রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনার কারণে ভারতসহ দেশগুলোর পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের শুল্ক আরোপের পথ খুলে দিয়েছে মার্কিন সিনেট। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর চাপ বাড়াতে আনা একটি নতুন নিষেধাজ্ঞা বিল শুক্রবার (৭ আগস্ট) ৮৬-১১ ভোটে সিনেটে পাস হয়েছে।
‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের এই বিলটিতে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আমদানিকারক দেশগুলোর পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ তথ্য জানিয়েছে এএফপি, রয়টার্স ও আল জাজিরা।
বিলটি এখন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে যাবে। তবে কংগ্রেসের গ্রীষ্মকালীন অবকাশের কারণে সেপ্টেম্বরের শুরুর আগে সেখানে এ নিয়ে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ভারতের রপ্তানি খাতে বাড়ছে উদ্বেগ
বিলটি কার্যকর হলে রাশিয়ার জ্বালানির বড় ক্রেতা ভারত ও চীনসহ অন্তত পাঁচটি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। এতে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করা ভারতের রপ্তানি খাত নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতীয় পণ্যের ওপর বড় ধরনের অতিরিক্ত শুল্ক বসলে দেশটির রপ্তানি আয়, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সঙ্গে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ার জ্বালানি পরিবহনে ব্যবহৃত গোপন সামুদ্রিক নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
রাশিয়াকে আলোচনায় ফেরানোর লক্ষ্য
সিনেটে বিলটি পাসের আগে রিপাবলিকান সিনেটর জিম রিশ বলেন, এই উদ্যোগ রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করতে পারে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের পথ তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ পরিচালনার অর্থের প্রবাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
বিলটি পাস হওয়ার পর স্বাগত জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেন, রাশিয়ার ওপর শক্তিশালী মার্কিন চাপ ও নিষেধাজ্ঞাই যুদ্ধ বন্ধে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলের পাশাপাশি দেশটির জনগণের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
প্রয়াত সিনেটরের নামে বিল
প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে বিলটির নামকরণ করা হয়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার ছিলেন। গত ১১ জুলাই তাঁর মৃত্যুর পর বিলটি তাঁর নামে নামকরণ করা হয়।
গ্রাহামের আসনে দায়িত্ব পাওয়া তাঁর বোন ডারলাইন গ্রাহাম নর্ডোন বলেন, এই বিল এমন জায়গায় আঘাত করবে, যেখানে পুতিন সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভব করবেন।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শাহিনও বিলটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এটি পুতিনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলের সমর্থিত একটি স্পষ্ট চাপের বার্তা।
প্রতিনিধি পরিষদে বাধার আশঙ্কা
ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেইয়েন সিনেটে বিলটি পাস হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের কয়েকজন সদস্য এর বর্তমান রূপ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন।
ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্রেগরি মিক্স ও ডন বেয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নতুন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে অতিরিক্তভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। তাঁদের মতে, শুক্রবার সিনেটে পাস হওয়া বিলটির বর্তমান রূপ গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে রাশিয়ার দূতাবাসও বিলটির বিরোধিতা করেছে। দূতাবাসের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি সংকট ও গ্যাসের দাম বাড়ার পরিস্থিতিতে রাশিয়া ও তার বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এখন নজর প্রতিনিধি পরিষদের দিকে। সেখানে বিলটি পাস হলে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে রাশিয়ার তেল কেনা ভারতসহ দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্যে বড় ধরনের শুল্কের ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে ভারতের জন্য রাশিয়ার সস্তা জ্বালানি আমদানি ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার—দুই দিকের ভারসাম্যই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।