মাইগ্রেন শুধু মাথাব্যথা নয়, মহিলাদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে

আপলোড সময় : ০৮-০৩-২০২৬ ০৩:৩৪:৩৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৮-০৩-২০২৬ ০৩:৩৪:৩৩ অপরাহ্ন
মাইগ্রেন -কে অনেকেই এখনও “স্রেফ মাথাব্যথা” বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি গুরুতর স্নায়বিক সমস্যা, যা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যার প্রভাব অনেক বেশি।

মাইগ্রেনের সময় শুধু তীব্র মাথাব্যথাই হয় না। তার সঙ্গে দেখা দিতে পারে বমিভাব, আলো ও শব্দের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা, চোখের সামনে অদ্ভুত আলো বা দাগ দেখা, এবং চরম ক্লান্তি। এই উপসর্গগুলি অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, মাইগ্রেন পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ স্নায়বিক রোগগুলির অন্যতম। এবং পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষদের তুলনায় মহিলারা প্রায় তিন গুণ বেশি এই সমস্যায় ভোগেন। গবেষকরা মনে করেন, এর পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে শরীরে হরমোনের ওঠানামার। বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন হরমোনের পরিবর্তন মাইগ্রেনের প্রকোপ বাড়াতে পারে। পিরিয়ড, গর্ভাবস্থা কিংবা মেনোপজ - মহিলাদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তন মাইগ্রেনের ধরন এবং আক্রমণের তীব্রতা বদলে দিতে পারে।

কিছু ধরনের মাইগ্রেন আবার আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গেও জড়িত। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব মহিলার ‘মাইগ্রেন উইথ অরা’ হয় - অর্থাৎ মাথাব্যথা শুরু হওয়ার আগে চোখে অদ্ভুত আলো দেখা বা শরীরে ঝিনঝিন ভাব হয়, তাদের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইগ্রেনকে শুধু ব্যথার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি অনেক সময় হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালীর স্বাস্থ্য সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিতে পারে।

মহিলাদের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের ঝুঁকি ও ঘনঘন মাথাব্যথা হওয়ার পেছনে হরমোন বড় ভূমিকা নেয়।

বিজয়ওয়াড়ার মণিপাল হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট মুরলি চেকুরি জানিয়েছেন, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তন মাইগ্রেনের ধরনকে প্রভাবিত করে। তার কথায়, “মাইগ্রেনকে অনেক সময় ‘সাধারণ মাথাব্যথা’ বলে ভাবা হয়। কিন্তু বহু মহিলাদের ক্ষেত্রে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী স্নায়বিক সমস্যা, যা প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। গবেষণা বলছে, পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে প্রায় তিন গুণ বেশি মাইগ্রেন দেখা যায়।”

এই পার্থক্যের পিছনে অন্যতম কারণ হল ইস্ট্রোজেন হরমোন। ডা. চেকুরি ব্যাখ্যা করছেন, ইস্ট্রোজেনের ওঠানামা অনেক সময় মাইগ্রেন ডেকে আনতে পারে। অনেক মহিলার ক্ষেত্রে পিরিয়ড শুরুর ঠিক আগে হঠাৎ করে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়, যার ফলে মাইগ্রেন দেখা দেয়।

গবেষণা বলছে, মাইগ্রেনে আক্রান্ত প্রায় ৬০ শতাংশ মহিলা জানিয়েছেন যে তাঁদের মাথাব্যথা পিরিয়ডের সাইকেলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একে সাধারণত 'মেনস্ট্রুয়াল মাইগ্রেন' বলা হয়।

গর্ভাবস্থার সময়ও মাইগ্রেনের ধরনে পরিবর্তন দেখা যায়। ডা. চেকুরির মতে, গর্ভাবস্থায় অনেক সময় হরমোনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে, ফলে কিছু মহিলার ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের সমস্যা কমে যেতে পারে। তবে আবার অনেকের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক মাসে, মাইগ্রেনের আক্রমণ চলতেই থাকে।

অন্যদিকে মেনোপজের আগে যে সময়টি থাকে, যাকে পেরিমেনোপজ বলা হয়, সেই সময়ে হরমোনের দ্রুত ওঠানামার কারণে মাইগ্রেন সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। তবে মেনোপজের পর অনেক ক্ষেত্রেই তা কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে যায়।

