আজ ফুলবাড়ী দিবস: উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনের ২০ বছর

আপলোড সময় : ২৫-০৮-২০২৬ ০৬:২৯:৩৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৫-০৮-২০২৬ ০৬:২৯:৩৭ অপরাহ্ন
আজ ২৬ আগস্ট, ফুলবাড়ী দিবস। ২০০৬ সালের এই দিনে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে তেল গ্যাস জাতীয় কমিটির ডাকে এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী অফিস ঘেরাও
কর্মসূচিকে ঘিরে রক্তাক্ত হয় দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর জনপদ।

দেশের সম্পদ রক্ষার এই আন্দোলনে সেদিন বিশাল সমাবেশে তৎকালীন বিডিআরের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন কলেজ ছাত্র তরিকুল, আমিন ও সালেকিন। আহত হন ২ শতাধিক আন্দোলনকারী। এদের মধ্যে অনেকেই ইতোমধ্যে মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, আবার এই মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন অনেকে।

প্রতি বছর এই দিনটিকে ফুলবাড়ী শাখা তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ‘ফুলবাড়ী দিবস’ এবং ফুলবাড়ী সম্মিলিত পেশাজীবী সংগঠন ‘ফুলবাড়ী ট্রাজেডি দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাঁচটি কয়লাখনির সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো হচ্ছে, দিনাজপুরের পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ী কয়লাখনি, বিরামপুরের দীঘিপাড়া, জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ ও রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার খালাশপীর কয়লাখনি। এরমধ্যে ২০০৫ সাল থেকে টানেল বা স্যাফট পদ্ধতিতে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে কয়লা তোলা হচ্ছে।

খনিগুলোর মধ্যে জামালগঞ্জের খনিতে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১ বিলিয়ন টন কয়লা রয়েছে। অন্যদিকে, ফুলবাড়ী খনিতে রয়েছে প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন টন কয়লা। ১৯৯৪ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার বহুজাতিক কোম্পানী বিএইচ ৩৯;র সঙ্গে চুক্তি হয় সরকারের। পরে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সরকার ৩০ বছর মেয়াদী একটি অসম চুক্তি করে। প্রস্তাবিত ওই চুক্তি অনুযায়ী, উত্তোলিত কয়লার মাত্র ৬ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ, ৯৪ শতাংশ পাবে এশিয়া এনার্জি, যার ৮০ শতাংশ এশিয়া এনার্জি রপ্তানি করবে।

প্রস্তাবিত কয়লাখনি হলে পুরো ফুলবাড়ী শহরসহ আশপাশের পার্বতীপুর, নবাবগঞ্জ, বিরামপুর উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পানির স্তর নিচে নেমে গেলে কৃষিতে এর বিরুপ প্রভাব পড়বে, হুমকির মুখে পড়বে গোটা পরিবেশ। ফলে বিশাল একটি জনবসতি স্থানান্তরিত হবে। উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে রূপ নেবে পরিবেশবাদীদের এমন হুঁশিয়ারিতে ফুলবাড়ী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও পরে মেয়র মরহুম শাহজাহান আলী সরকার পুতু এর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি’। শুরু হয় ফুলবাড়ী কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলন। ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির দাবি ছিল ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির সব কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং সরকারকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে ফুলবাড়ীতে কোনো উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি হবে না।

পরবর্তীতে ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে দেখা দেয় সন্দেহ- সংশয়। এসব কারণে আন্দোলনকারিদের একাংশ তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ব্যানারে আন্দোলন শুরু করেন।

এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী অফিস ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন বাম সংগঠন, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন, ফুলবাড়ী থানা ব্যবসায়ী সমিতির তৎকালীন সভাপতি মরহুম নওশাদ আলম মুন্না, সাধারণ সম্পাদক মুরতুজা সরকার মানিক, দোকান কর্মচারি ইউনিয়ন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন।

২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট খনি এলাকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লাঠি, বাদ্য বাজনা নিয়ে ফুলবাড়ীস্থ ঢাকা মোড় এলাকায় সমবেত হন লক্ষাধিক সব বয়সী নারী-পুরুষ। তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহবায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ ও সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের নেতৃত্বে দুপুর ১ টার দিকে ঢাকা মোড় থেকে খনি বিরোধী বিশাল মিছিল স্থানীয় নিমতলা হয়ে এশিয়া এনার্জির অফিসের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআরের বাঁধার মুখে পড়ে। এ সময় নিমতলা মোড়ে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

এর এক পর্যায়ে তৎকালীন বিডিআর আন্দোলকারীদের ওপর মারমুখি হয়ে ওঠে এবং গুলি চালায়। এতে ৩ জন নিহত ও দুই শতাধিক নারী ও পুরুষ আন্দোলনকারী আহত হন।

এরপর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে ফুলবাড়ী। ফলে ২৬ আগস্ট থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনকারিদের পুরো নিয়ন্ত্রণে ছিল ফুলবাড়ী। এ সময় ফুলবাড়ীতে অবাঞ্ছিত করা হয়েছিল তৎকালীন বিডিআর সদস্যদের।

৩০ আগস্ট সন্ধ্যায় পার্বতীপুর উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের সাথে আন্দোলনকারীদের ৬ দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৬ দফা সমঝোতা চুক্তিতে সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র বর্তমানে ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু এবং আন্দোলনকারীদের পক্ষে স্বাক্ষর করেন তেল গ্যাস জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

সমঝোতা চুক্তির আংশিক সরকার বাস্তবায়ন করলেও এখনও রয়ে গেছে এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিস্কার, দেশের কোথাও কোন উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি বাস্তবায়ন না করার মতো বেশ কয়েকটি দফা। যেগুলো বাস্তবায়নের দাবিতে এখনও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে আন্দোলনকারীদের
নামে এশিয়া এনার্জির দায়ের করা পৃথক দুইটি মামলা।

তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহবায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল ও সদস্য সচিব জয় প্রকাশ গুপ্ত বলেন, ‘দাবি বাস্তবায়ন না হলে এশিয়া এনার্জিকে বিতাড়িত করতে ফুলবাড়ীবাসী আবার ঐক্যবদ্ধ হবে। তিন ফসলি জমি আমাদের স্থায়ী সম্পদ। অস্থায়ী সম্পদের জন্য এটি নষ্ট করা যাবে না। তাঁরা বলেন, স্বাক্ষরিত ছয়দফা সমঝোতা চুক্তির আংশিক বাস্তবায়ন করা হলেও এখনও দেশ থেকে বহিস্কার করা হয়নি এশিয়া এনার্জিকে। উপরোন্ত এশিয়া এনার্জিই আবার আন্দোলনকারীদের নামে পৃথক দুইটি মামলা দিয়ে হয়রানী করছে।

আন্দোলনের অপর নেতা সম্মিলিত পেশাজীবী সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক সাবেক পৌর মেয়র মুরতুজা সরকার মানিক বলেন, ‘বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে টানেল বা স্যাফট পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হলেও সেখানে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক মানুষকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। প্রায় ৬৪৬ একর আবাদি জমি নষ্ট হয়েছে।

এসবের পাশাপাশি আন্দোলনকারি নেতা-কর্মীদের হয়রানী করতে এশিয়া এনার্জি পৃথক দুইটি মামলা দিয়েছে। এরপরও ফুলবাড়ী খনি এলাকার মানুষ জেগে আছে পাহারাদারের মতো এশিয়া এনার্জিকে বিতাড়িত করতে। 

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]