রাজশাহীতে সারের কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ, বিপাকে কৃষক

আপলোড সময় : ৩০-০৮-২০২৬ ১২:৩৪:২৩ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ৩০-০৮-২০২৬ ১২:৩৪:২৩ পূর্বাহ্ন
রাজশাহীতে হঠাৎ করেই টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের সংকট দেখা দিয়েছে। আগস্ট মাসের শেষ দিকে এসে অনেক ডিলারের গুদামে এসব সার না থাকায় কৃষকদের পড়তে হচ্ছে চরম বিপাকে। ডিলারদের কাছে সার না মিললেও বেশি দামে খোলাবাজারে পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, ডিলারদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। এতে কৃষিকাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের কাছ থেকে সার কিনে লাভবান হচ্ছেন বিভিন্ন সার ব্যবসায়ীও। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সার কিনতে কৃষকরা ডিলারদের গুদামের সামনে ঘুরছেন। কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি কর্মকর্তাদের যথাযথ তদারকির অভাবেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ডিলারদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ বলছে, রাজশাহীতে সারের কোনো ঘাটতি নেই। কৃষি বিভাগের দাবি, পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ ও মজুত রয়েছে। একশ্রেণির ডিলার বরাদ্দের সার বাইরে বিক্রি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

রাজশাহীতে আগস্ট মাসে ৫ হাজার ৬২০ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ হয়েছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে মোট ২১৬ জন সার ডিলার রয়েছেন। এর মধ্যে বিসিআইসি ডিলার ৮৬ জন এবং বিএডিসি ডিলার ১৩০ জন। আগস্ট মাসে রাজশাহীর ৯টি উপজেলা ও মহানগর এলাকার এসব ডিলারকে বিপুল পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে পবা উপজেলার ২২ জন ডিলারের মধ্যে টিএসপি ২১০ মেট্রিক টন, এমওপি ২১৫ মেট্রিক টন ও ডিএপি ১৮৭ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। তানোরের ৩১ জন ডিলারের মধ্যে টিএসপি ১৫০, এমওপি ৩৫০ ও ডিএপি ২৪৯ মেট্রিক টন; মোহনপুরের ২৫ জন ডিলারের মধ্যে টিএসপি ৮০, এমওপি ১১০ ও ডিএপি ১৯৭ মেট্রিক টন এবং বাগমারার ৩৩ জন ডিলারের মধ্যে টিএসপি ১৬৫, এমওপি ১৫০ ও ডিএপি ২৪৪ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া দুর্গাপুরের ২১ জন ডিলারের মধ্যে টিএসপি ৮৫, এমওপি ১৪৫ ও ডিএপি ২৫৯ মেট্রিক টন; পুঠিয়ার ২১ জন ডিলারের মধ্যে টিএসপি ১৫০, এমওপি ১৯৫ ও ডিএপি ১৮৩ মেট্রিক টন; গোদাগাড়ীর ২৭ জন ডিলারের মধ্যে টিএসপি ৩০০, এমওপি ২৭৫ ও ডিএপি ৪৮৬ মেট্রিক টন; চারঘাটের ২২ জন ডিলারের মধ্যে টিএসপি ১৫০, এমওপি ১৩০ ও ডিএপি ২১৭ মেট্রিক টন এবং বাঘার ১৫ জন ডিলারের মধ্যে টিএসপি ২০০, এমওপি ১৬০ ও ডিএপি ৩০৯ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী মহানগরে তিনজন ডিলারের মধ্যে বোয়ালিয়ার একজনকে টিএসপি ১৩, এমওপি ১৫ ও ডিএপি ১১ মেট্রিক টন এবং মতিহারের দুই ডিলারকে টিএসপি ৮, এমওপি ১৫ ও ডিএপি ৭ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে আগস্ট মাসে রাজশাহীর ২১৬ জন ডিলারকে টিএসপি ১ হাজার ৫১১ মেট্রিক টন, এমওপি ১ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন ও ডিএপি ২ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন মোট ৫ হাজার ৬২০ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিসিআইসি ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ ইউরিয়া সারও সরবরাহ করা হয়েছে।

রাজশাহীতে বর্তমানে রোপা আমন মৌসুম চলছে। কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ৮১ হাজার ১২৩ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়েছে। এ ছাড়া ৫ হাজার ৪৬৩ হেক্টর জমিতে সবজি, ৬৩২ হেক্টর জমিতে মাসকলাই এবং ১৭০ হেক্টর জমিতে তুলার চাষ হয়েছে।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, চাষাবাদের পরিমাণ বিবেচনায় আগস্ট মাসে ডিলারদের যে পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাতে সংকট হওয়ার কথা নয়। কৃষকদের প্রশ্ন, গত বছর আগস্ট মাসেও প্রায় একই পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তখন সংকট হয়নি। এবার কেন সংকট তৈরি হলো ? বরাদ্দের সার গেল কোথায় ? কেনই বা কৃষকরা প্রয়োজনের সময় সার পাচ্ছেন না ?


