কলা, ডিম খেয়ে হত পেটব্যথা, ব্লেড, সাইকেল, টিভির পর দু’বছর ধরে আস্ত বিমান চিবিয়ে খেয়েছিলেন ফরাসি শিল্পী!

আপলোড সময় : ১২-০৭-২০২৬ ০৯:৩১:৫১ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১২-০৭-২০২৬ ০৯:৩১:৫১ অপরাহ্ন
আমরা যাঁরা স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অভ্যস্ত, তাঁরা ফল, সব্জি, মাংস বা শস্যজাতীয় খাবারই খাবারের তালিকায় রাখি। ইতিহাসের পাতা উল্টোলে এমন এক মানুষের দেখা মেলে যাঁর খাওয়ার রুচি ঠিক মনুষ্যোচিত বলে ধরে নেওয়া কঠিন। কলা এবং সিদ্ধ ডিমের মতো নরম খাবার খেলে যাঁর শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ত, কিন্তু দিব্যি হজম করে ফেলেছিলেন আস্ত বিমান!

যে সব জিনিস খাওয়ার জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন, সে সব কোনও মানুষের হজম করারই কথা নয়। তাঁর খাদ্যতালিকায় বিমান ছাড়াও ছিল সাইকেল, সুপারমার্কেটের ট্রলি, টেলিভিশন, ঝাড়বাতি, এমনকি একটি কফিনও। অবশ্য তিনি এগুলো এক দিনে খাননি। প্রতিটি বস্তু ছোট ছোট টুকরো করে কেটে দীর্ঘ সময় ধরে খেতেন তিনি।

১৯৫০ সালে ফ্রান্সের নাগরিক মিশেল লোতিতো কিশোর বয়সেই বুঝতে পেরেছিলেন, কাচ ও ধাতুর মতো কঠিন বস্তু খেলেও তাঁর শারীরিক ক্ষতি হয় না। ফরাসি দেশের গ্রেনোবলে জন্ম নেওয়া মিশেলের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই অস্বাভাবিক জিনিস খাওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। মাত্র ন’বছর বয়সে তিনি প্রথম কাচের টুকরো ও ধাতব বস্তু মুখে পুরে চিবোতেন। পরে এই লোতিতো পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘মঁসিয়ে মাঁজেতু’ নামে।

ফরাসি এই শব্দের অর্থ সর্বভুক। আক্ষরিক অর্থেই মিশেল হয়ে ওঠেন ‘সব কিছু খেয়ে ফেলেন যে মানুষ’। ১৯৫৯ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে তিনি প্রায় ৯ টন ধাতব বস্তু খেয়েছিলেন। তাঁর খাদ্যতালিকার মধ্যে ছিল ১৮টি সাইকেল, সুপারমার্কেটের ১৫টি ট্রলি, ৭টি টিভি, ২টি বিছানা, একটি কম্পিউটার এবং আস্ত একটি সেসনা ১৫০ বিমান। বিমানটি টুকরো টুকরো করে সম্পূর্ণ খেতে তাঁর প্রায় ২ বছর সময় লেগেছিল।

এই অদ্ভুত অভ্যাসই তাঁর পেশায় পরিণত হয়। তিনি মঞ্চে দর্শকের সামনে বিভিন্ন ধাতব বস্তু কেটে ছোট ছোট টুকরো করে খেতেন, যা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত পারফরম্যান্স শিল্পীতে পরিণত করে। পরে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন, তাঁর পাকস্থলীর আস্তরণ ও অন্ত্রের প্রাচীর সাধারণ মানুষের তুলনায় অস্বাভাবিক পুরু। এই বিরল শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই ধারালো ধাতব টুকরোও তাঁর পরিপাকতন্ত্রে সহজে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারত না। এ ছাড়া তাঁর পাকস্থলীর অ্যাসিড ধাতব বস্তুকে তুলনামূলক দ্রুত ক্ষয় করতে সক্ষম ছিল। এই কারণে তিনি বহু বছর ধরে ধাতব বস্তু খেয়েও গুরুতর অভ্যন্তরীণ আঘাত থেকে রক্ষা পান।

তাঁর সবচেয়ে আলোচিত কীর্তি ছিল একটি সেসনা ১৫০ মডেলের ছোট বিমান খাওয়া। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে প্রায় দুই বছর ধরে বিমানটি ধীরে ধীরে টুকরো করে তিনি খেয়ে শেষ করেন। বিমানটির ধাতব অংশ ছোট ছোট করে কেটে বিশেষ ভাবে প্রস্তুত করা হত, যাতে তা গিলে ফেলা সম্ভব হয়।

