কানাডায় বাংলাদেশি নারীকে শোষণ: মানবপাচারে দুই রেস্তোরাঁ মালিক দোষী সাব্যস্ত

আপলোড সময় : ০৮-০৮-২০২৬ ০৪:৪০:০৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৮-০৮-২০২৬ ০৪:৪০:০৫ অপরাহ্ন

কানাডার স্যাসকাচুয়ান প্রদেশে এক বাংলাদেশি নারীকে নিজেদের রেস্তোরাঁয় দীর্ঘ সময় কাজ করিয়ে শোষণের দায়ে দুই ব্যক্তি মানবপাচারের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিরা হলেন মোহাম্মদ মাসুম (৪৪) ও সোহেল হায়দার (৫৫)।

শুক্রবার স্যাসকাচুয়ান প্রাদেশিক আদালতের বিচারক মিগুয়েল মার্টিনেজ রায় ঘোষণা করেন। রায় শেষে দুজনকেই পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। আগামী সপ্তাহে তাদের সাজা ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের জন্য আদালতে হাজির করা হবে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক মার্টিনেজ বলেন, অভিযুক্ত দুজন নিজেদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক সুবিধার জন্য ওই নারীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাকে শোষণ করেছেন। মালিক হিসেবে নিজেদের ক্ষমতা ও সামাজিক অবস্থান ব্যবহার করে তারা ওই নারীর চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতেন।

বিচারক আরও বলেন, কানাডা থেকে বহিষ্কার করার ভয় দেখিয়ে এবং ওয়ার্ক পারমিট বাতিল কিংবা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার হুমকি দিয়ে ওই নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো।

মাসুমের বিরুদ্ধে মানবপাচারের পাশাপাশি তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ছিল। আদালত তিনটি অভিযোগেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। বিচারে উঠে আসে, তিনি ওই নারীকে অন্তত আটবার যৌন নির্যাতন করেন। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভুক্তভোগী নারীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

সপ্তাহে ছয় দিন, প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা কাজ

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের আগস্টে ওই নারী কানাডার টরন্টোতে আসেন। কানাডায় থাকার সুযোগ খুঁজতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, অস্থায়ী বিদেশি কর্মী হিসেবে কাজ করলে দেশটিতে অবস্থান দীর্ঘায়িত করার সুযোগ রয়েছে। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি স্যাসকাচুয়ানে যান এবং সোহেল হায়দারের অধীনে গাল লেকের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করেন।

তখন হায়দারের কাছে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সরকারি অনুমোদন ছিল না। এরপরও বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া এবং মাসে ১ হাজার কানাডীয় ডলার দেওয়ার চুক্তিতে ওই নারীকে কাজে নিয়োগ করা হয়। তবে বিচারক জানান, সপ্তাহে ছয় দিন দীর্ঘ সময় কাজ করলেও হায়দার তাকে কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি।

২০২২ সালের নভেম্বরে হায়দার ওই নারীকে তার বন্ধু মোহাম্মদ মাসুমের টিসডেল শহরের রেস্তোরাঁয় পাঠিয়ে দেন। সেখানেও একই ধরনের চুক্তিতে তাকে সপ্তাহে ছয় দিন এবং প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা করে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এমনকি ছুটির দিনেও তাকে মালামাল কেনার জন্য ভ্রমণে সঙ্গে যেতে হতো।

এমএলএর নজরে আসে বিষয়টি

রেস্তোরাঁয় যাওয়ার পর ওই নারীর পরিস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন সাইপ্রেস হিলসের এমএলএ ডগ স্টিল। পরে তিনি বিষয়টি তৎকালীন স্থানীয় এমএলএ হিউ নার্লিয়েনকে জানান।

নার্লিয়েন গোপনে ওই রেস্তোরাঁয় গিয়ে একটি কাগজে সামাজিক কর্মীর ফোন নম্বর লিখে সেটি নিজের ভিজিটিং কার্ডের মধ্যে পেঁচিয়ে ওই নারীকে দেন। পরে ওই সামাজিক কর্মী তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এরই মধ্যে ওই নারী একটি ‘ক্লোজড ওয়ার্ক পারমিট’ পান। এই পারমিট অনুযায়ী তাকে এলরোসের একটি নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁয় কাজ করতে হতো। সেখানে তাকে নিয়ে যাওয়ার পর এমএলএ ডগ স্টিল ও ওই সামাজিক কর্মী মিলে তাকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করেন।

২০২৩ সালের ২৩ মার্চ পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই নারীকে সফলভাবে উদ্ধার করা হয়।

পাসপোর্ট আটকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ

বিচারে উঠে আসে, মোহাম্মদ মাসুম ওই নারীর পাসপোর্ট নিয়ে নেন এবং তিনি শারীরিক সম্পর্কে সম্মতি না দেওয়া পর্যন্ত পাসপোর্ট ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান।

বিচারক মার্টিনেজ বলেন, অভিযুক্তরা নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে ওই নারীর দুর্বল অবস্থাকে কাজে লাগিয়েছেন। মামলায় এমএলএ দুজন ও সামাজিক কর্মীর দেওয়া সাক্ষ্যকে বিচারক অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর সাক্ষ্যকেও তিনি ‘বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য’ বলে অভিহিত করেন।

অন্যদিকে, হায়দার ও মাসুম নিজেদের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে দাবি করেন, ওই নারী কখনো তাদের রেস্তোরাঁয় কাজ করেননি। মাসুম তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগও অস্বীকার করেন।

তবে বিচারক হায়দারের সাক্ষ্যকে অবিশ্বাস্য, স্বার্থপরতাপূর্ণ, অস্পষ্ট এবং এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাসম্পন্ন বলে মন্তব্য করেন। মাসুমের সাক্ষ্য সম্পর্কেও বিচারক বলেন, তার বক্তব্যকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।

সাজা ঘোষণার অপেক্ষায় দুই আসামি

প্রায় ১৮ মাস ধরে চলা মামলায় প্রায় সাত সপ্তাহ সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার কার্যক্রম চলে। চলতি বছরের জুনে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর শুক্রবার রায় ঘোষণা করা হয়। মামলাটি ২০২২ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ৩১ মার্চের মধ্যবর্তী সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।

রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী লেসলি ড্যানিং সাজা ঘোষণার আগ পর্যন্ত হায়দার ও মাসুমকে কারাগারে রাখার আবেদন করেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে দুজনকে পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কানাডায় মানবপাচারের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন চার বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আগামী সপ্তাহে সাজা ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের জন্য দুই আসামিকে আবার আদালতে হাজির করা হবে।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]