রাজশাহী অঞ্চলে ভেজাল কীটনাশকে বাজার সয়লাব

আপলোড সময় : ২১-০৫-২০২৬ ০৪:৪৭:৫১ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২১-০৫-২০২৬ ০৪:৪৭:৫১ অপরাহ্ন
রাজশাহী অঞ্চলে ভেজাল ও নিম্নমানের কীটনাশকে বাজার সয়লাব। স্থানীয় সুত্র বলছে, রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট, মৌগাছি, শ্যামপুর ও ধুরইলহাট,তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা, সরনজাই, দরগাডাঙা, মাদারীপুর, কোয়েল, কলমা, ইলামদহী, তালন্দ, কামারগাঁ, গোদাগাড়ী সদর, কাঁকনহাট, নওগাঁর মান্দা উপজেলার সাবাইহাট, দেলুয়াবাড়ি, জোতবাজার ও চৌবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নিম্নমানের কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে। কীটনাশক আসল-নকল-ভেজাল না নিম্নমানের তা বোঝার ক্ষমতা নাই সিংহভাগ কৃষকের। কৃষকের এই সরলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের একশ্রেণীর কীটনাশক ব্যবসায়ী, দ্বিগুন দামে বাঁকিতে এসব কীটনাশক বিক্রি এবং কৃষকদের কিনতে উদ্বুদ্ধ করছে।

অন্যদিকে ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে যে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় তাতেও মিলেছে ভেজাল এতে বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষক।

সম্প্রতি বাজারে থাকা ১৪টি কোম্পানির ১৫টি বালাইনাশক (কীটনাশক) ওষুধে রাসায়নিক পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফল পায়নি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। যার কারণে এসব কোম্পানিকে সাত দিনের মধ্যে বাজার থেকে পণ্য সরাতে নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি। কৃষিতে ভেজাল ও নিম্নমানের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে ফসলের ফলন বিপর্যয় ঘটে। একই সঙ্গে কৃষকদের উৎপাদন খরচ ও আর্থিক ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যায়। এসব প্রেক্ষাপটে ভেজাল বালাইনাশক রোধে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতেই গত ১৯ মে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, কোহিনুর অ্যাগ্রা কেমিক্যালসের ‘ব্রডার ৫৫ ইসি’(ক্লোরপাইরিফস+সাইপারমেথ্রিন), র‌্যাভিন অ্যাগ্রো কেমিক্যালস লিমিটেডের দুটি পণ্য ‘সার্টার ৫৫ ইসি’ ও র‌্যাভ-জুম ১৪.৫ এসসি (ইনডোক্সার্ড)। এগ্রি সোর্স লিমিটেডের ‘ডকোর্ড ১০ ইসি’, সী ট্রেড ফার্টিলাইজার লিমিটেডের ‘প্রোকটিন ৫ এসজি’ (ইমামসিটিন বেনেজোট), কৃষি ক্রপ কেয়ার লিমিটেডের ‘ডুঙ্গা ৩৬ ইসি (ডিফেকোনোজল+প্রোপিকনোজল+ টেবাকোনোজল),  পদ্মা ওয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ‘পদ্মা লামডা ৫ ইসি (লামডা+ ক্লোরোথিন), ‍সোয়েল অ্যাগ্রা কেমিক্যালস লিমিটেডের  টোমিস্টার ৩২.৫ এসসি (অ্যাজোক্সিথ্রবিন+ডিফেকোনোজল), সেফ ক্রপ লিমিটেডের ফাইট ৫৫ ইসি (ক্লোরপাইরিফস+সাইপারমেথ্রিন), গোল্ডেনকি অ্যাগ্রিবিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ‘গোল্ডেন প্লাস ২৮ এসসি’ (অ্যাজোক্সিথ্রবিন+সিপ্রোকোনোজল), অ্যান্টিজার অ্যাগ্রো কেয়ারের ‘লাসহা ৮০ ডব্লিউপি (ম্যানকোজেব), মামুন অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট লিমিটেডের ‘মনোকাট ৭০ ডব্লিউডিজি (ইমিড্যাক্লোরোপাইড), ভিরন অ্যাগ্রো লিমিটেডের ‘নিভা ৯৫ এসপি’ (কার্টাপ+অ্যাসিটামিপ্রিড), টিম অ্যাগ্রি সায়েন্সের  ‘মাভিয়া ৫৫ ইসি (ক্লোরপাইরিফস+সাইপারমেথ্রিন) এবং র‌্যাক্সিমো ইনসেকটিসাইডস লিমিটেডের ‘রে-জল ৩০ ডব্লিউডিজি’ (ডাইফেনোকোনোজল+ প্রোপিকোনাজল) বালাইনাশকে  গবষণোগারে রাসায়নিক পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফল পাওয়া যায়নি। 

