‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব’

আপলোড সময় : ২২-০৯-২০২৬ ০৬:৩১:৪৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২২-০৯-২০২৬ ০৬:৩১:৪৮ অপরাহ্ন
খুলনায় ডেঙ্গুতে দুই অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের দুজনেরই গর্ভের সন্তানকে বাঁচানো যায়নি। একদিকে ছয় বছরের রওদার প্রশ্ন ‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব?’ অন্যদিকে দেড় বছরের কেয়া এখনো বুঝতেই পারছে না, কেন তার ‘সোনা মা’ আর ফিরে আসছেন না। দুই পরিবারের শোক যেন আটকে আছে ছোট ছোট শিশুদের নিষ্পাপ প্রশ্নে।

খুলনা নগরের সিদ্দিকীয়া মহল্লার কাছেই নাহিদ হাসানদের পারিবারিক ভবন। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছে নাহিদ হাসান ও নুসরাত জাহান দম্পতির দুই সন্তান বড় ছেলে রাইয়ান হাসান ও ছয় বছরের রওদা হাসান।
রাইয়ান কিছুটা শোকাচ্ছন্ন। মায়ের চলে যাওয়ার অর্থ সে বুঝতে পারছে। তবে ছয় বছরের রওদা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, কেন তার মা আর ঘরে ফিরছেন না। তাই মাঝেমধ্যে স্বজনদের কাছে জানতে চায়, ‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব?’

এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই পরিবারের কারও কাছে।

নাহিদের বড় ভাই মাহমুদ হাসান সোহেল বলেন, ওদের সুখের সংসার ছিল। নতুন সদস্যের আগমন নিয়ে আমরা সবাই উচ্ছ্বসিত ছিলাম। কীভাবে কী হয়ে গেল, এখনো বুঝতে পারছি না। ছোট মেয়েটার জন্য বেশি খারাপ লাগছে। মাঝেমধ্যে ও প্রশ্ন করছে, আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব?

নাহিদ হাসান ও নুসরাত জাহান দম্পতির তৃতীয় সন্তান আসার অপেক্ষায় ছিল পুরো পরিবার। চিকিৎসকের পরামর্শে ২০ সেপ্টেম্বর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের তারিখও নির্ধারণ করা হয়েছিল। অনাগত সন্তানের নামও ঠিক করে রেখেছিল পরিবার। নতুন অতিথিকে বরণ করতে ঘরজুড়ে চলছিল প্রস্তুতি। এর মধ্যেই হঠাৎ বদলে যায় সবকিছু।

১৮ সেপ্টেম্বর নুসরাতের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তার রক্তের প্লাটিলেট কমে ৬২ হাজারে নেমে যায়। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন অবস্থার অবনতি হলে প্রয়োজন হয় আইসিইউর।

স্বজনেরা জানান, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে চেষ্টা করেও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত নুসরাতকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে অ্যাম্বুলেন্সে রওনা হন তাঁর স্বামী নাহিদ। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ভাঙ্গার কাছে নিস্তেজ হয়ে পড়েন নুসরাত।

পরে তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। বাঁচানো যায়নি তাঁর গর্ভের সন্তানকেও।

নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি বটিয়াঘাটার ইউসুফিয়া দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। গর্ভধারণের পর চাকরি ছেড়ে দেন। সন্তানদের নিয়েই ছিল তাঁর ব্যস্ততা।

এর মধ্যে বড় ছেলে রাইয়ানের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল ১৫ সেপ্টেম্বর। অন্য শিশুদের মশা থেকে দূরে রাখতে নুসরাতই সবচেয়ে বেশি সতর্ক করতেন বলে জানান স্বজনেরা।

নাহিদ হাসান খুলনার গ্রামীণফোন সেন্টারের ডেপুটি ইনচার্জ হিসেবে কাজ করেন। স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে হারিয়ে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি তিনি।

নাহিদ বলেন, কীভাবে কী হয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারছি না!

নুসরাতের মতোই আরেকটি পরিবারেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তবে সেই শূন্যতার অর্থ বোঝার বয়স হয়নি দেড় বছরের কেয়া নামের শিশুটির।

খুলনা নগরের বসুপাড়ায় সাদিয়া আফরিন সুমাইয়ার বাবার বাড়ি। দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের পর সেখানেই ছিলেন তিনি। তার স্বামী শেখ ইশতিয়াজ সম্রাট পেশায় আইনজীবী। তাদের দেড় বছরের মেয়ে কেয়া।

কয়েক দিন ধরে জ্বর ছিল সুমাইয়ার। একই সময়ে তার মা-বাবাও অসুস্থ ছিলেন। ১৬ সেপ্টেম্বর তার মায়ের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর বাবারও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।

নিজের জ্বরকে গর্ভকালীন কোনো সমস্যা ভেবেছিলেন সুমাইয়া। তাই হাসপাতালে যাননি।

১৯ সেপ্টেম্বর রাতে হঠাৎ তার শরীরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। স্বজনেরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আইসিইউ শয্যা না থাকায় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হয় স্বজনদের। কোথাও শয্যা খালি না থাকায় শেষ পর্যন্ত তাকে লেবার ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।

পরদিন ভোরে মারা যান সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সুমাইয়া। তার গর্ভের সন্তানকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

মায়ের মৃত্যুর পরও বিষয়টি বুঝতে পারেনি ছোট্ট কেয়া। সে শুধু মাকে খুঁজছে। একটু পরপর স্বজনদের কাছে জানতে চাইছে, আমার সোনা মা কোথায়?

সুমাইয়ার এক স্বজন জানান, শেষ সময়ে তাকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কোথাও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি। শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষাও করা হয়নি।

সুমাইয়ার মৃত্যুসনদে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান স্বজনেরা।

এখন কেয়া আছে তার খালা মারজিয়ার কাছে। পরিবারের সদস্যরা তাকে আগলে রাখছেন। তবে মায়ের অনুপস্থিতির কারণ এখনো বুঝতে পারছে না শিশুটি।

মারজিয়া বলেন, মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি এখনো বুঝতে পারছে না কেয়া। একটু পরপর বলছে, আমার সোনা মা কোথায়?

দুই পরিবারের ঘরেই এখন নতুন অতিথির অপেক্ষার বদলে শোক। এক ঘরে ছয় বছরের রওদার প্রশ্ন আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব? আর অন্য ঘরে দেড় বছরের কেয়া খুঁজে ফিরছে তার ‘সোনা মা’কে। দুই শিশুর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছেন স্বজনেরাও।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]