পোশাকের নীচে লুকিয়ে থাকে, তবুও দাম কয়েকশো কোটি

আপলোড সময় : ০৩-০৯-২০২৬ ০১:৩৯:৪৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৩-০৯-২০২৬ ০১:৩৯:৪৬ অপরাহ্ন
নতুন পোশাক পরে কেমন দেখতে লাগছে বা ওই পোশাকটি কতটা আরামপ্রদ, তা বোঝার জন্য হাজার বার আয়নার সামনে দাঁড়ান অনেকেই! কিন্তু অন্তর্বাস নিয়ে ততটা মাথা ঘামান কি? কখনও ভেবে দেখেছেন, কেউ অন্তর্বাসের পিছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করবেন কেন?

ফ্যাশনিস্তাদের কাছে কিন্তু অন্তর্বাসই হতে পারে স্টাইল স্টেটমেন্ট! এর জন্য তাঁরা বিপুল টাকা খরচ করতেই পারেন। রা অন্তর্বাস এখন আর রাখঢাকের বিষয় নয়, এমন অনেক কায়দার অন্তর্বাস আছে, যা ফ্যাশন জগতে নজর কেড়েছে বিভিন্ন সময়ে। তবে হ্যাঁ, হিরে আর রত্নপাথর বসানো সেই অন্তর্বাসগুলি কতটা আরামের হবে, তা বলা না গেলেও সেগুলির দাম কিন্তু আকাশছোঁয়া। বিশ্বের সবচেয়ে দামি অন্তর্বাসগুলি দেখতে কেমন, কতই বা দাম তাদের, রইল ঝলক।

২০২৩ সালে প্যারিস ফ্যাশন উইকে ইটালীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘মিউ মিউ’ এমন এক ধরনের জমকালো ও অভিনব অন্তর্বাস প্রদর্শন করে, যা দেখে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ঝড় ওঠে। ‘দ্য ক্রাউন’-খ্যাত তারকা এমা করিনের পরনে দেখা যায় সেই জমকালো অন্তর্বাসটি। সোনালি রঙের চকচকে চুমকির কারুকাজে সজ্জিত এই অন্তর্বাসটি ছিল সত্যিই নজরকাড়া।

ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকার মিউ মিউ-এর সিক্যুইন-বসানো অন্তর্বাস পরে র‌্যাম্প দুর্দান্ত অভিষেক ঘটান এমা করিন। ফ্যাশনের জগতে এই সাহসী পদক্ষেপটি এক গভীর ছাপ ফেলে। সংস্থাটি এর একটি কর্ডুরয় সংস্করণও বাজারে এনেছিল। তবে সত্যি বলতে, অন্তর্বাস হিসেবে এর ব্যবহারিক উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তা সত্ত্বেও, ফ্যাশনপ্রেমীদের মন কেড়েছে এমন কায়দার অন্তর্বাস।

সুজ়ান রোজেনের ডায়মন্ড বিকিনি: বিকিনি মানেই যে সমুদ্রসৈকতের পোশাক, তা কিন্তু সবসময় তা নয়। ২০১২ সালে নিউ ইয়র্কের অলঙ্কারশিল্পী সুজ়ান রোজেন সাঁতারের পোশাকের ধারণাকে একেবারে বদলে দিয়ে বানিয়ে ফেলেন ডায়মন্ড বিকিনি। আমেরিকান মডেল মলি সিমস সেই বিকিনি পরে নজর কেড়েছিলেন ফ্যাশনদুনিয়ায়। এটি সাধারণ টু-পিস পোশাক ছিল না, বিকিনিতে প্ল্যাটিনামের উপর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বসানো ১৫০ ক্যারেটেরও বেশি ওজনের ‘ডি-ফ্ললেস’ হিরের এক অপূর্ব সমাহার।

এই বিকিনির দাম ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২৮৫ কোটি টাকা। ‘গিনেজ় বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ এই বিকিনিটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দামি বিকিনির তালিকার অর্ধেক জুড়ে হয়তো ‘ভিক্টোরিয়া’জ় সিক্রেট’-এর আধিপত্য থাকতে পারে, কিন্তু হীরকখচিত এই অনন্য সৃষ্টিটি তালিকার শীর্ষস্থান দখল করে আছে। এই বিকিনি দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে— সমুদ্রতীরে কেবল সবার নজর কাড়ার জন্য কে-ই বা এত বিপুল অর্থ ব্যয় করবেন?

