জাতীয় ফুটবলের মঞ্চে লালপুরের ফারিহা মনি

আপলোড সময় : ২৯-০৭-২০২৬ ১২:৩১:১৯ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৯-০৭-২০২৬ ১২:৩১:১৯ পূর্বাহ্ন
এক হাতে সংসারের কাজ, অন্য হাতে ফুটবল। কখনো ধানের জমিতে শ্রম, কখনো পচা পানিতে নেমে পাট ধোয়া-আর দিনের শেষে প্রায় আট কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে ছুটে যাওয়া অনুশীলনের মাঠে। চারপাশে ছিল দারিদ্র্য, ছিল কটূক্তি, ছিল স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার অসংখ্য চেষ্টা। কিন্তু সেই কিশোরী হার মানেনি। বরং নিজের লড়াইকে শক্তিতে পরিণত করে আজ তিনি জাতীয় ফুটবলে দেশের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন।

তিনি নাটোরের লালপুর উপজেলার নান্দরায়পুর গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা মনি। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজিত জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৪ মেয়েদের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে তিনি অর্জন করেছেন ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ সম্মাননা। তার এই সাফল্যে আনন্দে ভাসছে লালপুরসহ পুরো রাজশাহী অঞ্চল।

টুর্নামেন্টজুড়ে ছিলেন দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ। বরিশাল বিভাগের বিপক্ষে ৫-০ গোলের দাপুটে জয়ে একাই করেন চার গোল। এরপর সেমিফাইনালে খুলনা বিভাগের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচেও করেন একটি গুরুত্বপূর্ণ গোল। মাত্র দুই ম্যাচে দলের সাত গোলের মধ্যে পাঁচটিই আসে তার পা থেকে। যদিও ফাইনালে রাজশাহী বিভাগ শিরোপা জিততে পারেনি, তবুও পুরো আসরে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে এনে দেয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্বীকৃতি।

সোমবার ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ দলের খেলোয়াড়দের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। হাজারো দর্শকের করতালির মধ্যে নিজের হাতে ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ ট্রফি তুলে নেন লালপুরের এই সংগ্রামী কিশোরী।

ফারিহার জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল মাঠের ভেতরে নয়, মাঠের বাইরেই।

তার বাবা মুকুল মণ্ডল বাকপ্রতিবন্ধী। সংসারের হাল ধরেছেন মা আজেলা বেগম, যিনি এলজিইডির রাস্তার দিনমজুর হিসেবে কাজ করে পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ করেন। নতুন বুট, অনুশীলনের খরচ কিংবা যাতায়াতের ভাড়া- সবই ছিল তাদের কাছে বিলাসিতা। তাই সংসারের প্রয়োজনে ভাইয়ের সঙ্গে মাঠে কৃষিকাজ করেছেন ফারিহা, পচা পানিতে নেমে পাটও ধুয়েছেন। তবুও ক্লান্ত শরীর নিয়ে প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে পৌঁছে গেছেন অনুশীলনের মাঠে।

দারিদ্র্যের পাশাপাশি তাকে লড়তে হয়েছে সমাজের প্রচলিত মানসিকতার সঙ্গেও।

মেয়ে হয়ে ফুটবল খেলবে? হাফপ্যান্ট পরে মাঠে নামবে? এমন অসংখ্য কটূক্তি শুনেছেন ছোটবেলা থেকেই। অনেকে বলতেন, মেয়েদের ভবিষ্যৎ খেলাধুলায় নয়, সংসারে। কিন্তু এসব কথাকে কখনো গুরুত্ব দেননি ফারিহা। নিজের বিশ্বাস আর পরিশ্রমকেই করেছেন সবচেয়ে বড় শক্তি।

ফারিহার স্বপ্নপূরণের পেছনে বড় অবদান রয়েছে নর্থ বেঙ্গল ফুটবল একাডেমির কোচ মোহাম্মদ জুয়েলের।

পরিবারের পক্ষে যখন অনুশীলনের ব্যয় বহন করা সম্ভব হয়নি, তখন তিনি নিজের সন্তানের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। যাতায়াত খরচ, অনুশীলনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থেকে শুরু করে মানসিক সাহস- সবকিছুতেই সহযোগিতা করেছেন তিনি।

কোচ মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, ফারিহা শুরু থেকেই অত্যন্ত পরিশ্রমী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ একজন খেলোয়াড়। প্রতিকূলতার মধ্যেও সে কখনো অনুশীলনে ফাঁকি দেয়নি। তার নিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাসই তাকে জাতীয় পর্যায়ে সেরা হওয়ার জায়গায় নিয়ে গেছে। সঠিক পরিচর্যা পেলে সে একদিন বাংলাদেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় ফুটবলে হাতেখড়ি হয় ফারিহার। উপজেলা পর্যায়ে ইনজুরির কারণে সুযোগ হারালেও জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। জাতীয় পর্যায়ে এসে সেই প্রতিভাই তাকে দেশের অন্যতম সেরা কিশোরী ফুটবলার হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা তার প্রিয় খেলোয়াড়। সেই ভালোবাসা থেকেই নিজের জার্সির নম্বর হিসেবে বেছে নিয়েছেন ১৭ নম্বর।

সাফল্যের পরও মাটির মানুষ-এত বড় অর্জনের পরও নিজের কৃতিত্ব একা নিতে নারাজ ফারিহা।

তিনি বলেন, "আমার সতীর্থরা ভালো পাস দিয়েছে বলেই আমি গোল করতে পেরেছি। এই অর্জন শুধু আমার নয়, পুরো দলের।"

শুভেচ্ছায় ভাসছেন ফারিহা- ফারিহার এই সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, "বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে এমন ফারিহার জন্ম হোক - এটাই আমাদের প্রত্যাশা।"

লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বরকত উল্লাহ বলেন,"ফারিহার এই অর্জন শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি পুরো লালপুরের গর্ব। সে প্রমাণ করেছে- অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক বাধা কোনো স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারে না। উপজেলা প্রশাসন তার মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পাশে সবসময় থাকবে।

ফারিহার গল্প কেবল একজন ফুটবলারের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের অসংখ্য মেয়ের সাহস, আত্মবিশ্বাস আর স্বপ্নপূরণের প্রতিচ্ছবি।

যে মেয়েটি একসময় কাদামাখা পথে সাইকেল চালিয়ে অনুশীলনে যেত, আজ সেই মেয়েই জাতীয় ফুটবলে নিজের নাম লিখিয়েছে সোনালি অক্ষরে। তার এই অর্জন প্রমাণ করে-'সুযোগ, পরিশ্রম এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি একসঙ্গে থাকলে দারিদ্র্য, কটূক্তি কিংবা প্রতিকূলতা কোনো স্বপ্নকেই থামিয়ে রাখতে পারে না।

এখন লালপুরের মানুষের একটাই প্রত্যাশা- এই সংগ্রামী কিশোরী খুব শিগগিরই লাল-সবুজের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা আরও উঁচুতে উড়িয়ে দেশের জন্য নতুন ইতিহাস রচনা করবে।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]