আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হচ্ছে সুন্দরবনের ৭ জলজ প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স

আপলোড সময় : ২২-১০-২০২৬ ০৪:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২২-১০-২০২৬ ০৪:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের জলজ ভাণ্ডারে যুক্ত হলো এক নতুন ও ঐতিহাসিক মাইলফলক। সুন্দরবনের পানিতে নতুন করে পাওয়া ৫ প্রজাতির মাছ ও ২ প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে যুক্ত হতে যাচ্ছে। যা বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য গবেষণায় এক অনন্য উদ্ভাবন ও নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।

আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে সুন্দরবনের নতুন প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স অন্তর্ভুক্তিকরণ দেশের পরিবেশ ও মৎস্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আগামী মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য এক কর্মশালায় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে গবেষণার ফলাফল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করবেন গবেষক দল। এরপরই অপেক্ষা করছে জিন ব্যাংকে যুক্ত হওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

‘সুন্দরবনের জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক ১৬ মাসব্যাপী এক বিস্তৃত গবেষণায় এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের ‘সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) এবং আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করে। সম্প্রতি খুলনায় অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণার খসড়া তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। যেখানে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।

গবেষক দল ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ মাস সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের ৬৫টি নদী ও খাল জরীপ করেন। এছাড়া বনের ভেতরে ৪২৪ কিলোমিটার এলাকায় নৌকা দিয়ে এবং শ্যামনগর, কয়রা, মংলা ও শরণখোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে।

গবেষক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বলেন, গবেষণার পর আমরা পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ি আমেরিকার আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে আপলোডের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু যেহেতু বিষয়টি বন বিভাগের, তাই আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য প্রকল্পের চূড়ান্ত কর্মশালায় বন ও পরিবেশ মন্ত্রীর উপস্থিতিতে গবেষণার ফলাফল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরবর্তীতে সরকারিভাবে বন বিভাগের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে উল্লিখিত সাত প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স স্থান পাবে।

তিনি বলেন, এর আগেও সুন্দরবনের ১৪১ প্রজাতির মাছের ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হয়েছে। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল কোরিয়ার সহযোগিতায় বন বিভাগের সাথে সমন্বয় করে গবেষণা সম্পন্ন করেন। উপযুক্ত পরিবেশ ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবনের এই জলজ সম্পদ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ডিএনএ বারকোডিং ও নতুন প্রজাতির আবিষ্কার

গবেষক দলটি সুন্দরবনের ৩০ প্রজাতির মাছ ও ১১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর ডিএনএ বারকোড তৈরি করেছেন। এর অংশ হিসেবে ৮৩টি মাছের নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমার জন্য সম্পূর্ণ নতুন পাঁচটি মাছ ও দুইটি চিংড়ির প্রজাতি নথিবদ্ধ করা হয়। যাদের ডিএনএ সিকোয়েন্স আগে বিশ্বের কোনো আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে ছিল না।

আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে এই তথ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বিশ্বের কাছে সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা সুন্দরবনের এসব প্রজাতির ওপর আরও নিখুঁত গবেষণা চালাতে পারবেন।

নতুন আবিষ্কৃত মাছগুলো হলো; বড় আইশ পারশে, ফোটা বাটা, বার্মিজ এক ঠ্ইুটা, কুলি বেলে বা চ্যাপ্টা মাথা বেলে এবং সবুজ ফোঁটা বেলে । এ ছাড়া পাওয়া গেছে সম্পূর্ণ নতুন দুই প্রজাতির চিংড়ি। এগুলো হচ্ছে- মাকড়সা চিংড়ি ও ফোঁটা চিংড়ি পোকা।

গবেষণায় সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জে (শরণখোলা, সাতক্ষীরা, খুলনা ও চাঁদপাই) জলজ সম্পদের অবস্থা, প্রজনন মৌসুম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, শরণখোলা রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি প্রজাতির বৈচিত্র্য (১৬৪ প্রজাতি) রয়েছে। তবে বেশ কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ ও নদী-খালে বিষ প্রয়োগের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে প্রাকৃতিক মাছের মজুত হুমকিতে পড়ছে।

