জলবায়ু সংকট বুঝি, সহনশীল শহরের স্বপ্ন দেখি, চোখে দেখা শহর, মনে আকা শহর বিষয়ক রচনা প্রতিযোগিতা

আপলোড সময় : ২২-০৯-২০২৬ ০৫:৪৪:১২ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২২-০৯-২০২৬ ০৫:৪৪:১২ অপরাহ্ন
‘জলবায়ু সংকট বুঝি, সহনশীল শহরের স্বপ্ন দেখি-চোখে দেখা শহর, মনে আঁকা শহর’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজশাহীতে স্কুল পর্যায়ে রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিজেদের দেখা নগর, নগর নিয়ে তাদের ভাবনা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের শহর কেমন হওয়া উচিত- সেই চিন্তাগুলো লেখার মাধ্যমে তুলে ধরার সুযোগ করে দিতে এ আয়োজন করেছে বারসিক।

রাজশাহীর পদ্মা আবাসিক এলাকার সাইদুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজে এ রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় আজ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। এতে বিদ্যালয়ের ৭ম, ৮ম, ৯ম ও ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে। প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেদের কল্পনার নগর, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পরিবেশ, শিক্ষা, নারী-পুরুষের সমতা এবং সুন্দর ও নিরাপদ নগর নিয়ে তাদের ভাবনা খাতায় তুলে ধরে।

রচনায় শিক্ষার্থীরা শুধু একটি সুন্দর শহরের কথা বলেনি বরং তারা তাদের প্রতিদিনের দেখা শহরের বিভিন্ন সমস্যা এবং ভবিষ্যতে কেমন শহর দেখতে চায়, সেই বিষয়গুলোও তুলে ধরে। কারও স্বপ্নের শহর সবুজে ঘেরা, কারও কাছে শহর হবে শিক্ষাবান্ধব, আবার কেউ চেয়েছে এমন একটি নগর যেখানে নারীরা নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে চলাফেরা করতে পারবে। শিক্ষার্থীদের এসব ভাবনায় পরিবেশ, নাগরিক সুবিধা, শিক্ষা, সমতা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রতিযোগিতা শেষে প্রতিটি শ্রেণি থেকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হয়। বিজয়ী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার হিসেবে শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে জ্যামিতি বক্সসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা হয়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয় এবং তারা নিজেদের চিন্তা ও সৃজনশীলতা আরও সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

বিদ্যালয়ের পরিচালক ও প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের প্রচলিত পড়াশোনার পাশাপাশি নতুন করে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। তারা যখন নিজের শহর, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শেখে, তখন তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, নিজেদের চারপাশের পরিবেশ ও সমাজকে বোঝার সুযোগও এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হলে তারা ভবিষ্যতে নিজেদের সমাজ ও নগর উন্নয়নে আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মেহেদি হাসান বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে সহায়তা করবে। রচনা লেখার মাধ্যমে তারা নিজের চিন্তা গুছিয়ে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে কোনো বিষয়কে নিজের মতো করে ভাবা এবং সেই ভাবনাকে লিখিতভাবে প্রকাশ করার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে, যা তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ জীবনে কাজে লাগবে।

রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান নুপুর প্রথম স্থান অধিকার করে। নিজের স্বপ্নের শহর সম্পর্কে সে বলে,
“আমি চাই আমার স্বপ্নের শহর হবে সবুজ, যেখানে থাকবে গাছ আর গাছ। গাছ দিয়ে শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে বাইরের পর্যটকরাও। এতে পরিবেশ দূষণ কম হবে এবং শহরটি মানুষের বসবাসের জন্য আরও সুন্দর ও আরামদায়ক হবে।”

৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিয়া তাবাসসুম তাকিয়া দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। সে বলে, “আমি শিক্ষাবান্ধব নগর চাই, যেখানে শিক্ষার জন্য কাউকে ভোগান্তি পোহাতে হবে না। সবার জন্য ভালো শিক্ষার সুযোগ থাকবে এবং শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারবে।”

৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিউল আল মাহদী তৃতীয় স্থান অধিকার করে। নিজের ভাবনা তুলে ধরে সে বলে, “আমি এমন একটি শহর চাই যেখানে নারীদের সবাই সম্মান করবে। নারীরা যেন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে এবং তাদের মতামত ও অধিকারকে সবাই গুরুত্ব দেয়।”

শিক্ষার্থীদের এসব বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তাদের কাছে একটি সুন্দর শহর শুধু বড় বড় ভবন, রাস্তা কিংবা উন্নত অবকাঠামোর শহর নয়। বরং তাদের স্বপ্নের শহরে থাকতে হবে গাছপালা ও নির্মল পরিবেশ, শিক্ষার সুযোগ, নিরাপত্তা, সম্মান ও মানুষের জন্য বসবাসযোগ্য পরিবেশ। ছোট বয়সেই তারা নিজেদের শহর নিয়ে যে চিন্তা করছে, তা ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা ও জলবায়ু সহনশীল নগর গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

বারসিকের সহযোগী কর্মসূচি কর্মকর্তা অমিত সরকার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও নগর সংকট সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে সচেতন করা এবং তাদের ভাবনায় একটি নিরাপদ, সবুজ ও জলবায়ু-সহনশীল নগরের স্বপ্ন তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নগর গড়ে তুলবে। তাই তাদের চিন্তা, স্বপ্ন ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে জলবায়ু সহনশীল নগর গঠনে তাদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।”

বারসিকের সহযোগী কর্মসূচি কর্মকর্তা তহুরা খাতুন লিলি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আজকের এই চিন্তাগুলোই আগামী দিনের উজ্জ্বল নক্ষত্র। সবাই মিলে আমাদের এই সুন্দর চিন্তাগুলো বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যেতে হবে। আজকে তোমাদের চিন্তাগুলো তোমাদের রচনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি। তোমাদের স্বপ্ন ও ভাবনাগুলো নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই।” তিনি আরও বলেন, শিশু-কিশোরদের শুধু জলবায়ু পরিবর্তন বা নগর সংকটের কথা জানালেই হবে না, তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ভাবনা প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। তারা তাদের চারপাশে যে সমস্যাগুলো দেখে, সেগুলো থেকেই অনেক সময় ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমাধানের চিন্তা তৈরি করতে পারে। রচনা প্রতিযোগিতার মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের সেই চিন্তাগুলো প্রকাশের একটি সহজ সুযোগ তৈরি করে।

একটি সুন্দর ও সহনশীল নগর গড়ে তোলার জন্য শুধু বড়দের পরিকল্পনাই যথেষ্ট নয়। শিশু-কিশোরদের চিন্তা ও স্বপ্নকেও সেই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারণ তারা যে শহরে বেড়ে উঠছে, আগামী দিনে সেই শহরেরই দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। তাই ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ, জলবায়ু, নাগরিক অধিকার ও সুন্দর নগর নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দেখা শহরের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ভাবার পাশাপাশি একটি ভবিষ্যৎ নগরের স্বপ্ন তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। তাদের রচনায় সবুজ শহর, পরিবেশ দূষণমুক্ত নগর, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ, যানজট মুক্ত, নারীর নিরাপত্তা ও সম্মানসহ বিভিন্ন প্রত্যাশার কথা উঠে আসে। এসব ভাবনা থেকে বোঝা যায়, আগামী প্রজন্ম শুধু নিজেদের জন্য নয়, বরং সবার জন্য একটি সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য শহর দেখতে চায়।

এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি তাদের সৃজনশীল চিন্তা, মতামত প্রকাশের সক্ষমতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের নগর কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে শিশু-কিশোরদের ভাবনাগুলো সামনে আসে।

শিক্ষার্থীদের খাতায় লেখা সেই স্বপ্নের শহর হয়তো এখনো কাগজেই রয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন, চিন্তা ও প্রত্যাশাগুলোই একদিন বাস্তবের শহরকে আরও সবুজ, নিরাপদ, মানবিক ও জলবায়ু সহনশীল করে তোলার পথ দেখাতে পারবে।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]