আশরাফুল মাখলুকাত হওয়ার প্রকৃত অর্থ

আপলোড সময় : ০৮-০৪-২০২৬ ০২:৫২:০৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৮-০৪-২০২৬ ০২:৫২:০৭ অপরাহ্ন
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সর্বোত্তম গঠনে—এমন সৌন্দর্য, সামর্থ্য ও সম্ভাবনা দিয়ে, যা অন্য কোনো সৃষ্টির মাঝে নেই। মানুষ শুধু একটি জীবন্ত দেহ নয়; সে বিবেকসম্পন্ন, চিন্তাশীল, দায়িত্ববান এক অনন্য সৃষ্টি। কিন্তু এই সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি হওয়া মানুষ যদি তার সৃষ্টিকর্তাকে না চেনে, নিজের সৃষ্টির উদ্দেশ্য না বোঝে কিংবা জেনে-বুঝেও আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত থাকে—তাহলে তার পরিণতি কী হবে? কোরআন মাজিদ এই প্রশ্নের উত্তর খুব স্পষ্টভাবে দিয়েছে। সুরা ত্বীনে আল্লাহ ঘোষণা করেন, মানুষকে সর্বোত্তম কাঠামোয় সৃষ্টি করার পরও যদি সে ইমান ও সৎকর্ম থেকে বিচ্যুত হয়, তবে তাকে হীনদের হীনতম পরিণতির দিকে নিক্ষেপ করা হবে। তবে যারা ইমান আনে এবং সৎকর্মে অবিচল থাকে, তাদের জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।

এই আয়াত আমাদের সামনে একটি গভীর বাস্তবতা উন্মোচন করে। পশু-পাখির জীবন সীমিত—তাদের জন্ম আছে, প্রয়োজন পূরণ আছে, মৃত্যু আছে; কিন্তু কোনো হিসাব নেই, কোনো জবাবদিহি নেই। অথচ মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার জীবন শেষ হয়ে যায় না; বরং শুরু হয় আরেক অধ্যায়—হিসাবের অধ্যায়। তাকে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি কাজের জবাব দিতে হবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার, মন্দ কাজের জন্য শাস্তি—এটাই আখেরাতের অমোঘ বিধান। তাই যদি কোনো মানুষ আখেরাতে শাস্তির যোগ্য হয়, তবে তার অবস্থা পশু-পাখির চেয়েও নিকৃষ্ট হবে। কারণ পশুদের কোনো দায়িত্ব ছিল না, কোনো বিবেক ছিল না; কিন্তু মানুষকে আল্লাহ দিয়েছেন জ্ঞান, বিবেচনা, চিন্তাশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। দায়িত্ব বেশি হলে জবাবদিহিও বেশি।

কোরআন মাজিদ বারবার মানুষকে তার সূচনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন, তিনি মানুষকে মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন এমন অবস্থায়, যখন সে কিছুই জানত না। একটি নবজাতক শিশু—সে অসহায়, অক্ষম, নির্বাক। সে কাউকে চেনে না, কিছু বোঝে না, নিজের প্রয়োজনও নিজে পূরণ করতে পারে না। ধীরে ধীরে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে বিকশিত হয় শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, চিন্তাশক্তি ও হৃদয়ের অনুভব। সে কথা বলতে শেখে, হাঁটতে শেখে, চিনতে শেখে, বুঝতে শেখে। এই বিকাশ কি আপনা-আপনি ঘটে? না—এসবই আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনার অংশ।

এই বাস্তবতা আমরা সবাই দেখি। আমরা শিশুদের বড় হতে দেখি, নিজেদের শৈশবের কথা স্মরণ করি। কিন্তু যে বিষয়টি আমরা প্রায়ই অনুধাবন করি না, তা হলো—এই গুণ ও যোগ্যতার উৎস কে? কে মানুষকে এত ক্ষমতা দান করলেন? কোরআন এই প্রশ্নেরও উত্তর দেয়—সবকিছুর পেছনে রয়েছেন একমাত্র আল্লাহ। তিনি শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেননি; বরং মানুষকে শুনবার শক্তি, দেখার শক্তি ও অন্তরের বোধ দান করেছেন, যেন মানুষ শোকর আদায় করে। আল্লাহ বলেন এবং আল্লাহ তোমাদের বের করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং অন্তঃকরণ, যাতে তোমরা শোকরগুযারি করো। (সুরা নাহল: ৭৮)

‘যাতে তোমরা শোকরগুযারি করো’—এই একটি বাক্যের মধ্যেই মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য নিহিত। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে শোকর আদায়ের জন্য, কৃতজ্ঞতার জন্য, আল্লাহর আনুগত্যের জন্য। কোরআন আমাদের পরিচয় স্পষ্ট করে দেয়—আমরা আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহর বান্দা। আর আমাদের দায়িত্ব হলো তাঁর দেওয়া নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা ও সমাজ-ব্যবস্থা এই মৌলিক সত্যটি আমাদের যথাযথভাবে শেখায় না। আমাদের অনেক কিছু শেখানো হয়—জীবিকা, প্রযুক্তি, দক্ষতা, প্রতিযোগিতা—কিন্তু শেখানো হয় না জীবনের আসল পরিচয় ও উদ্দেশ্য। বলা হয় না, “তুমি কে?” বলা হয় না, ‘কেন তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে?’ বলা হয় না, ‘তোমার চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায়?’ ফলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় ভুলে যায়।

একজন মুসলিমের পরিচয় কেবল নাম বা জন্মসূত্রে নয়। তার পরিচয় হলো—সে আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছে, ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তার জীবনের উদ্দেশ্য হলো—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী চলা। তার লক্ষ্য হলো—জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাত লাভ করা এবং দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে সফল হওয়া।

মানুষের জীবন কোনো উদ্দেশ্যহীন যাত্রা নয়। মানুষ পশু-পাখির মতো শুধু খাওয়া-দাওয়া, ভোগ-বিলাস ও চাহিদা পূরণের জন্য সৃষ্টি হয়নি। পশুর জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের জীবন মৃত্যুর পরও চলমান থাকে। মানুষ আল্লাহর খলীফা—পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত। তাকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে হবে, অন্যদেরও সেই পথে আহ্বান জানাতে হবে।

কিন্তু আধুনিক বিশ্বের প্রভাবে, বিশেষত পাশ্চাত্য চিন্তার প্রভাবে, এই উপলব্ধি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। মানুষকে শেখানো হচ্ছে—এই দুনিয়াই সব, এই জীবনই শেষ। খাও, দাও, উপভোগ করো—এর বাইরে কোনো জবাবদিহি নেই। এই দর্শন মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক, ভোগবাদী ও দায়িত্বহীন করে তোলে। অথচ ইসলাম মানুষকে শেখায় দায়িত্ববোধ, আত্মসংযম ও উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবন।

আমরা কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি এবং কোথায় যাব—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর কোরআন সুস্পষ্টভাবে দিয়েছে। আমরা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি, আল্লাহর ইবাদত ও শোকরের জন্য এসেছি, এবং আল্লাহর কাছেই ফিরে যাব। এই সত্য যদি মানুষ উপলব্ধি করে, তবে তার জীবন অর্থবহ হবে, উদ্দেশ্যপূর্ণ হবে এবং সে দুনিয়া ও আখেরাত—উভয় জগতে সফলতা অর্জন করতে পারবে।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]