সব ধরনের মাইগ্রেন এক রকম নয়। এর একটি বিশেষ ধরন হল 'মাইগ্রেন উইথ অরা'। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাইগ্রেনে আক্রান্ত প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষের এই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। এই ধরনের মাইগ্রেনের আগে কিছু বিশেষ লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন—

চোখের সামনে ঝলমলে আলো বা জিগজ্যাগ রেখা দেখা
সাময়িকভাবে চোখে অন্ধকার বা ব্লাইন্ড স্পট তৈরি হওয়া
মুখ বা হাতে ঝিনঝিন ভাব
কথা বলতে অসুবিধা
এই উপসর্গগুলি সাধারণত মাথাব্যথা শুরু হওয়ার ২০ থেকে ৬০ মিনিট আগে দেখা দেয়।

নিউরোলজিস্টদের মতে, এই ধরনের মাইগ্রেন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি অনেক সময় রক্তনালীর কিছু সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।

বিভিন্ন বড় গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মাইগ্রেন উইথ অরা থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কিছুটা বেশি হতে পারে, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে। ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত একটি বড় মেটা-অ্যানালিসিসে দেখা যায়, যাদের মাইগ্রেন উইথ অরা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ইস্কেমিক স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে, তুলনায় যাদের মাইগ্রেন নেই।

ডা. চেকুরি অবশ্য বলছেন, অল্পবয়সি মহিলাদের ক্ষেত্রে সামগ্রিক ঝুঁকি এখনও তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে এই ঝুঁকি বাড়তে পারে। তার কথায়, “মাইগ্রেন উইথ অরা থাকলে মাথাব্যথার আগে চোখে আলো দেখা, ঝলকানি বা শরীরে ঝিনঝিন ভাব হয়। এই ধরনের মাইগ্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এর সঙ্গে অন্য স্বাস্থ্যসমস্যা যুক্ত থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইগ্রেন একাই সাধারণত স্ট্রোকের কারণ হয় না। তবে অন্যান্য ঝুঁকির কারণের সঙ্গে মিললে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে।

ডা. চেকুরি জানাচ্ছেন, যেসব মহিলার মাইগ্রেন, বিশেষ করে মাইগ্রেন উইথ অরা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নিচের সমস্যাগুলি থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে—

উচ্চ রক্তচাপ
ওবেসিটি
ধূমপান
হাই কোলেস্টেরল
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
কিছু ক্ষেত্রে হরমোনাল গর্ভনিরোধক ওষুধও ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব মহিলা ধূমপান করেন বা যাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এই কারণেই চিকিৎসকেরা অনেক সময় হরমোনাল জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ দেওয়ার আগে রোগীর মাইগ্রেনের ইতিহাস ভালভাবে পরীক্ষা করেন।

মাঝেমধ্যে মাইগ্রেন হওয়া অনেক সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু উপসর্গ বারবার বা খুব তীব্র হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডা. চেকুরির মতে, শুধু সাধারণ ব্যথার ওষুধ খেয়ে সমস্যাকে চাপা রাখার বদলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। কারণ সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় হলে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা যেসব লক্ষণকে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখেন, সেগুলি হল—

হঠাৎ করে মাইগ্রেনের ধরন বদলে যাওয়া
মাথাব্যথার সঙ্গে স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেওয়া
সময়ের সঙ্গে মাথাব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকা
মাইগ্রেনের সঙ্গে শরীরের দুর্বলতা বা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া
কীভাবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব?

নিউরোলজিস্টদের মতে, কিছু জীবনযাত্রাগত পরিবর্তন মাইগ্রেনের আক্রমণ কমাতে এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। ডা. চেকুরি বলছেন, “নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, সুস্থ ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং ধূমপান ছেড়ে দেওয়া - এই পদক্ষেপগুলি অনেক জটিলতা কমাতে পারে।”

এর পাশাপাশি আরও কিছু অভ্যাস সাহায্য করতে পারে—

নিয়মিত ঘুমের রুটিন বজায় রাখা
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা
পর্যাপ্ত জল খাওয়া
নিজের মাইগ্রেনের ট্রিগার চিহ্নিত করা এবং এড়িয়ে চলা
প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিরোধমূলক ওষুধ গ্রহণ করা
ডা. চেকুরির কথায়, “হরমোনের পরিবর্তন কীভাবে মাইগ্রেনকে প্রভাবিত করে এবং মাইগ্রেন কীভাবে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে - এ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।”

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]