স্বপ্নাকে বারবার বললাম, বইন দরজাটা খোল কিন্তু খোলে নাই

আপলোড সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০১:২৬:৩৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০১:২৬:৩৩ অপরাহ্ন
পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন রামিসার মা পারভীন আক্তার। সাক্ষ্যতে শিশু রামিসাকে কীভাবে খুঁজে পান, ওই সময় কী কী করেছিলেন ও দেখেছিলেন তার বর্ণনা দেন তিনি।

আদালতে পারভীন আক্তার বলেন, ‘আমি বারবার স্বপ্নাকে কেঁদে বলি। বইন দরজাটা খোল, দরজাটা খোল। কিন্তু খোলে নাই। পরে দরজা ভাঙতে হয়। ভিতরে গিয়ে মেয়ের খণ্ডিত মরদেহ দেখে অজ্ঞান হয়ে যাই।’

মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে এ সাক্ষ্য দেন তিনি।

এদিন প্রথমে রামিসার বাবা সাক্ষ্য দেন। তার সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হলে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে রামিসার মা পারভীন আক্তার সাক্ষ্য দেন। বেলা ১১টা ০৩ মিনিটের দিকে পারভীনের সাক্ষ্য শুরু হয়। এ সময় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না বেগমকে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।

সাক্ষ্যগ্রহণে পারভীন আক্তার আদালতে বলেন, “আমি গৃহিণী। গত ১৯ মে সকালে এ ঘটনা ঘটে। আমি তখন রান্না করছিলাম। রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। আমার দুই মেয়ে। বড় মেয়ের নাম রাইসা আক্তার। রাইসাকে ঘটনার দিন আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে বললাম, তার চাচা গোলাম মোস্তফার বাসায় যেতে। তখন ছোট মেয়ে রামিসা বললো, ‘আম্মু আমিও আপুর সাথে যাব’। আমি তাকে যেতে না করি।”

‘এরপর আমি আবার রান্নায় ব্যস্ত হয়ে যাই। পরে বড় মেয়ে চাচার বাসায় যায়। ছোট মেয়েকে নেয়নি। রাইসাকে বলে তুমি রুমে থাক। এটা আমি রান্না ঘর থেকে শুনতে পাই। পরে রাইসা তাকে নিয়ে চাচার বাসায় যায় কিনা জানতাম না,’ আদালতে বলেন রামিসার মা।

তিনি আরও বলেন, ‘একটুর পর আমি রান্নাঘর থেকে একটা বাচ্চার চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। পাশের ফ্ল্যাটের আসামি সোহেলদের বাসায় বাচ্চা নেই জানতাম। তবে একটু পর রুমের বাইরে বের হলাম। কাউকে পেলাম না বাইরে। এর ৩-৪ মিনিট পর রাইসা একা তার চাচার বাসা থেকে আসে। আমি রাইসাকে বললাম, তুমি একা কেন। রামিসা কোথায়? রাইসা বলে, সে তো আমার সাথে যায় নাই। নিচে গেছে মনে হয়। নিচে গিয়ে দেখি রামিসা নাই। আশপাশে সবাইকে জিজ্ঞেস করি, রামিসাকে দেখছেন। সবাই বলে, না দেখি নাই।’

পারভীন আক্তার বলেন, ‘বিল্ডিংয়ের নিচে অফিস রুম ভাড়া একটা। সেটার দরজা খুলে দেখলাম, মেয়ে আছে কিনা। কিন্তু পাইনি। দোতলায় ব্যাচেলর ভাড়া দিছে। সেখানেও খুঁজলাম। কিন্তু পেলাম না। পরে তিনতলায় সোহেলদের রুমে ধাক্কা দিলাম। খুললো না। পরে তাদের দরজার সামনে দেখলাম মেয়ের একটা জুতা পড়ে আছে। তখন মনে হলো আগে একটা বাচ্চার চিৎকার শুনছিলাম, ওই বাচ্চার চিৎকার কি আমার মেয়ের? তাহলে কি আমার রামিসাকে এখানে আটকে রেখেছে?’

