মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:০৮ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
এই নির্বাচন বাংলাদেশকে রক্ষা করার নির্বাচন রাবিতে মিনু বিএনপি প্রার্থী মঈন খানের নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা চালিয়েছে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ টুঙ্গীপাড়া থেকে বৃহস্পতিবার ফেরার পথে ৭টি পথসভা করবেন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের গাড়িবহরে হামলা নির্বাচনে সহিংসতা থেকে সবাইকে দূরে থাকার আহ্বান : মার্কিন রাষ্ট্রদূত জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত : বগি লাইনে তোলার চেষ্টা আইএসপিআরের নতুন পরিচালক আবদুল্লা ইবনে জায়েদ রাজশাহী নগরীতে বিএনপি’র অফিসে ভাঙচুর, নৌকায় অগ্নিসংযোগ নওগাঁ-৬ (রাণীনগর-আত্রাই) আসনে ভোটে লড়ছেন ৩ প্রার্থী গোলাম মাওলা রনির ফেসবুক আইডি হ্যাক : থানায় জিডি
তারপরও বন্ধ হয়নি রাজশাহী নগরীতে বাণিজ্য মেলার নামে জুয়ার খেলা

তারপরও বন্ধ হয়নি রাজশাহী নগরীতে বাণিজ্য মেলার নামে জুয়ার খেলা

ব্যান্ডের কোন কোম্পানীর দোকান বা বিদেশী কোন দোকান নাই এ মেলায়। মেলা মাঠে দোকানে বিক্রি হচ্ছে তা ফুটপাতের দোকান গুলোতেও কিনতে পাওয়া যায়। মেলার মূল বাণিজ্য হলো লটারী বিক্রি আর জুয়া। যে বাণিজ্য মেলা চলছে শিক্ষা নগরী রাজশাহীতে তা নগরীর দূর্ণাম আর সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রত্যেক বছর জানুয়ারী মাসে রাজধানী ঢাকার শেরে বাংলা নগরে অনুষ্ঠিত হয় মাসব্যাপি বাণিজ্য মেলা। ওই মেলায় বিশ্বের একাধিক উন্নত দেশগুলো থেকে দোকান বরাদ্দ নিয়ে ব্যবসা উদ্দেশ্যে আসেন। এছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ নামি-দামি কোম্পানিগুলো বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাণিজ্য মেলায় কেনা-কাটা করার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে বাণিজ্য মেলা প্রাঙ্গণে। আর সেখানে যে সকল সামগ্রী বিক্রি হয়, তা দেখে মানুষ মুগ্ধ হয়। কারণ সেগুলো সাধারণত বাণিজ্য মেলাতেই মেলে।

রাজশাহী নগরীর সচেতন নাগরীকরা বলছেন, আয়োজকদের মেলা উদ্বোধন করার আগে জানতে হবে কি ধরনের দোকানপাট হবে মেলা প্রাঙ্গণে। মা-বোনদের পরিবার নিয়ে সেখানে চলাফেরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিক্রিত সামগ্রীর মধ্যে ব্যতিক্রম পণ্যের সমাহার মেলায় থাকবে কিনা ? আর তা যদি কোন কিছুই না থাকে তাহলে কিসের মেলা ? সরাসরি জুয়া মেলা নাম দিয়ে চালু করলেই তো হয়। ঢাকার বাণিজ্য মেলা কেউ দেখে আসার পরে রাজশাহীর বানিজ্য মেলা দেখা, তাহলে তো সে লজ্জা পাবে।  রাজশাহী শিক্ষা নগরী, বিভাগীয় শহর,  এটা কোন গ্রাম গঞ্জ নহে যে, এই নগরীতে এ ধরনের মেলা চালু করতে হবে। আর মেলা মানেই চালাতে হবে লটারী আর জুয়ার আসর, কিছু মানুষকে খুশি করার জন্য চালু করা এ জুয়ার মেলা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহাল।

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের উদ্যোগে গত ৩ নভেম্বর এই বাণিজ্য মেলা শুরু হয়। প্রতি বছরই রাজশাহীতে এই মেলাটি হয়ে আসছে। এর আগে রাজশাহী কালেক্টরেট মাঠে হতো। এবারোই প্রথম বর্ণালীর মাঠে হচ্ছে। কিন্তু রাত নামলেই এই মেলা প্রাঙ্গনটি যেন জুয়ার আসরে পরিণত হয়। লটারির নামে র‌্যাফেল ড্র বা জুয়ার আসর বসছে প্রতি রাতেই। এই লটারি বিক্রি হচ্ছে মাইকিং করে। গ্রাম-গঞ্জে বা পাড়া-মহল্লায়। কিন্তু গণমাধ্যমের ভয়ে শহরের ভিতরে শুধু টেবিল পেতে বিক্রি করা হচ্ছে লটারির টিকিট। এ নিয়ে রাজশাহীর সচেতন মহলের মাঝে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। লটারির নামে জুয়া বন্ধেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

মেলা আয়োজক কমিটির একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাঝে গত দুই বছর বাণিজ্য মেলায় এই জুয়ার আসর বসেনি বাণিজ্য মেলায়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে খবর প্রকাশ হওয়ার পর প্রতিবারই জুয়ার আসর বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে মাঝে গত দুই বছর আর লটারির নামে র‌্যাফেল ড্র বা জুয়ার আসর বসাতে সাহস পাইনি তারা। কিন্তু এবার একই কায়দায় আবার জুয়ার আসর চলছে বেশ জোরে-সরে। গত কয়েকদিন ধরে ব্যাপক হারে লটারির টিকিট বিক্রি করে রাতে সেগুলো র‌্যাফেল ড্রয়ের নামে জুয়ার আসর বসানো হচ্ছে।