জেজ়েল বান্ডচেনের ফ্যান্টাসি বিকিনি: অন্তর্বাসের ব্যাপারে সুপারমডেল জেজ়েল বান্ডচেন কেবল সবার নজরই কাড়েননি, ইতিহাসও গড়েছেন! ২০০০ সালের ‘ভিক্টোরিয়া’জ় সিক্রেট ফ্যাশন শো’-তে বান্ডচেনের পরা চুনি ও হিরে খচিত অন্তর্বাসটির দাম ছিল ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪২ কোটি টাকা।

এরকম অন্তর্বাস যে কোনও রত্নভাণ্ডারের সঙ্গে পাল্লা দিতে সক্ষম। ‘গিনেজ় বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ সর্বকালের সবচেয়ে দামি অন্তর্বাস হিসেবে এরও উল্লেখ পাওয়া যায়। ঝকমকে এই অন্তর্বাসে ব্যবহার করা হয়েছিল ১,৩০০টি মূল্যবান পাথর, যার মধ্যে ছিল ৩০০ ক্যারেটের চোখধাঁধানো তাই চুনি ও হিরে।

হাইডি ক্লুমের দ্য হেভেনলি স্টার ব্রা: র‍্যাম্পে জমকালো সাজসজ্জার কথা উঠলে ‘ভিক্টোরিয়া’জ় সিক্রেট’-এর জুড়ি মেলা ভার। এই সংস্থার ফ্যান্টাসি ব্রা বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ২০০১ সালে ব্র্যান্ডটির প্রথম টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ফ্যাশন শো-এ সুপারমডেল হাইডি ক্লুম পরেছিলেন একটি ‘হেভেনলি স্টার ব্রা’। লেবানিজ় অলঙ্কারশিল্পী মুয়াওয়াদের তৈরি হিরেখচিত এই বিস্ময়কর সৃষ্টিটি ছিল শো-এর প্রধান আকর্ষণ।

এই অন্তর্বাসটির দাম ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১১৪ কোটি টাকা। ১,২০০টি গোলাপি নীলকান্তমণি এবং চোখধাঁধানো ৯০ ক্যারাটের ‘এমারেল্ড-কাট’ হিরে দিয়ে সাজানো ছিল ‘হেভেনলি স্টার ব্রা’-টি। আক্ষরিক অর্থেই এটি যেন কোনও ‘স্বর্গের পরি’র জন্যই তৈরি! হাইডি ক্লুম অত্যন্ত সাবলীল কায়দায় এই এই পোশাকটি পরে র‌্যাম্পে হেঁটেছিলেন।

টাইরা ব্যাঙ্কের হেভেনলি সেভেনটি ফ্যান্টাসি ব্রা: ২০০৪ সালে, ভিক্টোরিয়া’জ় সিক্রেট তাদের বার্ষিক ফ্যাশন শো-এর আয়োজন না করে ‘এঞ্জেলস অ্যাক্রস আমেরিকা ট্যুর’ নামে দেশ জুড়ে এক বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বিশ্বের প্রায় সব সুপারমডেল যোগ দেন। আদ্রিয়ানা লিমা, আলেসান্দ্রা অ্যামব্রোসিও, জিজ়েল বান্ডচেন, হাইডি ক্লুম এবং টাইরা ব্যাংকস— এই জমকালো আয়োজনে শামিল হয়েছিলেন। আর জমকালো আয়োজনের কথা যখন উঠছে, তখন বলতেই হয় যে, সেই বছর টাইরা ব্যাংকস ‘হেভেনলি সেভেনটি ফ্যান্টাসি ব্রা’ পরে নজর কেড়েছিলেন ফ্যাশনিস্তাদের। এই অন্তর্বাসটির দাম ছিল ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯৪ কোটি টাকা।

