কিশোরীর সঙ্গে ১৬ মাস ধরে ‘সংসার-সংসার’ খেলেন ভ্যানচালক, অতঃপর...

আপলোড সময় : ৩১-০৮-২০২৬ ০৮:৩৭:১৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ৩১-০৮-২০২৬ ০৮:৩৭:১৫ অপরাহ্ন
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ১৬ মাস স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সংসার করার পর রবিউল ইসলাম রবি (২৬) নেমে এক ভ্যানচালকের বিরুদ্ধে বিয়ে না করে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছেন ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী। এ ঘটনায় আদালতের নির্দেশে মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর পুলিশ রবিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।

তবে, ঘটনাটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল। আসামিপক্ষের দাবি— পরিবারের সম্মতিতে ধর্মীয় রীতি মেনে তাদের বিয়ে হয়েছিল, যার একাধিক ছবিও রয়েছে; অন্যদিকে বাদীর পরিবারের অভিযোগ— বিয়ের কোনো কাবিননামা দেওয়া হয়নি এবং নির্যাতনের পর মেয়েটিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ৯ নম্বর বারোবাজার ইউনিয়নের লুচিয়া গ্রামের। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন। ফলে উভয় পক্ষের অভিযোগ, বিয়ের প্রকৃতি এবং মামলার অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

গ্রেপ্তার রবিউল ইসলাম রবি কালীগঞ্জ উপজেলার লুচিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ভ্যান চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বাজারে মৌসুমি ফলের শরবত বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

জানা গেছে, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুমড়াবাড়িয়া গ্রামের ওই কিশোরীর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে রবির পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে গত বছরের ২৫ আগস্ট বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে তাকে কালীগঞ্জের একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। পরে রবির বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে অবস্থান করার সময় কাবিননামা ও বিয়ের কাগজপত্র চাইলে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।

এরপর চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তাকে রবির বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরী ঝিনাইদহ আদালতে মামলা করলে আদালত সেটি কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে কালীগঞ্জ থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর গত ২৪ আগস্ট রাত আনুমানিক ১টার দিকে বারোবাজার পুলিশ ক্যাম্পের একটি দল লুচিয়া গ্রামে রবির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতে পাঠানো হলে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে ঘটনার অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে বাদীর বয়স নিয়ে। পরিবারের দেওয়া জন্মনিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, তার বর্তমান বয়স ১৫ বছর ১ মাস। তবে মামলার এজাহারে তার বয়স ১৪ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। বাদী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার সঙ্গে সংঘটিত কথিত বিয়ের আইনি বৈধতা এবং ঘটনার অন্যান্য বিষয় আইনিভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বয়স সংক্রান্ত সরকারি নথি, ঘটনার সময়কাল এবং বিয়ের দাবির প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই হওয়ার বিষয়।

অভিযুক্ত রবির বাবা মামলার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তার ছেলের সঙ্গে ওই মেয়ের ফেসবুকে পরিচয়ের পর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তার ছেলে কুমড়াবাড়িয়া গ্রামে ওই মেয়ের বাবার বাড়িতে একাধিকবার যাতায়াত করে এবং বিষয়টি মেয়ের পরিবারের সদস্যরাও জানতেন। তার দাবি, পরে মেয়ের বাবা ও আত্মীয়স্বজন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তাদের বাড়িতে আসেন। উভয় পরিবারের সম্মতিতে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ওই মেয়ের বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করা হয়।

তিনি বলেন, মেয়ের বয়স কম থাকায় আইনি জটিলতার কথা চিন্তা করে কাবিননামা করা হয়নি। কুমড়াবাড়িয়া গ্রামে স্থানীয় এক ধর্মীয় ব্যক্তির মাধ্যমে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছিল। এরপর প্রায় ১৬ মাস তারা সংসার করেছে। দুই পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত ও আত্মীয়তাও ছিল। আমার ছেলের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মামলা করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।

এদিকে অনুসন্ধানে রবির পরিবারের কাছে তাদের কথিত বিয়ের অনুষ্ঠানের একাধিক ছবি সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া বিয়ের পর বিভিন্ন সময়ে ওই কিশোরী ও রবিউল ইসলাম রবির একসঙ্গে তোলা বেশ কিছু ছবিও রয়েছে। ছবিগুলোতে বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং পরবর্তী সময়ে দুজনের একসঙ্গে অবস্থানের বিভিন্ন দৃশ্য দেখা যায় বলে দাবি করেছে রবির পরিবার।

রবিদের প্রতিবেশী আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা রবির বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ভালো সম্পর্ক ছিল। রবির শ্বশুরবাড়ির লোকজনও একাধিকবার এখানে বেড়াতে এসেছেন। মেয়েটির বয়স কম থাকায় বিয়ের বৈধতা নিয়ে আইনগত প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে পুরো ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

রবির বন্ধু রনি দাবি করেন, ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৫০ জন বরযাত্রী নিয়ে তারা কুমড়াবাড়িয়া গ্রামে গিয়েছিলেন। বয়স কম হওয়ায় বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়েছিল।

লুচিয়া গ্রামের গৃহবধূ পারভীনা বেগম জানান, সংসারের কাজ নিয়ে ওই কিশোরীর সঙ্গে তার শাশুড়ির কিছুদিন আগে কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। পরে ওই কিশোরীর নানি এসে তাকে বাবার বাড়িতে নিয়ে যান। তার দাবি, আমরা জানতাম কয়েকদিন পর আবার সংসারে ফিরে আসবে। পরে পুলিশ রবিকে গ্রেপ্তার করার পর জানতে পারি তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা হোক।

তবে রবির স্বজনরা জানান, গত ২৪ আগস্ট রাতের অভিযানের সময় পুলিশ সদস্যদের কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চাওয়া হলেও তারা তা দেখাননি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে কিশোরীর বাবার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে বাদীর বড় বোন পরিচয় দেওয়া এক নারী জানান, তাদের এলাকায় এবং রবির বাড়িতেও বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়েছিল। তবে ওই বিয়ের কোনো কাগজপত্র তাদের কাছে দেওয়া হয়নি।

তার দাবি, রবিউল ইসলাম রবি তার ছোট বোনকে ফুসলিয়ে সম্পর্কে জড়ান। পরবর্তীতে রবির পরিবারের সদস্যরা তার ওপর নির্যাতন চালিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে জানিয়েছে, তারা আর আমার বোনকে নেবে না। এজন্যই আমরা আদালতে মামলা করেছি। এখন যেটা হওয়ার, আদালতের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হবে।

বাদী কিশোরী বলেন, এটি পারিবারিক বিষয়। আমি বিষয়টি মিডিয়ায় আনতে চাই না। আমরা এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না। পরে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ওই কিশোরী আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করলে আদালত সেটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তারা মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করেছেন। পরে মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতে পাঠানো হয়েছে।

বাদীর বয়সের বিষয়ে তিনি বলেন, বাদী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে রবিউল ইসলাম রবি আদালতের নির্দেশে কারাগারে রয়েছেন। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা, বাদীর বয়স, কথিত বিয়ের বাস্তবতা এবং উভয় পক্ষের অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটিত হবে।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]