ঠাকুরগাঁও সীমান্তে গভীর রাতে ঢুকছে ভারতীয় গরু, হুমকিতে দেশীয় খামারি ও কোরবানির বাজার

আপলোড সময় : ২৩-০৫-২০২৬ ০৫:২০:২৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৩-০৫-২০২৬ ০৫:২০:২৯ অপরাহ্ন
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে ঠাকুরগাঁও সীমান্ত দিয়ে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভারতীয় গরু চোরাচালান চক্র,এমন অভিযোগ উঠেছে সীমান্তবর্তী এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে। গভীর রাতে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এবং পরে সেগুলো ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশীয় খামারি, সচেতন নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট মহল। স্থানীয়দের দাবি, জেলার বালিয়াডাঙ্গী, রাণীশংকৈল ও পীরগঞ্জ সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন এলাকা বর্তমানে গরু চোরাচালানের অন্যতম রুটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বালিয়াডাঙ্গীর রত্নাই সীমান্ত, আমজানখোর, ধনতলা ইউনিয়ন সংলগ্ন সীমান্ত পয়েন্ট এবং রাণীশংকৈলের ধর্মগড় ও জগদ্দল সীমান্ত দিয়ে গভীর রাতে ভারতীয় গরু ঢুকছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া একাধিক ট্রাকে গরু পরিবহন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এসব গরুর বড় একটি অংশ ভারতীয়। গরুর শারীরিক গঠন, রং, জাত ও চিহ্ন দেখে সহজেই তা শনাক্ত করা যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সীমান্তবর্তী এলাকার এক বাসিন্দা জানান, “একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতীয় গরু দেশে ঢোকাচ্ছে। মাঝরাতে সীমান্তের ফাঁকা পয়েন্ট দিয়ে গরু আনার পর দ্রুত ছোট যানবাহনে তুলে নির্দিষ্ট স্থানে নেওয়া হয়। পরে সেগুলো বড় ট্রাকে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন হাটে পাঠানো হচ্ছে।”

বালিয়াডাঙ্গী সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন,“প্রতিদিন গভীর রাতে গরুর পাল সীমান্ত অতিক্রম করতে দেখা যায়। কয়েকদিন আগে রাত আড়াইটার দিকে কয়েকটি গরুর দল সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে দেখি। পরে সেগুলো ছোট ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। বিষয়টি এলাকাবাসীর অজানা নয়।”

প্রত্যক্ষদর্শী জাহিদ হাসান বলেন, “লাহিড়ী হাটসহ বিভিন্ন পশুর হাটে ভারতীয় গরু বিক্রি হচ্ছে। গভীর রাতে একের পর এক গরুবাহী ট্রাক চলাচল করতে দেখা যায়। গরুগুলোর গঠন ও বৈশিষ্ট্য দেখেই বোঝা যায় এগুলো ভারতীয়।”এদিকে ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন স্থানীয় খামারিরা। তারা বলছেন, সারা বছর খরচ ও শ্রম দিয়ে গরু লালন-পালনের পর ঈদের আগে যদি বিদেশি গরু বাজার দখল করে, তাহলে দেশীয় খামারিরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কালিতলা এলাকার খামারি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন,“আমরা সারা বছর ঋণ করে, কষ্ট করে গরু পালন করি। এখন যদি ভারতীয় গরু বাজারে আসে, তাহলে দেশীয় গরুর দাম পড়ে যাবে। এতে ছোট ও মাঝারি খামারিরা পথে বসবে।” সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম বলেন,“এ বছর কোরবানির পশুর বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। খামারিরা আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে নিরুৎসাহিত করবে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতীয় গরুর অবৈধ অনুপ্রবেশ শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি। অবৈধভাবে আসা পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা না হওয়ায় সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান সিন্ডিকেট সক্রিয় হলে মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য অবৈধ বাণিজ্যের ঝুঁকিও বাড়ে।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ইজাহার আহমেদ খান বলেন,“সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু প্রবেশ স্থানীয় অর্থনীতি ও খামারিদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এই চোরাচালান বাড়ে। এতে দেশীয় খামারিরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।”এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তানজীর আহম্মদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন,“বিষয়টি আমার জানা ছিল না। বিজিবি জানিয়েছিল গরু পারাপার হচ্ছে না। তবে ভিডিও দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। দ্রুত সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এদিকে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ গরু চোরাচালান শুধু একটি আইনভঙ্গের ঘটনা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, দেশীয় খামার শিল্প ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। সচেতন নাগরিক হিসেবে অবৈধ পশু পরিবহন, সন্দেহজনক ট্রাক চলাচল কিংবা সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালানের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো সকলের দায়িত্ব। দেশীয় খামারিকে বাঁচাতে এবং নিরাপদ কোরবানির পশুর বাজার নিশ্চিত করতে প্রশাসন, বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]