বরেন্দ্রে অঞ্চলে খরার প্রভাব কমছে ফলন, বাড়ছে পানির সংকট

আপলোড সময় : ৩০-০৩-২০২৬ ০৯:১১:৩৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ৩০-০৩-২০২৬ ০৯:১১:৩৯ অপরাহ্ন
রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়ছে খরা।করার কারণে কমছে জমির ফলন উৎপাদন।এতে চাষের জন্য কৃষকের ব্যয়ও বেড়েছে। একইসঙ্গে  বাড়ছে পানি সংকটও। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
 
জানা গেছে,২০২৬ সালের ৬ মার্চ ‘এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ইন্ডিকেটরস’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া এবং ফসল হ্রাসকে সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষকদের স্বল্পমেয়াদি কৌশল অবলম্বনে বাধ্য করছে এবং যা দীর্ঘমেয়াদি কৃষি টেকসইতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিগত ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শেরে-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত এই গবেষণায় আলোচনা এবং তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এতে রাজশাহীর তানোর উপজেলা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার ৩৫১ জন কৃষকের উপর জরিপ চালানো হয়।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, খরার কারণে কিছু এলাকায় ধানের উৎপাদন প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং গমের উৎপাদন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কৃষকদের মতে, বাস্তবে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। তানোরে প্রতি বিঘায় ধানের ফলন ২২-২৪ মণ থেকে কমে ১৪-১৬ মণে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, কিছু এলাকায় গমের উৎপাদন অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।

সমীক্ষায় বলা হয়েছে, তীব্র খরার বছরগুলোতে আয়ের ক্ষতি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যার ফলে অনেক কৃষক অন্য পেশায় চলে যেতে পারেন। তারা গ্রাম ছেড়ে শহরেও বসবাস শুরু করতে পারেন। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সংকট মোকাবেলার প্রধান কৌশল হিসেবে রয়ে গেছে। এ অঞ্চলের ৯০ শতাংশেরও বেশি কৃষক গভীর ও অগভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল। কৃষকদের নির্ভরতা ভূগর্ভস্থ জলের স্তর দ্রুত হ্রাস করছে।

তানোরের পাঁচন্দর ইউনিয়নের (ইউপি) দুবইল গ্রামের কৃষক জাহিদুর রহমান বলেন, আমরা এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ২৫ মণ ধান পেতাম। এখন খরা ও পানির অভাবে তা কমে মাত্র ১৪ মণে নেমে এসেছে। সেচের খরচ এবং পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় চাষাবাদ অলাভজনক হয়ে পড়ছে।

তানোর উপজেলার কৃষক নূর ইসলাম বলেন, দশ বছর আগে আমরা ৮০-৮৫ ফুট গভীরে পানি পেতাম। এখন তা ১৩০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। অনেক গভীর নলকূপ ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। আর্থিক চাপ সামলাতে কৃষকরা উৎপাদনশীল সম্পদ বিক্রি করছেন। 

সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা গবাদি পশু বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করেছেন। এবং ৬০ শতাংশের বেশি খরা মৌসুমে ঋণ নিয়েছেন।

চাপাইনবয়াবগঞ্জের নাচোল উপজেলার জুমেইরপাড়া গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, খরার সময় চাষের খরচ মেটাতে গবাদি পশু বিক্রি করে দেন কৃষকরা। এছাড়াও এনজিও বা অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে প্রায়শই উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। আয় কমে যাওয়ায় খাদ্য গ্রহণের ধরনও প্রভাবিত হচ্ছে। অনেক পরিবার মাংসের মতো দামি জিনিস খাওয়া কমিয়ে দিচ্ছে এবং খাদ্যের উপর বেশি নির্ভর করছে। ডিম, মাছ এবং শাকসবজির মতো সস্তা বিকল্পের ব্যবহার বাড়ছে। 
সমীক্ষাটি পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অসমতাকেও তুলে ধরেছে। বলা হয়েছে, পুকুর মাছ চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। খরার সময় ক্ষুদ্র কৃষকরা প্রায়শই এই পানি ব্যবহার করতে পারেন না। ধনী কৃষকরা এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করেন। যদিও কৃষকরা শস্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং রোপণের সময়সূচিতে পরিবর্তনের মাধ্যমে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন। টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার অনুশীলন সীমিতই রয়ে গেছে। প্রায় ৭৭ শতাংশ কৃষক পুকুর বা জলাধারে পানি সংরক্ষণ করেন না। এবং ৮৭ শতাংশ কৃষক কখনও আন্তঃফসল চাষ করেননি।

গবেষকগণ এর কারণ হিসেবে সচেতনতার অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাকে দায়ী করেছেন। সংকট সত্ত্বেও বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং পুনর্ব্যবহারের অনুশীলনও খুব কমই করা হয়। 

সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কৃষকদের টিকে থাকার ক্ষমতা আয় বা শিক্ষার চেয়ে সম্প্রসারণ পরিষেবা প্রাপ্তি এবং খরার তীব্রতা সম্পর্কে তাদের ধারণার উপর বেশি নির্ভর করে। কৃষকরা কৃষি সম্প্রসারণ এবং অপর্যাপ্ত সহায়তার অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং ব্যক্তিগত পাম্পের উপর নির্ভরতার কারণে সেচের খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে, ভূপৃষ্ঠের জলের প্রাপ্যতা সীমিত রয়েছে।

গবেষকগণ ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়িয়ে, স্বল্প খরচের সেচ প্রযুক্তির প্রচার, স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান এবং সম্প্রসারণ ও জলবায়ু পরামর্শ পরিষেবা শক্তিশালী করে ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরতা কমানোর সুপারিশ করেছেন। সমন্বিত হস্তক্ষেপ ছাড়া খরা এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদনশীলতা এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে ক্রমাগত ক্ষুণ্ন করতে থাকবে।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]