ওই অনুষ্ঠানেই টাইরা আরও একটি ‘হেভেনলি সেভেনটি ফ্যান্টাসি ব্রা’ পরেছিলেন। তার মূল্য ছিল আগেরটির প্রায় তিনগুণ। ব্যাংকসের পরা সেই ফ্যান্টাসি ব্রা-টিতে বসানো ছিল ৭০ ক্যারেটের নাশপাতি-আকৃতির হীরা। স্বচ্ছ কাপড়ের উপর বসানো ২,৯০০টি ছোট পাথরের কারুকাজে সজ্জিত এই আকর্ষণীয় অন্তর্বাসটি ছিল সত্যিই এক শিল্পকর্ম। ‘হেভেনলি সেভেন্টি ফ্যান্টাসি ব্রা’ নিছক একটি অন্তর্বাস ছিল না। এটি ছিল জাঁকজমক ও আভিজাত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

অনামিকা খন্নার অরা ডায়মন্ড বাস্টিয়ার: ভারতীয় পোশাকশিল্পীরাও অন্তর্বাসের উপর নানা রকম কারুকাজ করেছেন। অনামিকা খন্নার তৈরি চোখধাঁধানো অরা ডায়মন্ড বাস্টিয়ারের দাম ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি টাকা। ‘অরা জুয়েলারি’-র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই অনন্য অন্তর্বাসটিতে রয়েছে ৫০০ ক্যারাটেরও বেশি হিরে। এই রত্নখচিত অন্তর্বাসটিতে ছয় মাস ধরে নকশার কাজ চলেছে। কারিগরেরা নিপুণ হাতে সেই নকশা করেছেন।

অভিনেত্রী ও মডেল মলাইকা অরোরা এই হিরেখচিত বিকিনি টপটি পরে নজর কাড়েন। একটি নেটের শাড়ির সঙ্গে মলাইকা অন্তর্বাসটি স্টাইল করেছিলেন। অন্তর্বাসটির থেকে বেলজিয়ান হিরে দ্যুতি যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল। নিঃসন্দেহে বলা যায়, অনামিকা খন্নার ‘অরা ডায়মন্ড বাস্টিয়ার’ নিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনমহলেও বেশ আলোচনা হয়। অন্তর্বাসকে কী ভাবে সাবেকি বেশের সঙ্গে স্টাইল করা যায়, তার পথ দেখিয়েছিলেন কলকাতার মেয়ে অনামিকা।

উভে কোটার চেস্টিটি বেল্ট: ২০০২ সালে অলঙ্কারশিল্পী উভে কোটার এক অভিনব ‘চেস্টিটি বেল্ট’ তৈরি করে বেশ সাড়া ফেলেছিলেন। তিনি ব্রিটেনের এক ব্যাঙ্কারের (যিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চেয়েছিলেন) জন্য একটি ‘চেস্টিটি বেল্ট’ বা ‘সতীত্ব রক্ষার বেল্ট’ তৈরি করেছিলেন। সোনা, মুক্তা ও হিরে দিয়ে বেল্টটি তৈরি করে তিনি একটি সাধারণ বস্তুকে বিলাসবহুল শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করেছিলেন— যার মূল্য ছিল ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৮ লক্ষ টাকা।

মধ্যযুগীয় ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চেস্টিটি বেল্টগুলির মূল উদ্দেশ্য ছিল শরীরের গোপন ও সংবেদনশীল অংশগুলিকে আক্ষরিক অর্থেই তালাবন্ধ ও সুরক্ষিত রাখা। তবে লোহার তৈরি সেই আদি সংস্করণগুলিতে কিছু সমস্যাও ছিল। সঠিক প্যাডিং বা আস্তরণের অভাবে সীসাজনিত বিষক্রিয়া বা আরও গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা দিত। ইতিহাসের সেই প্রাচীন ও বিতর্কিত বস্তুর একটি আধুনিক ও জমকালো সংস্করণ তৈরির বিষয়টি অনেকের কাছেই হয়তো বিস্ময়কর বা অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে, ফ্যাশনের দুনিয়ায় নজর কাড়ার জন্য এটি ছিল মোক্ষমাস্ত্র!