জলজ সম্পদের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার নতুন এই গবেষণার মাধ্যমে সুন্দরবনে মোট ২৫১ প্রজাতির মাছ ও ৫১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর ফলে আগের গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে সুন্দরবনে এখন মোট ৩৮২ প্রজাতির সাদা মাছ এবং ৮৮ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর (চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, অক্টোপাস ও স্কুইড) সন্ধান মিলল।

সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ

গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মরফো-মলিকুলার পদ্ধতিতে মাইটোকন্ড্রিয়াল (কোনো জীবের প্রজাতি নিখুঁতভাবে শনাক্তকরণের একটি আধুনিক ও সমন্বিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি) পদ্ধতিতে এগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মরফোলজিক্যাল (বাহ্যিক গঠনগত) এবং মলিকুলার (ডিএনএ বা জিনগত) এই দুটি পদ্ধতিকে একত্রে ব্যবহার করে কোনো জীবের নিখুঁত ট্যাক্সোনমিক শ্রেণিবিন্যাস করা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মোট ৮৩টি মাছ ও ২৮টি ক্রাস্টাশিয়ান নমুনা শনাক্ত করা হয়। এতে ৩০ প্রজাতির মাছ এবং ১১ প্রজাতির ক্রাস্টাশিয়ানস (খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী) সহ মোট ৪১টি প্রজাতির বারকোড সিকোয়েন্স তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের রেফারেন্সের সাথে এসব সিকোয়েন্সের নিউক্লিওটাইড (ডিএনএ এবং আরএনএ নামক নিউক্লিক অ্যাসিডের মৌলিক গাঠনিক একক বা মনোমার) মিল পাওয়া গেছে ৯৮.১৯% থেকে ১০০% পর্যন্ত।

গবেষকরা জানান, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলের জলজ প্রাণীর জিনোম ডেটাবেজ আন্তর্জাতিক পরিম-লে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে। যা ভবিষ্যতে প্রজাতির সুরক্ষা, অবৈধ শিকার রোধ ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত আহরণ, পোনা মাছ ধরা এবং ক্ষতিকর বিষ প্রয়োগের ফলে ভেটকি, পোয়া, পাঙাশের মতো বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বড় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। সুন্দরবনের এই জলজ ভা-ার টিকিয়ে রাখতে গবেষণা প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে।

সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতি আহরণের সীমা নির্ধারণ এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করা, বিষ প্রয়োগ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা, প্রজনন নিশ্চিত করতে নতুন বাস্তুসংস্থানগতভাবে উপযুক্ত খালকে (যেমন: খোদিয়াখালী, আঠারোবেকি, আরমাল ও কাগাবোগা খাল) ‘সংরক্ষিত খাল’ হিসেবে ঘোষণা করা এবং বন নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা।

সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই নতুন অর্জন সুন্দরবনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী সুন্দরবনের জলজ সম্পদ রক্ষায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

জানা যায়, সুন্দরবনের মাছের প্রজাতি শনাক্তকরণ এবং জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।

প্রধান ডিএনএ বারকোডিং প্রকল্প (২০২০-২০২১)

২০২০ এবং ২০২১ সালের দিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর উপর একটি বড় গবেষণা পরিচালনা করেন। তারা সুন্দরবনের মাছের প্রজাতি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে ডিএনএ বারকোডিং পদ্ধতি ব্যবহার করেন। সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া ও শামুক-ঝিনুকের ওপর ডিএনএ বারকোডিং করা হয়।

সেই গবেষণার অংশ হিসেবে সুন্দরবনের লোনা ও আধা-লোনা পানির প্রায় ১২০টি জেনেরা ও ৬৫টি বিভিন্ন জলজ প্রাণীর (যার সিংহভাগই মাছ) মোট ১৮৫টি মাইটোকন্ড্রিয়াল সিকোয়েন্স এবং ৫৯টি আরএনএ সিকোয়েন্সের তথ্য আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : rajshahirsomoy@gmail.com,                    md.masudrana2008@gmail.com