দুর্গাপুরে তিন আদম দালালের ভয়াবহ প্রতারণার ফাঁদ

আপলোড সময় : ০৫-০৫-২০২৬ ০৬:৩২:২৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৫-০৫-২০২৬ ০৬:৩২:২৮ অপরাহ্ন
যিনি ক্লাসে নীতি-নৈতিকতা শেখান, যাঁর হাতে গড়ার কথা ছিল আগামীর ভবিষ্যৎ-সেই শিক্ষকই যখন প্রতিবেশী যুবকের মাংস নিয়ে ব্যবসা করেন, তখন সমাজের বিবেক থমকে দাঁড়ায়। রাজশাহীর দুর্গাপুরে এমনই এক পৈশাচিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন অসহায় জান মোহাম্মদের ছেলে সুমন ইসলাম। সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে সুমনসহ আরও ৫ যুবককে কম্বোডিয়ায় নিয়ে পশুর মতো বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসা শিক্ষক আব্দুল মান্নানসহ তিন ‘আদম দালালের’ বিরুদ্ধে। এঘটনায় ভুক্তভোগী সুমনের বাবা জান মোহাম্মদ প্রতিকার চেয়ে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। 

অভিযোগ সুত্রে জানা যায়, তিন আদম দালাল উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান মাস্টার (৫০) মো: বাবুল (৪৮) ও একই গ্রামের কম্বোডিয়া প্রবাসী মো: শাকিব (২৮) মিলে এই চক্রটি গড়ে তুলেছেন। আব্দুল মান্নান মাস্টার স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা ও বাজারে ব্যবসা করার সুবাদে সুমনের পরিবারের বিশ্বাস অর্জন করেন। সুমনকে কম্বোডিয়ায় ভালো বেতনে কাজ দেওয়ার কথা বলে পর্যায়ক্রমে দেশেই ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় এই চক্র।

অভিযোগের তথ্যনুযায়ী, গত ০৮/১০/২০২৫ তারিখে সুমন কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পরই ৩নং বিবাদী শাকিব তার পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। এরপর সুমনকে একটি কোম্পানির কাছে ১ হাজার ডলারে (প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকায়) বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এক বছরের ভিসার কথা বলে নেওয়া হলেও তাকে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৩ মাসের ট্যুরিস্ট ভিসা। সেখানে তাকে মানবেতর অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য করা হয় এবং পুনরায় ভিসার নামে আরও ১ লক্ষ ৩২ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে চক্রটি।

​কোনো উপায় না পেয়ে জীবন বাঁচাতে সুমন পরিবারের সাথে যোগাযোগ শুরু করে। পরে সংশ্লিষ্ট চায়না কোম্পানিকে ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং ওভার-স্টে ও টিকেট বাবদ আরও ৫০ হাজার টাকা খরচ করে রিক্তহস্তে দেশে ফিরে আসেন। সব মিলিয়ে এই প্রতারণার শিকার হয়ে পরিবারটি প্রায় ৯ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা হারিয়ে এখন চরম ঋণের চাপে দিশেহারা।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই তিন দালালদের মধ্যে আব্দুল মান্নান উপজেলার সুখানদিঘি দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষকতার লেবাস পরে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতেন। তার বিরুদ্ধে মসজিদের অর্থ আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। তিনি এক ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ছত্রছায়ায় থাকেন। মান্নান মাস্টারের প্রধান সহযোগী বাবুল যিনি কাপড় ব্যবসার আড়ালে ঘরে ঘরে গিয়ে মিথ্যে আশার জাল বুনতেন। বিদেশ পাঠাতে লোক সংগ্রহের কাজ করেন। 

আরও জানা যায়, কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর সেখানে ‘রিসিভ’ করে প্রতারণা কোম্পানির কাছে বিক্রি করার মূল দায়িত্ব পালন করেন বাবুলের ভাতিজা এ চক্রের মাস্টারমাইন্ড শাকিব। এমন ভয়াবহ প্রতারণার ফাঁদে শুধু জান মোহাম্মদের ছেলে সুমন ইসলাম একাই নয়। তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অন্ধকারের বিভীষিকায় দিন কাটছে উপজেলার বখতিয়ারপুর গ্রামের নুর ইসলামের ছেলে আমজাদ, নারায়ণপুর গ্রামের আব্দুল্লাহ'র ছেলে নাসির উদ্দিন, একই গ্রামের আতাউর হোসেনের ছেলে বিপ্লব হোসেন, পাঁচুবাড়ি (চকপাড়া) গ্রামের সিদ্দিকুরের ছেলে সাগর ও ভবানিপুর গ্রামের মৃত খোকা মন্ডলের ছেলে এনামুল ইসলামের পরিবারে। এদের মধ্যে ৪ জনের পরিবার তাদের সন্তানদের ধারদেনা করে দেশে ফিরিয়ে আনেন।  কিন্তু এনামুল ইসলাম দেশে ফেরার টাকা না পেয়ে কম্বোডিয়ায় ফেরারি জীবন নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

 ক্ষুব্ধ স্থানীয় এক যুবক বলেন, ​"আমরা তো ভয়ে আছি। মান্নান মাস্টার ও বাবুলের মতো মানুষরা যখন সমাজের ভেতর মিশে থেকে এমন  মরণফাঁদ পাতে, তখন আমাদের মতো গরিব ছেলেদের নিরাপত্তা কোথায়? এই তিন প্রতারকের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হয়, তবে এই এলাকায় এমন প্রতারণা আরও বাড়বে।" 

ভুক্তভোগী সুমনের বাবা জান মোহাম্মদ বলেন, প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে আব্দুল মান্নান মাস্টার  আমাকে আশ্বস্ত করেন ছেলেকে তিনি নিজের দায়িত্বেই বিদেশে ভালো কাজে দেবেন। মাদ্রাসা শিক্ষকের ধর্মীয় লেবাস ও আশ্বাসে মুগ্ধ হয়ে জমি বন্ধক, শেষ সম্বল বিক্রি এবং ঋণ করে দফায় দফায় মান্নান মাস্টারের হাতে মোট ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছি। এখন টাকা ফেরত চাইলে আমাকে ও আমার ছেলেকে হুমকি দিচ্ছে।" তারা প্রভাবশালী আদম দালাল  হওয়ায় থানায় অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাইনি। 

এবিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুল মান্নান মাস্টার মুঠোফোনে বলেন, জান মোহাম্মদ তার ছেলেকে বিদেশ পাঠানো জন্য শাকিবকে দিতে পর্যায়ক্রমে আমার কাছে ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে শাকিবের একাউন্টে লাগিয়ে দিয়েছি। "আমি ব্যবসা করি আদম ব্যবসার সাথে জড়িত না।" 

এব্যাপারে, দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, আমি থানায় সদ্য যোগদান করেছি। অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নাই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।  

অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাশতুরা আমিনা মুঠোফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]