কার্নিভাল, সাম্বা আর ফুটবলের নান্দনিক মেলবন্ধন ও ব্রাজিলের সংস্কৃতি

আপলোড সময় : ২১-০৫-২০২৬ ০৬:০৬:৪৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২১-০৫-২০২৬ ০৬:০৬:৪৯ অপরাহ্ন
দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম এবং আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম দেশের নাম ব্রাজিল। তবে কেবল ভৌগোলিক বিশালত্ব বা আমাজনের অরণ্যের জন্য নয়, বিশ্ববাসীর কাছে দেশটির মূল পরিচিতি ও আবেগের নাম ফুটবল।

ব্রাজিল আর ফুটবল যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, একটিকে ছাড়া অন্যটি কল্পনা করা অসম্ভব। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর এই দেশে ফুটবল কেবল একটি জনপ্রিয় খেলা নয়, এটি তাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

খেলার মাঠে ব্রাজিলের ফুটবলাররা যখন ছন্দের জাদুতে মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে আক্রমণ শানায়, তখন ঠিক যেন মনে হয় নৃত্যের মুদ্রার একেকটি নিখুঁত ধাপ। শুধু ড্রিবলিং বা পাসিংয়েই নয়, গোল করার পরও শরীর দুলিয়ে একত্রে কিংবা এককভাবে নৃত্য করেন খেলোয়াড়েরা।

ব্রাজিলীয়দের এই ছন্দময় ফুটবলের কথা বলতে গেলেই অবধারিতভাবে উঠে আসে তাদের ঐতিহ্যবাহী নাচের কথা, যার নাম 'সাম্বা'। মূলত এই কারণেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলের ধারাভাষ্যকাররা ব্রাজিলের খেলার বর্ণনা করতে গিয়ে বারবার উচ্চারণ করেন 'ব্রাজিলিয়ান সাম্বা'-র কথা। ব্রাজিলের অলিতে-গলিতে, রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা সৈকত কিংবা ফাবেলার (বস্তি) ধুলোবালি ও কর্দমাক্ত পথেই বেড়ে উঠেছে বিশ্ব ফুটবলের সব তারকা ও মহাতারকারা, যারা এই সাম্বার জাদুতে মুগ্ধ করেছে গোটা বিশ্বকে।

অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম বড় ও জমকালো সাংস্কৃতিক উৎসব ব্রাজিলের 'রিও কার্নিভাল' অনুষ্ঠিত হয় দেশটির রিও ডি জেনিরো শহরে। এই উৎসবে তারা বর্ণিল সাজে ফুটিয়ে তোলে ব্রাজিলের সংস্কৃতি, সাম্বা আর ফুটবল।

ব্রাজিলের মানুষের কাছে এই তিনটি জিনিস যেন তাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয়। একটি কার্নিভাল, দ্বিতীয় সাম্বা ও তৃতীয়টি ফুটবল। এই তিনটি অনন্য আবেগকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি দিতে ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন কাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বলের নাম দেওয়া হয়েছিল 'কাফুসা' (Cafusa)। ব্রাজিলের তিনটি শব্দ: কার্নিভাল (Carnival), ফুটবল (Futebol) এবং সাম্বা (Samba)- এর সমন্বয়ে এই নামকরণ করা হয়েছিল।

শুধু ছন্দময় ও নান্দনিক ফুটবলই নয়, ব্রাজিল ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দলও বটে। হলুদ-সবুজ জার্সিধারী 'সেলেসাও'দের রয়েছে কিছু মহাকাব্যিক রেকর্ড। ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ ৫ বার (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪, ২০০২) বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে ব্রাজিল। ১৯৩০ সালের প্রথম আসর থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের চলমান আসর পর্যন্ত বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে অংশ নেওয়া পৃথিবীর একমাত্র দলও তারা। তারা কখনও বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়েনি। ব্রাজিলের কালো মানিক পেলে বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি ফুটবলার হিসেবে ৩টি বিশ্বকাপ (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০) জয়ের অনন্য ও অমর কীর্তি গড়ে হয়েছেন ফুটবলের সম্রাট। 

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়েছে এমন কিছু মহাতারকার হাত ধরে, যাদের নৈপুণ্য ফুটবলকে শিল্পে রূপ দিয়েছে। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গোলপোস্টের নিচে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে টানা দুবার বিশ্বজয় করেছিলেন গোলরক্ষক জিলমার। তার সাথেই ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে পেলের ইনজুরির পর এক পা বাঁকা থাকার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে নিজের অবিশ্বাস্য ড্রিবলিংয়ের জোরে একাই ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করেন গারিঞ্চা। 

আশির দশকে ‘সাদা পেলে’ খ্যাত জিকো তার নিখুঁত ফ্রি-কিক আর নান্দনিক পাসিং দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল দল। এরপর ডি-বক্সের ভেতর ক্ষিপ্র গতির আক্রমণ চালানো 'খুনে স্ট্রাইকার' রোমারিও ব্রাজিলকে ট্রফি এনে দেন ১৯৯৪ বিশ্বকাপে। কাটান দীর্ঘ ২৪ বছরের খরা। ১৯৯৮ সালের ফাইনালের ট্র্যাজেডি ভুলে ২০০২ বিশ্বকাপে ৮ গোল করে, ফাইনালে জার্মানির দেয়াল ভেঙে ব্রাজিলকে পঞ্চম শিরোপা এনে দিয়েছিলেন গতি আর শক্তির অবিশ্বাস্য প্রতীক 'দ্য ফেনোমেনন' রোনালদো নাজারিও। আর সেই ২০০২ দলের অন্যতম সেরা তারকা রোনালদিনহো মাঠে তার বিখ্যাত ‘নো-লুক পাস’ আর চোখের পলকে ডিফেন্ডারদের বোকা বানানোর জাদুকরী কৌশল দিয়ে ফুটবলকে করে তুলেছিলেন নিখাদ আনন্দের এক উৎসব।

ব্রাজিলীয়দের কাছে ফুটবল মানে আনন্দ, ফুটবল মানে উৎসব আর সংস্কৃতি প্রকাশের এক পরম মাধ্যম। কাতারের আক্ষেপ ভুলে মিশন হেক্সা বা ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন বুকে নিয়ে উত্তর আমেরিকার ২০২৬ বিশ্বকাপেও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের চোখ থাকবে সাম্বা জাদুকরদের ছন্দময় ও নান্দনিক পায়ের জাদুতে।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]