সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৪:১১ অপরাহ্ন

শ্রম আইনের সংশোধনী বিল পাস

শ্রম আইনের সংশোধনী বিল পাস

গতকাল বুধবার রাতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী মুজিবুল হজ চুন্নু জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়ার সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলটির ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন বিরোধী দলীয় সদস্যরা। অবশ্য তাদের প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য ২০০৬ সালে প্রথম বাংলাদেশে শ্রম আইন করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে আইনটির ব্যপক উদ্যোগের মাধ্যমে ৯০টি ধারা সংশোধন করা হয়েছিল। বর্তমান শ্রম আইনে ৩৫৪টি ধারা রয়েছে। সংশোধিত বিলে নতুন দুটি ধারা, চারটি উপধারা ও আটটি দফা সংযোজন, ছয়টি উপধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। সংশোধিত শ্রম বিলে মালিক ও শ্রমিকদের অসদাচরণ বা বিধান লঙ্ঘনের জন্য শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড করা হয়েছে। আগে শাস্তি ছিল ২ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড।

বিলে বলা হয়েছে, বল প্রয়োগ, হুমকি প্রদর্শন, কোনো স্থানে আটক বা উচ্ছেদ শারীরিক আঘাত এবং পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অথবা অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করে মালিককে নিষ্পত্তিনামায় দস্তখত করতে বা কোনো দাবি গ্রহণ বা মেনে নিতে বাধ্য করতে চেষ্টা করতে পারবেন না শ্রমিকরা। করলে এটা অসদাচরণ হবে।

অন্যদিকে কোনো মালিক শ্রমিকের চাকরির চুক্তিতে ট্রেড ইউনিয়নে যোগদান নিষেধাজ্ঞা, কোনো ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য পদ চালু রাখার অধিকারের ওপর কোনো বাধা সম্বলিত কোনো শর্ত আরোপ করতে পারবেন না। মালিক এই বিধান লঙ্ঘন করলে শাস্তি পাবেন। বেআইনি ধর্মঘট ডাকার দণ্ড আগে এক বছর ছিল, এখন ৬ মাস করা হয়েছে। জরিমানা আগের মতোই ৫ হাজার টাকা রয়েছে। কোনো ব্যক্তি একই সময়ে একাধিক ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হলে তিনি আগে ৬ মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতেন। এখন সেটা কমিয়ে এক মাস করা হয়েছে।

সংশোধিত আইনে ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের সমর্থনের হার কমানো হয়েছে। বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে হলে মোট শ্রমিকের ৩০ শতাংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়। এখন সেটা কমে হচ্ছে ২০ শতাংশ। ধর্মঘট ডাকার ক্ষেত্রে আগে দুই তৃতীয়াংশ শ্রমিকের সমর্থন লাগত, নতুন আইন অনুযায়ী সেটা ৫১ শতাংশ করা হয়েছে।

আইনে বলা হয়েছে, কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শ্রমিকদের তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় উৎসবের প্রাক্কালে বিধির মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতিতে উৎসব ভাতা দিতে হবে। আগের আইনে থাকা প্রধান পরিদর্শকের পদটি মহাপরিদর্শকসহ আরও কিছু পদের নামে পরিবর্তন ও নতুন কিছু পদ যুক্ত করা হয়েছে। আর বিদ্যমান আইনের শর্ত সাপেক্ষে শিশু শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করার বিধান পরিবর্তন করে অপ্রাপ্ত বয়স্ক শব্দটি শ্রম আইন থেকে বাদ দিয়ে সেখানে কিশোর শব্দটি যোগ করা হয়েছে। আগে ১২ বছর বয়সী শিশুরা কারখানায় হালকা কাজের সুযোগ পেত। সংশোধিত আইন অনুযায়ী ১৪-১৮ বছর বয়সী কিশোররা হালকা কাজ করতে পারবে। কোনো ব্যক্তি কোনো শিশু বা কিশোরকে চাকরিতে নিযুক্ত করলে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

বিদ্যমান আইনে শ্রমিকদের জন্য বিশ্রাম কক্ষ রাখার বিধান ছিল। এখন খাবার কক্ষও যুক্ত হয়েছে। ২৫ জনের বেশি শ্রমিক নিযুক্ত থাকেন এমন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা যাতে সঙ্গে আনা খাবার খেতে ও বিশ্রাম করতে পারেন সেজন্য উপযুক্ত খাবার কক্ষ ও বিশ্রাম রুম রাখতে হবে।

