কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন সেখানে অবস্থানরত হাজারো বাংলাদেশি পর্যটক। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যুর পর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ে অভিযান শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পৌরসভা, দমকল ও বিদ্যুৎ বিভাগ। মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় নিউমার্কেট এলাকার ২২১টি হোটেল ও ৯টি রেস্তোরাঁ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার গভীর রাতে নিউমার্কেটের ১৫জি, মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নয়জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি ও দুজন ভারতীয় নাগরিক। বাংলাদেশিদের মধ্যে ছিলেন আকরাম আলী (৭৪), দেবাশীষ দত্ত (৩৯), আফসানা শিরমিন (২৭), সর্নাশীষ দত্ত (২), বাবু আহমেদ (৩৭), রেবতী সরকার ও এস এম আলিমুজ্জামান। ভারতীয় দুজন হলেন ঝাড়খণ্ডের সন্দীপ পাশওয়ান (১৯) ও শিলিগুড়ির যোগ নারায়ণ আগারওয়াল (৬৮)।
এই ঘটনার পর পর্যটকদের নিরাপত্তায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের কথা জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অগ্নিকাণ্ডের দিন সন্ধ্যা থেকেই নিউমার্কেট থানার পুলিশ বিভিন্ন হোটেলে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শুরু করে। অভিযানে উপমুখ্যমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও অংশ নেন। পরে নিরাপত্তাবিধি পর্যালোচনায় কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পৌরসভা, দমকল ও সিইএসসির সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটি কলকাতার সাড়ে ৩ হাজারের বেশি হোটেলের নিরাপত্তাবিধি পর্যালোচনা করবে। তবে নিউমার্কেট, মারকুইজ স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মির্জা গালিব স্ট্রিট এলাকায় অভিযান সবচেয়ে কঠোরভাবে চলছে। নিরাপত্তাবিধি না মানা একাধিক হোটেলের বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন বাংলাদেশি পর্যটকেরা। বর্তমানে কলকাতায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাদের মধ্যে প্রায় সাত হাজার নিউমার্কেট এলাকায় থাকেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে হোটেল পরিবর্তন করছেন, কেউ কেউ কলকাতা ছেড়ে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
নতুন হোটেল খুঁজতে গিয়ে বাড়তি ভাড়ার মুখেও পড়ছেন পর্যটকেরা। দালালের মাধ্যমে হোটেল পাওয়া গেলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের তুলনায় দেড় থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। পরিবহন ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, হোটেলের সংকটের কারণে পুরো নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কলকাতার গ্রিন লাইন পরিবহনের শ্যামল ঘোষ বলেন, সীমান্ত থেকে বাসগুলোতে যাত্রী পূর্ণ হয়ে কলকাতায় আসছেন। কিন্তু তাদের থাকার মতো পর্যাপ্ত হোটেল পাওয়া যাচ্ছে না। আশপাশের এলাকায় হোটেল খুঁজতে গিয়ে অনেক পর্যটককে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ ভাড়া দিতে হচ্ছে। সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণকে সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, হোটেল মালিকদের কিছুটা সময় দিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হতো।
সোমবার সকাল থেকেই নিউমার্কেট এলাকায় পর্যটকদের হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। হঠাৎ হোটেল ছাড়ার নির্দেশ পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। স্থানীয় রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষও হোটেল বন্ধের কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
নিউমার্কেটের এক হোটেলকর্মী সেলিম বলেন, ‘ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ। মির্জা গালিব স্ট্রিটে আগুন লেগেছে, আর হোটেল বন্ধ করার নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের পেটে লাথি মেরে দিয়েছে।’
এক হোটেল মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার হোটেলে প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি পর্যটক ছিলেন। সোমবার তাদের সবাইকে হোটেল ছাড়তে বলা হয়।
ঢাকার বাসিন্দা নাসিব পাপ্পু চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে একই সমস্যায় পড়েন। তিনি জানান, রোববার বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় গিয়ে বিকেলে একটি হোটেলে ওঠেন। হোটেলে ওঠার সময় কোনো কিছু জানানো হয়নি। পরে বাইরে থেকে ফিরে জানতে পারেন, পুলিশ হোটেল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। সোমবার সকাল ১০টার মধ্যে তাকে হোটেল ছাড়তে হয়।
নাসিব বলেন, চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে থাকার জায়গা নিয়ে এমন সমস্যায় পড়তে হবে ভাবেননি। ভবিষ্যতে কলকাতায় আসার বিষয়টি তাকে নতুন করে ভাবতে হবে। তার আশঙ্কা, দীর্ঘদিন পর পর্যটন ভিসা চালু হওয়ার পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশি পর্যটকদের একটি অংশ কলকাতার পরিবর্তে অন্য গন্তব্য বেছে নিতে পারেন।
অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা হোটেলের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, নিউমার্কেট এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের ঘিরে গড়ে উঠেছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, কেনাকাটা ও নানা সেবার বড় একটি অর্থনীতি। পর্যটন ভিসা চালুর পর ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হলেও একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত একটি কার্যকর সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা।