শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:২৮ পূর্বাহ্ন

সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন

সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল : কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক অন্য কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কিংবা সমাজের জন্যে ক্ষতিকর আইনবিরুদ্ধ কাজকে সাধারণত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। সমাজের সমস্যা সৃষ্টি করে ও জনগণের শান্তি বিঘিœত হয় এরকম সমাজবিরোধী কার্যকলাপকে সামাজিক অপরাধ বলে।

সম্প্রতি সামাজিক অপরাধ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গত ছয় মাসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফেনীতে আগুনে পুড়িয়ে মাদরাসাছাত্রী রাফি ও বরগুনায় প্রকাশ্যে রিফাত হত্যাকা-ের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটছে। গত এক সপ্তাহ ধরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, শিক্ষক কর্তৃক সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ ছাত্রীকে ধর্ষণ, ওয়ারীতে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, পটুয়াখালীতে মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এবং বিভিন্ন স্থানে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। মানুষের পাশবিক প্রবণতা সম্প্রতি বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই সকল ঘটনার কারণগুলো খুঁজে বের করে দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অপরাধের খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। নারী নির্যাতন, প্রকাশ্যে হত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, ধর্ষণ, পাচার, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, ইভটিজিং এবং ইভটিজিং জনিত সন্ত্রাস ও আত্মহত্যার ঘটনাগুলি এর মধ্যে অন্যতম। গত ৪ জুলাই বৃহস্পতিবার দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ধর্ষণ, হত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা ইত্যাদি কারণে দেশে প্রতি ঘন্টায় ১২জন মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। এইসব অপরাধের ঘটনা ঘটার পর অপরাধীকে ধরে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রায় সকল ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় হয়ে থাকে। পাশাপাশি উর্ধ্বতণ পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ এবং মন্ত্রীগণ বিভিন্ন বক্তব্য প্রদান করে থাকেন। থানার ওসি থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত সবার এক কথা, “অপরাধীকে ছাড়া হবে না”, “অপরাধীকে খুঁজে বের করা হবে”, “অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে”, ইত্যাদি ইত্যাদি সব কথা তারা বলেন। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে অপরাধীরা ধরা পড়লেও তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকান্ডসহ অনেক অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘ দিনপরও চিহ্নিত করা পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে না।

বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, মদদদাতাদের বিচারপ্রক্রিয়াভুক্ত না হওয়া এবং এক অপরাধের রেশ না কাটতেই আরেক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কারণে নাগরিকের মনে তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। সাধারণ অপরাধের অনেক ঘটনা তো বেআমলিই থেকে যাচ্ছে। আবার রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘ক্রসফায়ারে ও হেফাজতে’ ২০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ বরগুনার রিফাত হত্যার ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ‘ক্রসফায়ার’ সাময়িকভাবে নাগরিকের ‘স্বস্তি’র কারণ হলেও শেষ পর্যন্ত এসব আইনবহির্ভূত ঘটনা সরকার, সরকারি দল ও বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি করে। অপরাধ অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু ভয়ংকর অপরাধ করেও অধরা থাকা অথবা রাজনৈতিক প্রভাবে দ্রুত জামিন পাওয়া বা অভিযোগপত্র থেকে রেয়াত পাওয়া এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে না। ‘ক্রস ফায়ার’ও সমাধান নয়, বরং তা অপরাধের হোতাদের আড়ালে রাখার প্রয়াস বলেই আখ্যায়িত হচ্ছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সুষ্ঠু তদন্ত হলে, রাজনৈতিক প্রশ্রয়দান বন্ধ হলে ‘কঠোর’ বা ‘অবিধিত’ উপায় অবলম্বন অনাবশ্যক। এ কথা যত দ্রুত উপলব্ধিতে আসবে ততই মঙ্গলজনক।
নানা কারণে কিছু মাত্রায় অপরাধ সব সমাজেই সংঘটিত হয়। সেসব যাতে না হয়, তার জন্য সভ্যসমাজ বিচারিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। তাতে অপরাধের মাত্রা ন্যূনতম পর্যায়ে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া বা আর্থিক-সামাজিক প্রতিপত্তির কারণে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়, সেসব বন্ধ করা কঠিন কাজই বটে। বাংলাদেশে অনেক অপরাধের ঘটনা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক বাহিনীর উদাসীনতার কারণে ঘটে থাকে। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার নজিরও কম; কখনো বা তাদের নামমাত্র সাজা হয়। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সর্বোপরি সরকারের ওপর নাগরিকের আস্থাহীনতা তৈরি হয়।

আমরা প্রত্যেকেই চাই নিরাপত্তার সাথে শান্তিতে বসবাস করতে। সবচেয়ে কম অপরাধ সংঘটনের একটি সামাজিক পরিবেশে, সবচেয়ে কম ঝুঁকিসম্পন্ন একটি সমাজে বাস করার আকাংক্ষা দেশের জনগণের।
সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে নিম্নবর্ণিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন ঃ

১। সকল মানুষের সমঅধিকার, আইনগত অধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
২। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গণমাধ্যমসমূহকে সর্বদা দলমতের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।
৩। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কার্যকরভাবে অপরাধরোধ, উদঘাটন, দমন, সামাজিক শান্তি ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
৪। পুলিশ বাহিনীর সদস্য ও গণমাধ্যম কর্মীদের দক্ষ, কর্মনিষ্ঠ ও আধুনিক করে তোলার জন্যে যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫। সংশ্লিষ্ট সকলের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৬। রাজনৈতিক দলসমূহকে জনগণের বিশ্বাস কিংবা আস্থা অর্জনে সর্বদা দলমতের উর্ধ্বে উঠে মানব কল্যাণে কাজ করতে হবে।
৭। পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের জনগণের চাহিদা মোতাবেক গণমুখী ভূমিকা পালন করতে হবে।
৮। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিজ্ঞান ভিত্তিক আধুনিক অনুসন্ধান কিংবা তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতির ব্যবহার করতে হবে।
৯। দুর্নীতি দমনে সকলকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে।
১০। রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে।
১১। দেশে সুদৃঢ় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পুলিশ ও গণমাধ্যমের কার্যক্রমে সমন্বয় থাকতে হবে ।
১২। পুলিশ বাহিনী ও গণমাধ্যমকে সর্বদা নিরপেক্ষ, সততা ও নিষ্ঠার সাথে স্বীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে।
১৩। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিরসন করতে হবে।
১৪। অপরাধীকে রাজনৈতিকভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া বন্ধ করতে হবে।
১৫। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
১৬। দেশে শক্তিশালী গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
১৭। বিচার বিভাগ, প্রশাসনসহ সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হবে।
১৮। মানুষের মানবিক গুণাবলি ও নৈতিকতা বিকশিত ও প্রসারিত করতে হবে।
১৯। প্রত্যেকের মধ্যে দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ ও মমতাবোধ জাগ্রত করতে হবে।
২০। দেশীয় নান্দনিক সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে হবে।
২১। প্রত্যেককে সততা, দেশপ্রেম ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে জীবন যাপন করতে হবে।
২২। শিক্ষাক্রমে ও পাঠ্যপুস্তকে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার বিষয়াদি অধিক লিপিবদ্ধ করতে হবে।
২৩। সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে কাজ করতে হবে।
২৪। ফেইসবুক, ইউটিউব, টুইটার ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লিলতা বন্ধসহ শিশু, কিশোর ও তরুণদের জন্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
২৫। দেশীয় খেলাধূলা ও সাহিত্য চর্চা বাড়াতে হবে।
২৬। সামাজিক অপরাধীদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
২৭। মানুষের সামাজিক মর্যাদা, সাম্য ও ন্যায্যতা সুনিশ্চিত করতে হবে।
২৮। মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থানসহ মানবাধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।
২৯। অপরাধের কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে।
৩০। মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩১। স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সৎ ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদেরকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে হবে।
৩২। নির্ভীক ও সাহসিকতার সাথে সৎকাজকে উৎসাহিত ও অসৎকাজকে নিরুৎসাহিত করাসহ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে।
৩৩। শিশুদেরকে সুশিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধে জাগ্রত করে গড়ে তুলতে হবে।
৩৪। পিতা-মাতা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্তানাদিসহ আত্মীয় স্বজনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৩৫। প্রতিবেশীসহ সমাজের প্রত্যেকের মধ্যে পারস্পরিক সু-সম্পর্ক দৃঢ় ও জোরদার করতে হবে।
৩৬। বিদ্যমান আইনের যথযথ প্রয়োগ ও প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে।
৩৭। সামাজিক অপরাধের বিচার যাতে কোনোভাবে বিলম্বিত না হয়, সে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সামাজিক অপরাধের বিচার করে অপরাধিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৩৮। নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক চরিত্র সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে চরিত্রবানদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষক হিসেবে কর্মরতদের চরিত্র ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়ে নিয়মিত তদারকি থাকা আবশ্যক।
৩৯। দেশের সর্বস্তরের বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

মানুষ সামাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে ভালোবাসে। এই সমাজকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখতে সমাজের প্রত্যেককে স্বীয় দায়িত্ব সততা, স্বচ্ছতা ও দেশপ্রেমের সাথে পালন করতে হবে। প্রত্যেকের মধ্যে পারস্পরিক কল্যাণবোধ, মমতোবোধ, দেশপ্রেম জাগ্রত করতে হবে। আসুন আমরা মানবতার কল্যাণে জনহিতকর কাজে সর্বদা অংশগ্রহণ করি।
সকলকে ধন্যবাদ

লেখক পরিচিতি :
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কলাম লেখক, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক)
সভাপতি, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি 

রাজশাহীর সময় ডট কম১১ জুলাই ২০১৯





© All rights reserved © 2018 rajshahirsomoy.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com