কোন নারী শ্রমিক মালিককে নোটিশ দেওয়ার আগেই যদি সন্তান প্রসব করে থাকেন। তবে সন্তান প্রসবের প্রমাণ পেশ করার পরবর্তী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধাসহ প্রসব পরবর্তী ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকার অনুমতি দেবেন মালিক। মাতৃত্বকালীন ছুটির বিকল্প হিসেবে এই বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কোনো মালিক কোনো নারী শ্রমিককে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করলে তিনি ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আগে এ ধরনের কোনো শাস্তি ছিল না। তবে শর্ত থাকে যে, কোনো নারী শ্রমিক প্রসূতিকালীন ছুটিতে যাওয়ার নির্ধারিত তারিখের আগে গর্ভপাত ঘটলে তিনি কোনো প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা পাবেন না। তবে স্বাস্থ্যগত কারণে ছুটির প্রয়োজন হলে তা পাবেন।

পাস হওয়া বিল অনুযায়ী, শ্রমিকরা ইচ্ছা প্রকাশ করলে কম্বাইন্ড বার্গেইন এজেন্ট (সিবিএ) বা অংশগ্রহণকারী কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করে, উৎসব ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটির যোগ করে তা ভোগ করতে পারবে। কোনো শ্রমিকের কাজের সময় এমনভাবে ব্যবস্থা করতে হবে যাতে আহার ও বিশ্রামের বিরতি ছাড়া ১০ ঘণ্টার বেশি না হয়। আর কোনো শ্রমিককে উৎসব ছুটির দিনে কাজ করতে বলা যাবে না, তবে এজন্য তাকে একদিনের বিকল্প ছুটি এবং দুদিনের ক্ষতিপূরণমূলক মজুরি দিলে শ্রমিকের ইচ্ছা অনুযায়ী (উৎসবের ক্ষেত্রে) কাজে যোগ দিতে পারবেন।

এ ছাড়া ট্রেড ইউনিয়নে রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে একটি পরিবর্তন আনা হয়েছে নতুন আইনে। রেজিস্ট্রেশনের দরখাস্ত পাওয়ার ৫৫ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। আগে এই সময় ছিল ৬০ দিন। তবে আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে ৩০ দিনের মধ্যে শ্রম আদালতে আপীল করতে পারবেন আবেদনকারী।

পাস হওয়া বলা হয়েছে, শ্রম আদালতগুলো মামলা দায়েরের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে রায় দিয়ে দেবে। ৯০ দিনের মধ্যে কোনভাবে দেয়া সম্ভব না হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অবশ্যই রায় দিতে হবে। অর্থাৎ ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা শেষ করতে হবে। শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালকেও ৯০ দিন করে দুই দফায় ১৮০ দিনে মধ্যে অবশ্যই আপীল শেষ করতে হবে।

আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী সংশোধিত বিলে মালিক, শ্রমিক ও সরকার মিলে একটি ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ গঠন করতে পারবে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, শ্রমিকরা কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে এক লাখ টাকার বদলে দুই লাখ টাকা এবং স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে সোয়া এক লাখ টাকা পরিবর্তে আড়াই লাখ টাকা পাবেন। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী শ্রমিক সংগঠনগুলো বিদেশ থেকে চাঁদা গ্রহণ করলে সরকারকে জানাতে হবে। সূত্র:কালের কণ্ঠ।

জাতীয় সংসদে বিলটি আনার উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে বর্তমান সরকারের পূর্ব মেয়াদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির আলোকে ২০১৩ সালের ২২ জুলাই ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’ সংশোধন করা হয়। বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে সুষ্ঠু শিল্প সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে কর্মস্থলে পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিতকরণ, পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি সুরক্ষা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়া সহজীকরণ, শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্দেশে পূরণের লক্ষ্যে উক্ত আইন পুনরায় সংশোধন করার প্রয়োজন হচ্ছে।

রাজশাহীর সময় ডট কম২৫ অক্টোবর ২০১৮





© All rights reserved © 2018 rajshahirsomoy.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com