বিনিময়ে দুই-একটি বড় ধরনের পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। এই আকর্ষণীয় পুরস্কারের লোভে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ২০ টাকা মুল্যের লাটরির টিকিট সংগ্রহ করছে। যার ফলে প্রতারিত হচ্ছে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ। একেক জন ১০০-২০০ পর্যন্ত টিকিট সংগ্রহ করছেন। কিন্তু দিন শেষে কিছুই মিলছে না কপালে। এতে করে অনেকেই আর্থিকভাবেও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

আয়োজক কমিটির আরেক সদস্য ও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মেলায় লটারি বিক্রির নামে প্রতিদিন অন্তত কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। এই টাকার মধ্যে তিন-চার লাখ টাকার পুরস্কার দেওয়া হয়। আর বাকি টাকায় হয় লুটপাট। মেলার আয়োজক রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের একাধিক প্রভাবশালী এই টাকা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। ফলে প্রশাসনকে প্রতিদিনের চুক্তি অনুযায়ী অর্থ দিয়ে বাণিজ্য মেলায় লটারির নামে জুয়ার আসর বসানো হয়েছে। এতে করে অনেকেই সর্বশান্তও হচ্ছেন প্রতিদিন লটারির লোভে টিকিট সংগ্রহ করে। কারণ লটারির যারা টিকিট সংগ্রহ করেন, তাদের অন্তত ৯৯ ভাগই মধ্যবিত্ত না গরিব শ্রেণির মানুষ। নিজের ভাগ্যকে বদলে দিতেই এই শ্রেণির মানুষরাই লোভে পড়ে লটারির টিকিট সংগ্রহ করেন বেশি।

গতকাল বুধবার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, নগরীর বর্ণালী মাঠের সামনেই টেবিল-চেয়ার পেতে বাণিজ্য মেলার লটারির টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। বাণিজ্য মেলায় প্রবেশের নামে এই লটারির টিকিট বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা মূল্যে। এর আগে বাণিজ্য মেলায় প্রবেশ টিকিট ছিল ৩০ টাকা করে। মেলা শেষে একদিন শুধু টিকিট সংগ্রহকারী ব্যক্তিদের কূপন নিয়ে লটারি হত। কিন্তু এবার প্রতিদিন লটারি করা হচ্ছে। যাতে করে মানুষ মেলায় না গেলেও লটারির নামে টিকিট সংগ্রহ করেন।

মেলার ফটকের একজন প্রহরী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সারাদিন বলা যায় লোকই হয় না। কিন্তু রাত নামলেই হাজার হাজার লোক ঢুকতে থাকে লটারির আশায়। তারা আগে থেকেই টিকিট সংগ্রহ করে রাখেন লটারি দেখতে। ফলে ওই সময় মানুষের ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। এরা আসে সাধারণ লটারির ফাঁদে পড়ে।’

মেলার একটি দোকানের কর্মচারী আকবর আলী বলেন, ‘এখানে স্টল দিয়ে এবার খুব ভুল করেছি। স্টল বরাদ্দের বাইরেও মেলা কমিটিকে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। কিন্তু দেখা যায়, কোনো কোনো দিন সেই চাঁদার টাকায় উঠে না। অথচ সন্ধ্যার পর পরই হাজার হাজার মানুষ আসে মেলায় লটারি দেখতে। কিন্তু তারাও কোনো কেনাকাটা করে না। কারণ লটারির আসা বেশিরভাগ মানুষই গরিব শ্রেণির। ফলে রাতেও এখানে ব্যবসা হয় না। শুধু ভিড় হয়। আর আমাদের নানা ঝামেলা পোহাতে হয়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, যে কয়দিন লটারি ছিল না, ওই কয়দিন কিছুটা হলেও সন্ধ্যার পরে মেলায় ক্রেতা সমাগম হত বেশি। এখন ক্রেতাই আসে না বলা যায়। ফলে ব্যবসা একে বারে লাটে উঠেছে। এই অবস্থায় দ্রুত লটারির নামে জুয়ার ব্যবসা বন্ধ করা উচিত।’

এদিকে নগরীর বর্ণালি মোড়ের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন অভিযোগ করে বলেন, ‘ছেলের পিইসির পরীক্ষা মধ্যেও চলছে মাইক বাজিয়ে টিকিট বিক্রি। অথচ বাড়ির পাশে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে লটারির নামে জুয়ায় মেতে উঠছে মেলা প্রাঙ্গন। ফলে ছেলের পড়া-শোনাও হচ্ছে না। আবার লটারিতে সাধারণ মানুষও প্রতারিত হচ্ছে। এই জুয়া বন্ধ হওয়া দরকার।’

এসব নিয়ে যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘আমরা আলাদাভাবে কোনো লটারি করছি না। যারা দর্শনার্থী তাদের টিকিটের ওপরই লটারি হচ্ছে। ফলে এটিকে জুয়া বলা যায় না। এখানে টাকা লুটপাটেরও কোনো সুযোগ নাই।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লটারি না থাকলে মেলায় লোক আসে না, তাই লটারি করা হচ্ছে।’
এদিকে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ইফতে খায়ের আলম বলেন, ‘লটারির নামে জুয়া চালানো হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মেলার নামে কাউকে অবৈধ পথে আয়ের সুযোগ নিতে দেওয়া যাবে না।’

রাজশাহীর সময় ডট কম০৪  নভেম্বর ২০১৮ 





© All rights reserved © 2018 rajshahirsomoy.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com