ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নারী যোদ্ধা যিনি

আপলোড সময় : ১৩-০৪-২০২৬ ০২:০৫:৪৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৩-০৪-২০২৬ ০২:০৫:৪৯ অপরাহ্ন
নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.)। ইতিহাস যাকে উম্মে আম্মারা নামে চেনে। তিনি ছিলেন মদিনার আনসার নারীদের মধ্যে এক অনন্য আলোকবর্তিকা। তার জীবন ছিল বিশ্বাস ও বীরত্বের এক জীবন্ত মহাকাব্য। তার জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এমন সব ঘটনা, যা আজও যেকোনো মানুষের হৃদয়ে ঈমানের স্পন্দন জাগিয়ে তোলে। 

ইসলামের পথে নুসাইবা (রা.)-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল অত্যন্ত নাটকীয় ও সাহসিকতাপূর্ণভাবে। যখন মক্কার কুরাইশদের ভয়ে মদিনার মুসলমানরা গোপনে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, সেই প্রতিকূল সময়েও তিনি পিছিয়ে থাকেননি। মক্কার ‘আকাবা’ নামক গিরিপথে যে ৭৩ জন পুরুষ রাসুল (সা.)-এর হাতে আনুগত্যের শপথ নিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে মাত্র দুইজন নারী ছিলেন। তাদের একজন নুসাইবা (রা.)। তিনি জানতেন এই শপথের অর্থ কী— এটি ছিল সত্যের পথে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার এক অলিখিত চুক্তি। (সীরাত ইবনে হিশাম)

উম্মে আম্মারা ইবাদত-বন্দেগিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; ইসলামের প্রয়োজনে যুদ্ধের ময়দানে যেতেও তিনি দ্বিধা করতেন না। উহুদ যুদ্ধের দিন তিনি প্রথমে গিয়েছিলেন যোদ্ধাদের পানি পান করাতে এবং আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে। এটি ছিল সে সময়ের নারীদের একটি সাধারণ ভূমিকা। কিন্তু যুদ্ধের মোড় যখন ঘুরে গেল এবং মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ পাহাড়ের গিরিপথ ছেড়ে চলে আসায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলো, তখন পরিস্থিতি পাল্টে গেল। কাফিররা যখন চারদিক থেকে রাসুল (সা.)-কে লক্ষ্য করে আক্রমণ শুরু করল, তখন নুসাইবা (রা.) আর পানি পানের পাত্র হাতে বসে থাকলেন না। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

মমতাময়ী এক নারী মুহূর্তেই পরিণত হলেন রণচণ্ডী যোদ্ধায়। তিনি হাতের পানির মশক ফেলে দিয়ে তলোয়ার ও ধনুক তুলে নিলেন। সাহাবীদের একটি বড় অংশ যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন, তখন যে দশ-বারোজন ব্যক্তি নিজের শরীর দিয়ে রাসুল (সা.)-কে আগলে রেখেছিলেন, নুসাইবা (রা.) ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি তার স্বামী ও দুই পুত্রকে নিয়ে রাসুল (সা.)-এর চারদিকে এক মানবঢাল তৈরি করেছিলেন। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ)

যুদ্ধের এক পর্যায়ে ইবনে কামিয়া নামক এক কাফির অশ্বারোহী ‘মোহাম্মদ কোথায়?’ বলে চিৎকার করতে করতে রাসুল (সা.)-এর দিকে ধাবিত হয়। সে সময় নুসাইবা (রা.) বীরদর্পে তার সামনে দাঁড়িয়ে যান। ইবনে কামিয়া তার কাঁধে তলোয়ার দিয়ে এক ভয়াবহ আঘাত করে, যার ফলে সেখানে গভীর গর্ত হয়ে যায়। কিন্তু নুসাইবা (রা.) বিচলিত হননি; বরং তিনি পাল্টা আঘাত করেন। যদিও ইবনে কামিয়ার গায়ে দুই স্তরের বর্ম থাকায় সে বেঁচে যায়, কিন্তু নুসাইবার এই সাহসিকতা দেখে স্বয়ং রাসুল (সা.) বিস্মিত হয়েছিলেন। (শরহুস সুন্নাহ)

উহুদ যুদ্ধের সেই সংকটময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে পরবর্তীতে রাসুল (সা.) নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি উহুদের দিন ডানে কিংবা বামে যেদিকেই তাকিয়েছি, দেখেছি উম্মে আম্মারা আমাকে রক্ষা করার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করছেন।’

একজন নারীর এই অসামান্য বীরত্ব দেখে রাসুল (সা.) খুশি হয়ে তার এবং তার পরিবারের জন্য দোয়া করেছিলেন। নুসাইবা (রা.) তখন দুনিয়ার কোনো সম্পদ চাননি, বরং বিনীতভাবে আরজ করেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! দোয়া করুন যেন জান্নাতে আপনার সাথী হতে পারি।’ রাসুল (সা.) তার এই আবেদন কবুল করে দোয়া করেছিলেন। (আল-ইসাবাহ ফি তাময়িজিস সাহাবাহ)

নুসাইবা (রা.)-এর এই বীরত্ব উহুদেই থেমে থাকেনি; তিনি হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং খায়বারের যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর যখন ভণ্ড নবী মুসাইলামা কাজ্জাবের আবির্ভাব ঘটে, তখন তিনি তার বয়সের ভার ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা ভুলে গিয়ে আবার যুদ্ধের ময়দানে নামেন। 

ইয়ামামার সেই ভয়াবহ যুদ্ধে তিনি তার প্রিয় পুত্র আব্দুল্লাহকে হারান, তাকে মুসাইলামা অত্যন্ত নৃশংসভাবে শহীদ করেছিল। পুত্রের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি ভেঙে পড়েননি, বরং দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে হয় তিনি মুসাইলামাকে খতম করবেন, নয়তো নিজে শহীদ হবেন। (তারিখে তাবারী)

ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন এবং শত্রুপক্ষের ব্যূহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়েন। এই যুদ্ধে তার শরীরে ১১টি জখম হয় এবং একটি হাত কবজি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবুও তিনি লড়ে গেছেন যতক্ষণ না মুসাইলামা পরাজিত ও নিহত হয়েছে। এই দীর্ঘ লড়াই আর অগণিত ক্ষতচিহ্ন তার সারা শরীরে বীরত্বের সাক্ষ্য হয়ে ছিল আমৃত্যু। (আল-কামিল ফিত তারিখ)

তিনি ছিলেন একাধারে মমতাময়ী মা, সেবিকা এবং সমরকুশলী যোদ্ধা। মদিনার সেই সাধারণ নারী তার ঈমানি শক্তিতে নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা.) তার প্রশংসা করেছেন। ইতিহাসের পাতায় তিনি অমর হয়ে আছেন সেই নারী হিসেবে, যিনি তলোয়ার হাতে জান্নাতের সওদা করেছিলেন। (সীরাত বিশ্বকোষ)

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]