জুনেই মা হওয়ার কথা ছিল মিতুর; গর্ভের সন্তানসহ মৃত্যুর ঘটনায় স্বামী-শ্বশুরবাড়ির লোকদের বিরুদ্ধে মামলা

আপলোড সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০৮:৫৭:২৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০৮:৫৭:২৮ অপরাহ্ন
জুন মাসেই প্রথম সন্তানের মুখ দেখার স্বপ্ন ছিল মিতু আক্তারের (২০)। নতুন অতিথিকে ঘিরে ছিল তার অসংখ্য পরিকল্পনা, ছিল একটি সুখী সংসারের প্রত্যাশা।

কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নিভে গেল গর্ভের অনাগত সন্তানটির জীবন, আর তার সঙ্গে চিরতরে থেমে গেল মায়েরও জীবনযাত্রা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের বন্দরপাড়া গ্রামে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ মিতু আক্তারের রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভ। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, যৌতুকের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হওয়া মিতুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। যদিও ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনও রয়েছে ধোঁয়াশা। আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড— সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

গত শনিবার (৩০ মে) বিকেলে স্বামীর বাড়ি থেকে অচেতন অবস্থায় মিতুকে উদ্ধার করা হয়। পরে তার মৃত্যু হয়। তবে মৃত্যুর দুই দিন পর সোমবার (১ জুন) বিকেলে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনরা।

এ ঘটনায় নিহতের স্বামী শাহিনুর রহমান (চান্দু), শ্বশুর মো. মুসলিম উদ্দীন ও শাশুড়ি মোছা. সাহেরা খাতুনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা ও সহায়তার অভিযোগে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় মামলা দায়ের করেছেন নিহতের বাবা দেবারু মোহাম্মদ।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় বছর আগে সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের আরাজি রামপুর গ্রামের মিতু আক্তারের সঙ্গে বন্দরপাড়া গ্রামের শাহিনুর রহমানের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে তাকে প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো বলে অভিযোগ পরিবারের।
পরিবারের দাবি, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠক হলেও নির্যাতনের অবসান হয়নি। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শাহিনুর রহমান মাদক ও জুয়ায় আসক্ত ছিলেন এবং প্রায়ই সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করতেন।

নিহতের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য স্বামীর কাছে কিছু টাকা চান মিতু। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হয় এবং শ্বশুর-শাশুড়িও নির্যাতনে অংশ নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মিতুর বাবা দেবারু মোহাম্মদের কণ্ঠে এখনও শোক আর অসহায়তার ভার।

তিনি বলেন, "আমার মেয়ে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। জুন মাসেই তার সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা ছিল। শুধু আমার মেয়েই নয়, তার গর্ভের নিষ্পাপ সন্তানটিও পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চলে গেল। মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখতে অনেক কিছু সহ্য করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে পারলাম না।"

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, "মরদেহ গোসল করানোর সময় শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাই। তখন বুকটা ভেঙে গিয়েছিল। এত আদরের মেয়েকে এভাবে হারাতে হবে কখনও ভাবিনি। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"

স্বামীর পরিবারের দাবি, অসুস্থ অবস্থায় মিতুকে প্রথমে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে নেওয়া হয়েছিল। তবে নিহতের পরিবার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলছে, মিতুর মৃত্যু বাড়িতেই হয়েছে।

ঘটনার পর মরদেহ থানায় নেওয়া হলেও দ্রুত ময়নাতদন্ত সম্পন্ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, রোববার দিন-রাত পার হয়ে গেলেও ময়নাতদন্ত করা হয়নি। পরে সোমবার বিকেল ৩টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, "আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।"

ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. খোদাদাদ হোসেন জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব আইনগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম যথাসময়ে সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে কিছু কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত কারণে ময়নাতদন্তে বিলম্ব হয়েছে।

এদিকে পুরো ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আলোচনা চলছে। একদিকে আত্মহত্যার অভিযোগ, অন্যদিকে নির্যাতন করে হত্যার দাবি, দুই পক্ষের বিপরীতমুখী বক্তব্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। বর্তমানে পলাতক রয়েছেন নিহতের স্বামী শাহিনুর রহমান। পুলিশ বলছে, তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষকে শোকাহত করেছে। মিতু ও তার অনাগত সন্তানের মৃত্যু যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, পারিবারিক নির্যাতন ও যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধি কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এখন স্বজনদের একটাই দাবি, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন হোক, আর মিতু ও তার অনাগত সন্তানের মৃত্যুর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]