এরপর দরজা খোলার জন্য বারবার ধাক্কাতে থাকেন উল্লেখ করে রামিসার মা বলেন, ‘কিন্তু কেউ খোলে না। পরে পাঁচতলার মনির ও আসমা নামে এক মহিলা এলো। এরপর একে একে অনেক লোকজন এলো। সবাই দরজা খোলার কথা বলে। কিন্তু আসামিদের কেউ খোলে না। পরে মনিরকে বললাম, নিচে যান। আরও মানুষ ডেকে আনেন। তিনি নিচে গিয়ে ১০-১২ জনকে ডেকে আনেন। তখন আমি আমার স্বামীকে বারবার ফোন দিতে থাকি। উনাকে বলি, আমাদের রামিসাকে পাচ্ছি না। স্বামী তখন অফিস থেকে আসে। ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে চলে আসে।’

পারভীনা আক্তার সাক্ষ্যতে বলেন, ‘তখন সবাই দরজা ভাঙার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে দরজার গোল বোল্ড লক ভাঙা হয়। ভাঙা লকের ছিদ্র দিয়ে দেখি বাথরুম খোলা। ভিতরে কি রক্ত। রাজু নামে একটা ছেলে সেটার ভিডিও করে। আমি চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। তখন আমি আসামি স্বপ্নাকে ভিতরে হাঁটতে দেখি। আমি বাইরে থেকে স্বপ্নাকে বারবার বলতে থাকি, বইন দরজাটা খোল। দরজাটা খোল। আমি তোকে কিছু বলব না। কাঁদতে থাকেন মা পারভীন।’

পারভীন আরও বলেন, ‘এরপর দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখি আমার মেয়ের মাথা এক জায়গায় আর দেহ আরেক জায়গায়। মাথা বাথরুমে বালতিতে। আর দেহ আসামিদের রুমের খাটের নিচে লুকিয়ে রেখেছে। পরে পুলিশ এসে মেয়ের মরদেহ, জামা-কাপড় সব নিয়ে যায়।’

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু রামিসার মায়ের কাছে জানতে চান, তখন স্বপ্নার কাছে কোনো কিছু জানতে চাইলেন কিনা? পারভীন বলেন, ‘তখন অনেক মানুষজন ঢুকে পড়ে। আমি তার কাছে কিছু জানতে পারি নাই। তারা স্বপ্নার কাছে জিজ্ঞাসা করছিল।’

পিপি আরও বলেন, ‘দেখেন তো এখানে স্বপ্না আছেন কিনা।’ তখন পারভীনা কাঠগড়ার দিকে হাত দিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ, ওই যে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। আমি কত বলছি, বইন দরজাটা খোল, দরজাটা খোল। কিন্তু খোলে নাই সে।’ এ কথা বলে কাঁদতে থাকেন রামিসার মা।

বেলা ১১টা ২২ মিনিটে তার সাক্ষ্য শেষ হয়। এরপর রামিসার মাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ। এরপর বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে জেরা শেষ হয়।

এর আগে গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে আট বছরের শিশু রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ফ্ল্যাটটিতে বসবাসকারী সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের কাছে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে সোহেল।

তদন্ত শেষে মামলার চার্জশিটে প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, মাদকে আসক্ত থাকতেন সোহেল। ঘটনার দিন শিশু রামিসাকে বাথরুমে টেনে নিয়ে ধর্ষণ করে সোহেল। রামিসা চিৎকার করে কান্নাকাটি করায় ও পরিবারকে জানানোর কথা বললে ক্ষিপ্ত হয়ে মাথা ও হাত কেটে হত্যা করে সোহেল।

এছাড়া লাশ গুম করতে ও পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করে তার স্ত্রী স্বপ্না।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]