একটি আসন, একটি পরিবার এবং উত্তরাধিকারের রাজনীতি, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে এখন এই তিনটি বিষয়ই ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথের পর তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটি শূন্য হওয়ায় শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। উপনির্বাচনের তফসিল এখনও ঘোষণা হয়নি; কিন্তু তার আগেই বিএনপির ভেতরে ও স্থানীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—মির্জা ফখরুলের ছেড়ে যাওয়া আসনে দলের নতুন কাণ্ডারি হচ্ছেন কে?
আলোচনার কেন্দ্রে এখন মূলত দুই নাম,মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মির্জা ফয়সাল আমিন এবং তাঁর বড় মেয়ে শামারুহ মির্জা। একজন দীর্ঘদিনের মাঠের রাজনীতির পরীক্ষিত মুখ, অন্যজন নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত ও পেশাজীবী মুখ। ফলে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শেষ পর্যন্ত ভাইয়ের হাতে থাকবে, নাকি মেয়ের হাতে যাবে—এই প্রশ্নেই এখন সরব স্থানীয় বিএনপির রাজনীতি। তবে কে প্রার্থী হবেন, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলীয় সূত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এরপর বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। একই সঙ্গে মির্জা ফখরুলের মতামতও প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেতে পারে বলে মনে করছেন দলের স্থানীয় নেতাদের অনেকে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সদর, ভুল্লি ও রুহিয়া নিয়ে গঠিত এই আসনে মির্জা ফখরুলের বাবা প্রয়াত মির্জা রুহুল আমিনও সংসদ সদস্য ছিলেন। আইনজীবী মির্জা রুহুল আমিন পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার দুইবার সদস্য ছিলেন। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করেই মির্জা ফখরুল ধীরে ধীরে উঠে আসেন জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ সারিতে। ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। এরপর দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পান। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে বঙ্গভবনের দায়িত্ব গ্রহণ করায় সাংবিধানিক নিয়মে তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়েছে।
এ কারণেই ঠাকুরগাঁও-১-এর উপনির্বাচনকে কেবল একটি আসনের নির্বাচন হিসেবে দেখছেন না স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাঁদের কাছে এটি একই সঙ্গে মির্জা পরিবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা মির্জা ফয়সাল আমিন বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। এর আগে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে জেলা ও সদর উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশের মতে, তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সরাসরি যোগাযোগই তাঁর বড় শক্তি। আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে মাঠের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে দলের একটি অংশ তাঁকে ‘পরীক্ষিত’ প্রার্থী হিসেবে দেখছে। তাদের যুক্তি, উপনির্বাচনের মতো স্বল্প সময়ের নির্বাচনী লড়াইয়ে এমন একজন প্রার্থী প্রয়োজন, যিনি দ্রুত দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে পারবেন, সাংগঠনিক কাঠামো সক্রিয় করতে পারবেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে ঐক্য ধরে রাখতে সক্ষম হবেন। এই বিবেচনায় ফয়সাল আমিনকে এগিয়ে রাখছেন তাঁর সমর্থকেরা। তবে তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা নিয়েও রয়েছে নানা মত। সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তাঁর বড় শক্তি হলেও স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটিও মনোনয়ন দৌড়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে সরাসরি দলীয় রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিন সক্রিয় না থাকলেও মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে শামারুহ মির্জার নামও এখন জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা
ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে শামারুহ মির্জার। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। দীর্ঘ সময় সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও বিভিন্ন সামাজিক
ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, করোনাকালে এবং ঠাকুরগাঁওয়ের অসচ্ছল মানুষের চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করেছে। নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর অংশগ্রহণ রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। এছাড়া সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাবা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে তিনি এলাকায় সক্রিয়ভাবে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। ফলে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও আগের তুলনায় দৃশ্যমান হয়েছে।
শামারুহকে প্রার্থী করার পক্ষে থাকা বিএনপির একটি অংশ মনে করছে, এটি হলে দল মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে নতুন একটি নেতৃত্বকে সামনে আনতে পারবে। তাঁর শিক্ষাগত ও পেশাগত পরিচয় জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে বলেও মনে করছেন তাঁর সমর্থকেরা। সবমিলিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহল,মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কি মাঠের অভিজ্ঞ ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনের হাতে থাকবে, নাকি নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি শামারুহ মির্জাকে সামনে আনবে বিএনপি? তফসিল ঘোষণার আগে এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে দুই সম্ভাব্য মুখকে ঘিরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তাতে স্পষ্ট,উপনির্বাচনের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মনোনয়ন-রাজনীতির উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ঘাঁটির নতুন কাণ্ডারি কে হচ্ছেন। আর সেই সিদ্ধান্ত শুধু একটি আসনের প্রার্থী নির্ধারণ করবে না; বরং ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকও অনেকটা নির্ধারণ করে দিতে পারে।