নাইটগাউন বা রাতপোশাকের নিলাম হচ্ছে, এমনটা শুনেছেন কখনও? আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিন্ডেন্ট বিল ক্লিন্টনের চর্চিত প্রেমিকা মনিকা লিউনস্কির কালো রঙের ‘নেগলিজি’ বা নাইটগাউনটি সত্যি সত্যিই নিলামে ওঠে। বিষয়টি খোলসা করা যাক।

হোয়াইট হাউসের ইন্টার্ন মনিকার বয়স তখন ২২। আর প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টন তখন পঞ্চাশের দোরগোড়ায়। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে তাঁদের সম্পর্কটি দানা বেঁধেছিল বলে খবর। যদিও ক্লিন্টন তখনও তা স্বীকার করেননি। যদিও ১৯৯৮ সালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরে শপথভঙ্গ এবং বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির দায়ে ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হতে হয় ক্লিন্টনকে। মার্কিন কংগ্রেসে ২১ দিন ধরে সেই প্রক্রিয়া চলে। পরে কংগ্রেসের কাছ থেকে নির্দোষ তকমা পেয়ে যান ক্লিন্টন। ২০১৩ সালে, ক্লিনটন-মনিকা প্রেমকাহিনির সঙ্গে জড়িত থাকা ৩২টি সামগ্রী নিলামে ওঠে। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১১ লক্ষেরও বেশি টাকায় বিক্রি হয়ে নতুন মালিকের কাছে পৌঁছোয়। নাইটগাউনটি ছিল সেই নিলামের অন্যতম সামগ্রী।

৩২টি সামগ্রীর মধ্যে ছিল একটি নীল হুডি, সামান্য চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া প্রেসিডেন্সিয়াল ‘এমঅ্যান্ডএমস’ চকোলেটের একটি অব্যবহৃত বাক্স, ক্লিনটনের সই করা চিঠি। মজার ব্যাপার হল, নিজের এই সংগ্রহের বিনিময়ে মনিকা নিজে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা পাওয়ার আশা করেছিলেন। অতীতের কোনও উত্তাল অধ্যায়ের ঝলক হিসেবেই দেখুন কিংবা অদ্ভুত সব সংগ্রহের তালিকায় একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন হিসেবে— মনিকার এই নাইটগাউনটি মনে করিয়ে দেয় যে, নিলামের ক্ষেত্রেও কিছু কিছু গল্পের আকর্ষণ এতটাই প্রবল যে, তা উপেক্ষা করা কঠিন। বিশ্বের সবচেয়ে দামি অন্তর্বাসের তালিকায় এই পোশাকটিকে না রাখলেই নয়।

২০১১ সালে পপ তারকা কাইলি মিনোগের মৃত্যুর তাঁর পরা লাল সিল্কের ‘লা পার্লা’ অন্তর্বাস সেটটি নিলামের মঞ্চে উঠতেই তা বিস্ময়করভাবে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়ে যায়। লেসেরর কাজ করা এই অন্তর্বাসটি দেখতে ছিল বেশ আকর্যণীয়। তারকাদের স্মৃতিবিজড়িত সামগ্রীর ক্ষেত্রে অন্তর্বাসও যে আকাশচুম্বী দাম হাঁকাতে পারে, তা এর আগে ধারণার বাইরে ছিল।

পপ ইতিহাসের একটি অংশ নিজেদের সংগ্রহে পাওয়ার জন্য আগ্রহী ক্রেতাদের তুমুল প্রতিযোগিতার মুখে আগের সব নিলাম ম্লান হয়ে গিয়েছিল এই নিলামের সামনে। মিনোগের অন্তর্বাসটি প্রমাণ করল যে, তারকাদের ব্যবহৃত জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণের সত্যিই কোনও সীমা নেই।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]