ইরানে ইজরায়েলি হানায় ছিন্নভিন্ন শিশুদের প্রিয়তম মিউজিক স্কুল

আপলোড সময় : ০৩-০৪-২০২৬ ০৩:০১:২৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৩-০৪-২০২৬ ০৩:০১:২৯ অপরাহ্ন
যুদ্ধ শুধু সীমান্তে নয়, তা ধ্বংস করে দেয় মানুষের স্বপ্ন, সংস্কৃতি আর ভবিষ্যৎও। ইরানে সাম্প্রতিক বিমান হামলায় এমনই এক হৃদয়বিদারক ছবি সামনে এল। শিশুদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠা একটি মিউজিক স্কুল মুহূর্তে পরিণত হল ধ্বংসস্তূপে।

তেহরানের পূর্ব অংশে রয়েছে ‘হোনিয়াক মিউজিক অ্যাকাডেমি’। রয়েছে নয়, ছিল। সেখানেই প্রতিদিন বেজে উঠত পারস্যের সেতার, সন্তুরের সুর। সেই স্কুল এখন শুধুই ধুলো আর ভাঙা ইটের স্তূপ। দু’বছর আগে সংগীতশিল্পী হামিদরেজা আফারিদেহ ও তাঁর স্ত্রী শেইদা এবাদাতদৌস্ত নিজেদের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন প্রায় ২৫০ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে। তাদের মধ্যে ছোট্ট শিশু থেকে প্রবীণ মানুষও ছিলেন, যাঁরা এই স্কুলে নিয়মিত আসতেন, আনন্দগান গাইতেন।

গত ২৩ মার্চ, একটি বিমান হামলায় এই মিউজিক স্কুল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ওই একই বিল্ডিংয়ে একটি মেটার্নিটি ক্লিনিক-সহ একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও ছিল। স্কুলটি একটি সামরিক ঘাঁটির খুব কাছেই ছিল বলে জানা গেছে।

হামলার সময় সৌভাগ্যবশত স্কুলে কেউ উপস্থিত ছিলেন না। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আগেই স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাতে ক্ষতির পরিমাণ কমেনি। আফারিদেহর কথায়, “১৫ বছরের পরিশ্রমে যা গড়েছিলাম, এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেল।”

ঘটনার দিন সকালে হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে ওঠে স্কুলে। প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন চুরি হতে পারে। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তাঁরা দেখেন আকাশ জুড়ে ঘন ধোঁয়া। এতটাই ধোঁয়া ছিল যে সামনে এগোনোই কঠিন হয়ে যায়।

পরবর্তীতে উদ্ধারকাজ শেষ হলে তাঁরা যখন ভিতরে ঢোকেন, তখন যা দেখেন তা বর্ণনার অতীত। চারতলার স্টুডিওর জানলা উড়ে গেছে, দেওয়াল ভেঙে পড়েছে, আর ভিতরে থাকা সমস্ত বাদ্যযন্ত্র, সাউন্ড সিস্টেম, টিভি— সবকিছুই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

ভাঙা গিটার, ছিন্ন লিউট এসব যেন নিজেদের প্রাণ দিয়ে প্রমাণ দিচ্ছিল যে, এখানে একসময় সুরের আসর বসত। আফারিদেহর কথায়, “বিস্ফোরণের অভিঘাত এতটাই প্রবল ছিল, যেন কখনও ছিল না এখানে।”

এই মিউজিক স্কুল শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না, বহু ছাত্রছাত্রীর কাছে এটি ছিল দ্বিতীয় বাড়ি। এখানে তারা শুধু গান শিখত না, পেত নিরাপত্তা, স্বস্তি এবং এক ধরনের পারিবারিক পরিবেশ।

এখন সেই জায়গা নেই। বহু ছাত্রছাত্রী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। একইসঙ্গে প্রায় ২০-২৫ জন শিক্ষক ও কর্মচারীও কাজ হারিয়েছেন। যা যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিতে আরও বড় সংকট তৈরি করেছে।

ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, ওই এলাকায় একটি সামরিক গোয়েন্দা ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। তবে এই ঘটনায় স্পষ্ট, যুদ্ধের অভিঘাত শুধু সামরিক স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না—সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎও তার বলি হচ্ছে।

এই মুহূর্তে আফারিদেহ দম্পতি ভাবছেন, কীভাবে আবার নতুন করে শুরু করবেন। ভাঙা বাড়িতে তো আর স্কুল চালানো সম্ভব নয়। নতুন জায়গা, নতুন করে বিনিয়োগ— সব মিলিয়ে সামনে ঘোর অনিশ্চয়তা।

ইতিমধ্যেই প্রায় ৪২ হাজার ডলারের ক্ষতির হিসেব করছেন তাঁরা, যা ইরানের আর্থিক প্রেক্ষাপটে বিশাল অঙ্ক। এখন তাঁরা সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক এবং বিভিন্ন সঙ্গীত সংস্থার কাছে সাহায্যের আবেদন করছেন।

যুদ্ধের পরিসংখ্যান শুধু মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। এই ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে থাকে মানুষের স্বপ্ন, সংস্কৃতি আর আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। তেহরানের এই মিউজিক স্কুল তারই এক মর্মান্তিক উদাহরণ।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]