ঘরের তালা খুলে পরিষ্কার করছিলেন শাহাদাত হোসেন। ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেল মেঝেতে আলু; মাচা করে রাখা হয়েছে পেঁয়াজ; দেয়ালে ঝুলছে রসুনের আঁটি।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার লারোপাড়া গুচ্ছগ্রামের এ ঘরটি বরাদ্দ পেয়েছেন শাহাদাত হোসেন। সেখানে তিনি থাকেন না। ফসল রাখার গুদাম বানিয়েছেন। মারিয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন।
প্রকল্প ঘুরে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শাহাদাতের মতো অনেকেই বাড়ি থাকা সত্ত্বেও ভূমিহীনদের বরাদ্দ ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন। ভূমিহীন বাছাইয়ে নানান অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি এর কারণ বলছেন বঞ্চিত অনেকে।
বেশির ভাগ ঘরে তালা। বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু ঘর। কয়েকটি ঘর ভাড়া নিয়ে রাখা হয়েছে মুদির মাল, রিকশা ভ্যান। ফসল রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন কেউ কেউ। রাখা হয়েছে রান্নার খড়িও।
মারিয়া গ্রামের সাত্তার মণ্ডল পৈতৃক ভিটায় পাকা বাড়ি করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন। এর পরও তাঁকে লারোপাড়া আশ্রয়ণে একটি ঘর দেওয়া হয়েছে। শুধু রাতের বেলায় খোলা হয় বলে জানিয়েছেন পাশের ঘরের ভাড়াটিয়া আছিয়া বিবি। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, ছাত্তারের ঘরে যে লোক বাস করে, তার পরিচয় কারও জানা নেই। গভীর রাতে আসে আবার ভোরে চলে যায়। পাশের ঘরটি ভাদু নামে একজনের ছিল। সেখানে এখন আনোয়ারা বিবি নামে একজন বাস করে।
১৪ হাজার টাকায় ঘরটি ভাদু আনোয়ারার কাছে বিক্রি করেছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আনোয়ারা বিবি ও ভাদু। এদিকে সাত্তার মণ্ডল জানেন না, তাঁর নামে একটি ঘর বরাদ্দ আছে। লালপুর গ্রামের চন্দ্র বিবির নামে বরাদ্দ ঘরটির তালা কোনোদিনই খোলা হয়নি বলে জানিয়েছেন পাশের বাসিন্দা জোসনা বিবি।
২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় তিন দফায় ৪৮৬ জনকে ঘর দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে বড়বিহানলী ইউনিয়নে ৯৯টি, গোবিন্দপাড়ায় ৫৩, আউচপাড়ায় ৪২, শ্রীপুরে ৭৪, বাসুপাড়ায় ৯, শুভডাঙ্গায় ২৩, মারিয়াতে ৪২, গনিপুরে ৬৪, ঝিকড়ায় ১৮, গোয়ালকান্দিতে ১৪, হামিরকুৎসায় ৮, যোগীপাড়ায় ৩০ ও সোনাডাঙ্গাতে ১০টি।
প্রথম পর্যায়ে নির্মাণ ব্যয় ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ আহমেদ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যোগসাজশ করে কোনো ঠিকাদার নিয়োগ না দিয়ে ঘরগুলো নির্মাণ করেছিলেন।
কয়েক বছরেই এসব ঘরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। প্লাস্টার খসে পড়ছে। ছাদ ধসে গেছে। টিনের চালা দিয়ে পানি পড়ে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় এ অবস্থা বলছেন শ্রীপতিপাড়া গ্রামের জসিম মণ্ডল। অনিয়মের প্রতিবাদ করায় চেয়ারম্যান তাঁকে হয়রানি করেন বলে জানান তিনি।
যোগীপাড়া ইউনিয়নের বীরকুৎসা গ্রামের প্রতিবন্ধী জয়ন্তী রানী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের জন্য বারবার ইউএনও অফিসে দরখাস্ত দিয়েও পাননি। তখনকার ইউএনও শরিফ আহমেদ বলেছিলেন, এর পর বরাদ্দ এলে ঘর দেওয়া হবে। পরে আর তাঁকে ঘর দেওয়া হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, ঘরগুলো অনেক আগে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে ঘর হস্তান্তরের পর সুফলভোগীরাই এটি ব্যবহার করবেন। ঘর বিক্রয় বা অন্য কারও বসবাসের নিয়ম নেই। কেউ এ নিয়ম ভঙ্গ করলে তাদের ঘর প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হবে।