রাজশাহীর ৯টি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ ডিলার আগস্ট মাসের বরাদ্দের সার ১৫ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে বিক্রি করে গুদাম খালি করে ফেলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ডিলার গুদামে সার ওঠানোর আগেই বাইরে বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিছু ডিলার সামান্য পরিমাণ সার রেখে কৃষকদের দু-এক দিন দেওয়ার পর সার নেই বলে বসে থাকছেন এমন অভিযোগও করেছেন কৃষকরা। অথচ প্রতিদিন সন্ধ্যায় ডিলাররা কৃষি অফিসে মেসেজের মাধ্যমে কত বস্তা সার বিক্রি হয়েছে, তার তথ্য পাঠাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

পবার হরিপুর ইউনিয়নের বিএডিসি ডিলার আয়নাল হকের গুদামে ২০ আগস্টের পর থেকে সার নেই বলে কৃষকরা অভিযোগ করেন। তারা সার কিনতে গেলে সংকটের কথা জানানো হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কয়েকজন সাংবাদিক আয়নালের সার গুদামের সামনে গেলে তাঁর ছেলে গুদাম বন্ধ করে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান বলে স্থানীয়রা জানান।

তবে বিকেলে পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, আয়নালের গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে এবং তিনি মেসেজের মাধ্যমে সার থাকার তথ্য পেয়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ, ২০ আগস্টের আগেই আয়নাল বেশি দামে সার বাইরে বিক্রি করে দিয়েছেন। হরিপুরের মুন লাইট কৃষি বিতানের মালিক গাফ্ফার হোসেনের গুদামেও সার থাকার পরও কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। গুদামের সামনে কৃষকরা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাদের সার নেই বলে জানানো হচ্ছে।

পবার কাটাখালী-হরিয়ান এলাকায় তিনজন সার ডিলার রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন সার বিতরণ করলেও অন্যরা সার নেই বলে কৃষকদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত সার থাকার কথাও তারা জানিয়েছেন।

এদিকে গোদাগাড়ীর দেওপাড়া ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার নজরুল ইসলাম পর্যাপ্ত পরিমাণ সার পেলেও ১৫ আগস্টের মধ্যে সব সার বিক্রি করে গুদাম খালি করে ফেলেছেন বলে জানা গেছে। পাশের দামকুড়া ইউনিয়নের এক ডিলারের গুদামে আবার পর্যাপ্ত সার পাওয়া গেছে এবং সেখান থেকে কৃষকদের মধ্যে সার বিতরণ করা হচ্ছে।

তানোরের রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজের গুদামে কোনো সার পাওয়া যায়নি। ডিলার আব্দুর রাজ্জাক জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে তিনি সব সার বিক্রি করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও সহকারী কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে এ বক্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মোহনপুরের ধুরইল ইউনিয়নের হাজেরা এন্টারপ্রাইজের তত্ত্বাবধায়ক মিলনের গুদামে টিএসপি সার পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ কৃষকদের সেই সার দেওয়া হচ্ছে না। বরাদ্দ পাওয়া ডিএপি সারের বেশির ভাগই বাইরে বিক্রি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে কিছু সার কৃষকরা পেয়েছেন। বাকি সার গুদামে পড়ে থাকলেও বিতরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক মিলন বলেন, ‘কেউ সার নিতে আসে না, এ কারণে আমরা দিতে পারি না।

মৌগাছি ইউনিয়নের ডিলার সুলতান মাহমুদের গুদামে নমুনা হিসেবে এক বস্তা করে ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার রাখা হয়েছে। সুলতান মাহমুদ দাবি করেন, অনেক আগেই তাঁর সার শেষ হয়ে গেছে। কৃষি কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলে দেখানোর জন্য এক বস্তা করে সার রাখতে বলেছেন।

অন্যদিকে বাগমারার কিছু এলাকায়ও সার সংকটের অভিযোগ রয়েছে। তবে সেখানে এর প্রভাব তুলনামূলক কম। দুর্গাপুর, পুঠিয়া, বাঘা ও চারঘাটে কিছু ডিলারের বিরুদ্ধে সংকট তৈরির অভিযোগ থাকলেও সেখানে ব্যাপক হাহাকার দেখা যায়নি। পবা, তানোর ও গোদাগাড়ীর কিছু এলাকায় সংকটের অভিযোগ তুলনামূলক বেশি।


পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ এম মান্নান বলেন, আমরা সার সংকটের বিষয়টি তদারকি করছি। প্রতিদিন কত বস্তা সার বিক্রি হলো, ডিলাররা তার মেসেজ দিচ্ছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও নজর রাখছেন।

ডিলাররা সার সংকট তৈরি করে বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তবে কেন তারা সংকট তৈরি করছেন এ প্রশ্নের কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি তিনি। গুদামে সার না থাকার পরও ডিলাররা কীভাবে সার বিক্রির তথ্য পাঠাচ্ছেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমন তথ্য আমার জানা নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, ‘রাজশাহীতে কৃত্রিম সার সংকট তৈরি করা হয়েছে। এর জন্য ডিলাররা দায়ী। কারণ, আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। আগস্ট মাসেও পর্যাপ্ত পরিমাণ সার ডিলারদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকার ও কৃষি বিভাগকে বেকায়দায় ফেলতেই এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও রাজশাহীর জেলা প্রশাসক(ডিসি) কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রাজশাহীতে সারের কোনো ঘাটতি নেই। আগস্ট মাসে রাজশাহীতে পর্যাপ্ত সার মজুত ও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের চাহিদা বিবেচনায় আরও অতিরিক্ত সারের বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

সংকটের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডিলাররাই মূলত এই সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী। তবে বিষয়টি আমরা দেখছি।

তবে সার ডিলারদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত অধিকাংশ ডিলারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]