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, এসব পণ্যের সব বালাইনাশকের পত্র প্রাপ্তির সাত কর্মদিবসের মধ্যে বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়। 

এ বিষয়ে জানতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. নাহিদা আমীনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। 

বিজ্ঞপ্তিতে র‌্যাভিন অ্যাগ্রো কেমিক্যালস লিমিটেডের দুটি পণ্য ‘সার্টার ৫৫ ইসি’ ও র‌্যাভ-জুম ১৪.৫ এসসি (ইনডোক্সার্ড) বালাইনাশক পণ্যের গবেষণাগার নিয়ে আপত্তি তুলেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। বিষয়টি জানতে কোম্পানিটির যশোর অফিসের ‍ডিপার্টমেন্ট ইনচার্জ আবু বক্কর সিদ্দিক (ডিএম)  বলেন, পণ্যের মান যাচাইয়ে গবেষণাগারে এক শতাংশ কম হলেই সেটা নিয়ে আপত্তি তুলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এখন পর্যন্ত কৃষরা কোনো আপত্তি তুলেনি। মাঠ পর্যায়ে পণ্য নিয়ে আমাদের গ্রহণযোগত্যা ভালো বলে দাবি করেন তিনি।  

বাংলাদেশের কৃষি উপকরণ খাত যেমন- বীজ, কীটনাশক, বালাইনাশক বা সার— সব ক্ষেত্রেই প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পণ্য নকল, ভেজাল, অবৈধ বা নিম্নমানের হয়ে থাকে বলে উল্লেখ করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) প্ল্যান্ট প্যাথলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও ইউএসএআইডি’র সাবেক ন্যাশনাল পেস্টিসাইড পলিসি কনসালটেন্ট প্রফেসর নোমান ফারুক। তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে ১২০০ থেকে ১৩০০-র বেশি কীটনাশক প্রতিষ্ঠানের আবেদন জমা পড়ে আছে। আর বাজারে পণ্যের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। কৃষি উপকরণ খাতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পণ্য নকল, ভেজাল, অবৈধ বা নিম্নমানের হয়ে থাকে । এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষকরা। মূল সমস্যাটি হলো আমাদের নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামোর সীমাবদ্ধতা। কীটনাশক নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার। সারা দেশে তাদের পরিদর্শক থাকলেও কীটনাশক পরীক্ষার জন্য পুরো দেশে মাত্র একটি গবেষণাগার আছে, যা ঢাকার খামারবাড়িতে অবস্থিত। একটি মাত্র গবেষণাগার দিয়ে বছরে ১০ হাজার বা তার বেশি পণ্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত দুরুহ কাজ। বর্তমানে নিয়ম হলো, পরিদর্শকরা যে নমুনাকে সন্দেহ করেন, কেবল সেটিই পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠান। 

তার মতে, কীটনাশক খাতকে কঠোর আইনি কাঠামোর আওতায় এনে প্রতি বছর প্রতিটি পণ্য অন্তত একবার দৈবচয়ন ভিত্তিতে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বাজারে থাকা পণ্যগুলো সঠিকভাবে যাচাই করতে হলে বছরে অন্তত ২০ হাজার বার পরীক্ষা করতে হবে। কারখানা থেকে নমুনা নিলে অনেক সময় তা সঠিক পাওয়া যায়, কিন্তু খুচরা দোকান থেকে পণ্য সংগ্রহ করলে দেখা যায় সেগুলো নিম্নমানের। এই নিম্নমানের বালাইনাশকের কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং রোগ-বালাই দূর হয় না। 

প্রফেসর নোমান ফারুক বলেন, বালাইনাশকে আরেকটি বড় সমস্যা হলো ওষুধের সক্রিয় উপাদানের ঘাটতি। কোনো ওষুধে ৮০ শতাংশ সক্রিয় উপাদান থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে আছে ৫০ শতাংশ। এর ফলে বালাই বা পোকা মরে না, বরং তাদের মধ্যে ওই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে আসল ওষুধ দিয়েও আর সেই পোকা দমন করা যায় না। এটি একটি জাতীয় আপদ। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই নকল, ভেজাল ও অবৈধ পণ্যের বিরুদ্ধে কৃষকের সুরক্ষায় ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণের কথা বলে আসছি। বর্তমানে যে উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে তা সাহসী ও প্রশংসনীয়, তবে এটি যেন কেবল কয়েকটি পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।

সকল কীটনাশককে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে এবং নিয়মিত নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। যারা নকল বা ভেজাল পণ্য তৈরি করে, তাদের এমন কঠোর আর্থিক জরিমানা বা শাস্তির আওতায় আনতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন কাজ করার সাহস না পায়। এই অশুভ তৎপরতা বন্ধ করতে হলে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]