বাংলা সালের সঙ্গে হিজরি সালের সম্পর্ক

আপলোড সময় : ১৪-০৪-২০২৬ ০২:০৩:৩৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৪-০৪-২০২৬ ০২:০৩:৩৯ অপরাহ্ন
পৃথিবীতে সময় গণনার ইতিহাস বহু প্রাচীন, আর এই গণনার প্রধান দুটি পদ্ধতি হলো সৌর বর্ষ এবং চান্দ্র বর্ষ। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ সূর্য ও চন্দ্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সময় নির্ধারণের চেষ্টা করেছে। সূর্যের এক পূর্ণ পরিক্রমণ সম্পন্ন করতে যে সময় লাগে—প্রায় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড—তাকে বলা হয় সৌরবর্ষ। অন্যদিকে চাঁদের কলার পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে যে সময় গণনা করা হয়, তাকে বলা হয় চান্দ্রবর্ষ, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫৪ দিন ৮ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট। এই দুই পদ্ধতির পার্থক্য থেকেই সময় ও ঋতুর ব্যবস্থাপনায় ভিন্নতা দেখা দেয়।

বাংলা বর্ষপঞ্জির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এটি মূলত হিজরি বর্ষপঞ্জির উত্তরাধিকার বহন করে। ইসলামের ইতিহাসে হিজরি বর্ষপঞ্জির সূচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদের (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত শুধু একটি স্থানান্তর ছিল না, বরং এটি ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) হিজরতের ১৭ বছর পর একটি স্বতন্ত্র বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন, যা হিজরি বর্ষপঞ্জি নামে পরিচিত। এই বর্ষপঞ্জির সূচনা ধরা হয় মহররম মাস থেকে।

বাংলাদেশে ইসলাম আগমনের পর হিজরি সালের প্রচলন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে। বিশেষত ১২০১ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ারুদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর মাধ্যমে মুসলিম শাসাল প্রতিষ্ঠার পর হিজরি বর্ষপঞ্জি রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। দীর্ঘ সময় ধরে এই সাল প্রশাসনিক ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে একটি বড় সমস্যা ছিল—হিজরি বর্ষপঞ্জি সম্পূর্ণভাবে চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এটি ঋতুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে কৃষিনির্ভর বাংলার রাজস্ব আদায়ের সময় নির্ধারণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। এই সমস্যার সমাধানের জন্য মুঘল সম্রাট আকবর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, একটি এমন বর্ষপঞ্জি প্রয়োজন যা ঋতুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কৃষিকাজের জন্য সহায়ক।

এই উদ্দেশ্যে তিনি প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতেহুল্লাহ সিরাজীকে একটি নতুন বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের দায়িত্ব দেন। সিরাজী হিজরি সালের মূল কাঠামো বজায় রেখে সেটিকে সৌর পদ্ধতির সঙ্গে সমন্বয় করেন, যাতে ঋতুচক্রের সঙ্গে খাজনা আদায়ের একটি স্থায়ী সামঞ্জস্য তৈরি হয়। হিজরি বর্ষপঞ্জি চান্দ্র পদ্ধতির হওয়ায় তা প্রতি বছর প্রায় ১১ দিন এগিয়ে যেত, যা ফসল কাটার সময়ের সঙ্গে মিলত না। সিরাজী এই সমস্যা সমাধানে চন্দ্র বছরের ৩৫৪ দিনের পরিবর্তে ৩৬৫ দিনের সৌর বছর গণনা শুরু করেন।

এই সমন্বয়ের একটি অনন্য দিক হলো হিজরি ও বাংলা বর্ষপঞ্জির সূচনাবিন্দুকে অভিন্ন রাখা। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন ছিল হিজরি ৯৬৩ সাল। ফতেহুল্লাহ সিরাজী ৯৬৩ হিজরিকে ভিত্তি বছর ধরে নতুন বাংলা বর্ষপঞ্জি গণনা শুরু করেন। ৯৬৩ হিজরি পর্যন্ত চান্দ্র বছরের (৩৫৪ দিন) হিসাব বজায় রাখেন, ৯৬৩ সালের পরবর্তী বছর থেকে সৌর বছরের (৩৬৫ দিন) হিসাব শুরু করেন। হিজরি ক্যালেন্ডারের ৯৬৩ সাল ছিল বাংলা ক্যালেন্ডারেরও ৯৬৩ সাল। এ কারণে হিজরি ও বাংলা সালের আদি উৎস একই বিন্দুতে মিলিত রয়েছে, যা ধর্মীয় ঐতিহ্য ও কৃষি সংস্কৃতির এক চমৎকার মেলবন্ধন তৈরি করেছে।

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত মাসের নামগুলো গ্রহণ করা হয়। বাংলায় তখন প্রচলিত মাসগুলোর মধ্যে বৈশাখ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস, তাই এটিকেই নতুন সালের প্রথম মাস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

প্রাচীনকালে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হতো অগ্রহায়ণ মাসে, যখন নতুন ফসল ঘরে উঠত এবং নবান্নের আনন্দে মানুষ মেতে উঠত। কিন্তু পরবর্তীকালে নববর্ষ উদযাপনের সময় পরিবর্তিত হয়ে বৈশাখ মাসে স্থির হয়।

সময়ের সাথে সাথে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে কিছু সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি বর্ষপঞ্জি সংস্কার কমিটি গঠিত হয়। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী বাংলা মাসগুলোর দিনসংখ্যা নির্ধারণ করা হয়—বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিন। অধিবর্ষের ক্ষেত্রে চৈত্র মাস ৩১ দিনে গণ্য হবে বলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে এই সংস্কারকৃত বাংলা বর্ষপঞ্জিই প্রচলিত রয়েছে। 

বাংলা বর্ষপঞ্জি শুধু একটি সময় গণনার পদ্ধতি নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ধর্মীয় বর্ষপঞ্জি বা হিজরি বর্ষপঞ্জির সঙ্গে যেমন এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি এটি বাংলার কৃষি, ঋতু এবং সামাজিক জীবনের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িত।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]