মিশেলের খাওয়ার পদ্ধতিও ছিল অদ্ভুত। ধাতুর টুকরোগুলি গিলে ফেলার আগে তিনি সেগুলিকে ছোট ছোট অংশে কেটে নিতেন। এর পর প্রচুর পরিমাণে খনিজ তেল ও জল পান করতেন, যাতে টুকরোগুলি সহজে পাকস্থলীতে পৌঁছোয়। আশ্চর্যের বিষয় হল, ধারালো ধাতব টুকরোও তাঁর শরীরে গুরুতর ক্ষতি করত না।

মিশেল প্রথম আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসেন একটি সাইকেল খেয়ে। ১৯৭৭ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিলের মধ্যে মাত্র ১৫ দিনে একটি সম্পূর্ণ সাইকেল খেয়ে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। পরে ১৯৭৯ সালে এই কীর্তির জন্য তিনি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পান।

এর মাত্র এক বছর পর নিজের রেকর্ড নিজেই ভেঙে দেন তিনি। এ বার মাত্র ১২ দিনে ১৫ পাউন্ড (প্রায় ৬.৮ কেজি) ওজনের একটি সাইকেল খেয়ে নতুন নজির গড়েন। কানাডার একটি পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময় তিনি খাবার হিসাবে ১০০টি রেজ়ার ব্লেড, দু’টি প্লেট এবং একটি কাচের গ্লাস খেয়েছিলেন।

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মেলায় মিশেল অদ্ভুত সব কীর্তি দিয়ে দর্শককে বিস্মিত করেছিলেন। তিনি দাঁত দিয়ে ধাতব মুদ্রা বাঁকিয়ে দেখাতে পারতেন। আট জন মানুষের ধরে রাখা একটি বিশাল চিমটের মধ্যে নিজের বাহু চেপে ধরেও অক্ষত থাকার নজির রয়েছে তাঁর। এই ব্যতিক্রমী প্রদর্শনীর জন্য আয়োজকেরা তাঁকে সেই সময় ৫ হাজার মার্কিন ডলার দিয়েছিলেন।

মিশেলের অস্বাভাবিক ক্ষুধার কারণ ছিল পিকা। এই রোগটির উপসর্গ খাবার নয় এমন জিনিস খাওয়া বা খাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। পিকাকে জৈবিক নয়, বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে লোতিতোর দাবি, ধাতু চিবোনোর এই সিদ্ধান্তের পিছনে তাঁর শারীরিক গঠন অবশ্যই একটি ভূমিকা পালন করেছিল।

মিশেল একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘আমার দাঁতগুলো অবিশ্বাস্য ভাবে শক্তিশালী। প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে এর শক্তি আট টন পরিমাপ করা হয়েছে। কিন্তু আমি এমন তীব্র রসও নিঃসরণ করি যা আমার মুখে রেজ়ার ব্লেড গলিয়ে দিতে পারে। আমার পাকস্থলীর রস এতটাই শক্তিশালী যে, এন্ডোস্কোপির সময় চিকিৎসকেরা দেখেছেন সেই রস ক্ষয়কারী ফেনা দিয়ে বিভিন্ন ধাতুকে ক্ষয় করে ফেলা যায়।’’

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসও তাঁর এই অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত খাদ্যাভ্যাসের অধিকারী ব্যক্তি হিসাবে তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করেন। মজার বিষয় হল গিনেসের পক্ষ থেকে তাঁকে যে ধাতুর পদক দেওয়া হয়েছিল তিনি সেটিও বেমালুম হজম করে ফেলেছিলেন। তাঁর জীবন নিয়ে বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান, তথ্যচিত্র এবং সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে।

২০০৭ সালের ২৫ জুন মাত্র ৫৭ বছর বয়সে মিশেল মারা যান। তাঁর মৃত্যুর কারণ ধাতব বস্তু খাওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল না বলে জানা যায়। তবে মৃত্যুর পরও তিনি বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর পারফরম্যান্স শিল্পী হিসাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

‘মঁসিয়ে মাঁজেতু’র গল্প শুধু অদ্ভুত এক মানুষের কাহিনি নয়; এটি মানবদেহের বিরল শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং মানুষের অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতারও এক অনন্য উদাহরণ। সাইকেল থেকে শুরু করে টেলিভিশন, শপিং কার্ট, এমনকি একটি সম্পূর্ণ বিমান পর্যন্ত খেয়ে ফেলার এই কীর্তি আজও বিশ্ব জুড়ে মানুষের কৌতূহলের উদ্রেক করে।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]