ্ডল বলেন, আগের হত্যাকাণ্ডের জের ধরেই রাতে বাড়িতে ঢুকে সোহেল রানাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন।

এদিকে, পদ্মা নদী ঘিরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড ও দখলদারিত্ব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের চৌদ্দহাজার মৌজায় হাইকোর্ট, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে ড্রেজার ও বলগেট দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনীর পাহারায় এই বালু উত্তোলন পরিচালিত হচ্ছে, যার পেছনে রয়েছে রাজশাহী ও কুষ্টিয়া জেলার নিষিদ্ধঘোষিত একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী চক্র। এর ফলে নদীভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে হাজারো পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নদী রক্ষা বাঁধও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চৌদ্দহাজার মৌজায় আধিপত্য বিস্তার ও অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করেই অতীতে ট্রিপল মার্ডার-এর মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। যৌথবাহিনীর অভিযানে কিছুদিন স্বস্তি এলেও পরে আবার বালু উত্তোলন ও সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু হয়। যার জেরে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে জানান তারা।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নিষিদ্ধঘোষিত সাবেক নেতা ও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনীকে পৃষ্ঠপোষকতা করে এই অবৈধ বালু ব্যবসা পরিচালনা করছেন। অভিযোগ উঠেছে, মেসার্স সরকার ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান এই কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহীর লক্ষীনগর মৌজায় ২৪ একর বৈধ ইজারা পেলেও সেখানে বালু না থাকায় পদ্মার অপর পাড় কুষ্টিয়ার মরিচা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এতে গিট্টু সোহাগ বাহিনী নামে পরিচিত এক অস্ত্রধারী দলের সদস্যদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ১১ জুলাই কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ফয়জুল্লাহপুর ঘাটে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আমরুল গাইন নামে এক ব্যক্তি আহত হন। এ ঘটনায় মামলা দায়ের হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি।

এ বিষয়ে মেসার্স সরকার ট্রেডার্স-এর মালিক এস. এম. একলাস আহমেদ বলেন, আমি রাজশাহীর বাঘায় বৈধ ইজারা নিয়েছি। ইজারার বাইরে অন্য কোথাও বালু উত্তোলন হলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। বিষয়টি আমি দেখছি।

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহ বলেন, আমি সদ্য যোগ দিয়েছি। দৌলতপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের তথ্য পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজশাহী জেলা প্রশাসক জানান, ইজারাকৃত এলাকার বাইরে যেকোনো স্থানে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ইজারার ২৪ একরের বাইরে বালু উত্তোলন হলে তা বেআইনি।

নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার বিএম নুরুজ্জামান বলেন, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যদি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে, তাহলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তারা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নের চরাঞ্চলের মানুষ আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]