মঙ্গলবার, ১৬ Jul ২০১৯, ০২:৩৪ অপরাহ্ন

ওয়াসার প্রতি অনাস্থায় জমে উঠেছে পানি বাণিজ্য

ওয়াসার প্রতি অনাস্থায় জমে উঠেছে পানি বাণিজ্য

রাজশাহীর সময় ডেস্ক : দুই-আড়াই দশক আগেও ঢাকার রাস্তায় জগ-গ্লাস হাতে পথশিশুদের দেখা যেত ‘কলের পানি’ বিক্রি করতে। দাম জিজ্ঞেস করলে বলত, ‘খুশি হইয়া যা দ্যান।’ পানির দাম চাইতে এ পথশিশুদেরও সংস্কারে বাঁধত। এখন অবশ্য সেই ‘আড়’ ভেঙে গেছে। এখন অন্য দশটা পণ্যের মতো পানিও বিক্রি হয় দাম ধরে। শহরে ট্যাপের পানির ওপর আস্থা নেই, গ্রামে নলকূপের পানিতে আর্সেনিকভীতি।

এই অবিশ্বাস আর ভীতিকে পুঁজি করেই দিনে দিনে জমে উঠেছে পানি বাণিজ্য। সারা দিন নানা ভেজাল খাবার খেলেও পানি নিয়ে সচেতনতা, সতর্কতার কমতি নেই কারো। তাই বোতল বা জারে ভরা পানির প্রতি ঝুঁকেছে মানুষ। হাত বাড়ালেই হরেক কম্পানির পানির বোতল—ফুটপাতে, দোকানে, অফিসে পানির জার, যা এখন বাসাবাড়িতেও স্থান করে নিচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, খাওয়া, রান্না ও পরিচ্ছন্নতার কাজে একজন মানুষের দৈনিক ৫০ থেকে ১০০ লিটার পানি লাগে। সেই পানি কতটুকু নিরাপদ হবে তার একটা নীতিমালা ঠিক করে দিয়েছে সংস্থাটি, যার ভিত্তিতে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের পানির মান নির্ধারণ করে। ইউএনডিপির মতে, পানির দাম পরিবারের আয়ের ৩ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়।

সরকারি সংস্থা বিবিএসের হিসাবে বাংলাদেশে মাথাপিছু গড় আয় মাসে তিন হাজার ৯৪০ টাকা, পরিবারের গড় আয় ১৫ হাজার ৯৮৮ টাকা। পারিবারিক ব্যয় মাসে ১৫ হাজার ৭১৫ টাকা। এর মধ্যে খাদ্যবাবদ ব্যয় হয় সাত হাজার ৪৯৬ টাকা (৪৭.৭%)।

রাজধানীর রাজাবাজার এলাকার একটি পরিবারে এপ্রিল মাসে পানির বিল এসেছে ৭২৩ টাকা। বিবিএসের গড় আয়ের হিসাবে পানিবাবদ পরিবারটির ব্যয় খাদ্য ব্যয়ের ৯.৬৪ শতাংশ। আর গড় মাসিক আয়ের ৪.৫৫ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের মানুষের গড় মাসিক আয় বাংলাদেশের প্রায় ১২ গুণ। সেখানে পাঁচজনের একটি পরিবারে সরবরাহ করা পানির খরচ পড়ে এই আয়ের মাত্র ০.৩০ শতাংশ।

জানা গেছে, বাসস্থানে ব্যবহারের জন্য ওয়াসাকে নির্দিষ্ট হারে পানির দাম দিতে হচ্ছে। এর পরও বিশুদ্ধ পানির জন্য বাসায় ফিল্টার বসাতে হচ্ছে। অফিসে জার কিনতে হচ্ছে। বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পথচারীদের। জনসমাগমের স্থলে উন্মুক্ত ট্যাপে পানির ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। ফলে কিনতে হয় বোতল বা জারের পানি। আধা লিটার বোতলের পানি কিনতে খরচ হচ্ছে ১৫ টাকা। রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষ ফুটপাতের দোকানের জারের পানি খায়। প্রতি গ্লাসের জন্য দিতে হয় এক টাকা। এখন অনেক জায়গায় দুই টাকাও নেওয়া হচ্ছে; যদিও এসব পানির মান নিশ্চিত নয়।

পানির পেছনে এভাবে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ব্যক্তির ব্যয়, পারিবারিক ব্যয়। অধিকারকর্মীরা বলছেন, পানি বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি সেবা। রাষ্ট্রকেই সাধারণ মানুষের জন্য এ সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

মগবাজার মোড়ের এক চায়ের দোকানে আবু মিয়া নামের এক রিকশাচালক এই প্রতিবেদককে জানান, গরমের মধ্যে একটানা বেশিক্ষণ রিকশা চালানো যায় না। দুই-তিনটি ট্রিপ দেওয়ার পরই ১০-১৫ মিনিটের বিশ্রাম দরকার পড়ে। এই সময়ে কমপক্ষে দুই গ্লাস পানি, একটা কলা বা একটা রুটি খেতে হয়। এভাবে রিকশা চালানোর সময়টাতেই প্রতিদিন ১০-১২ গ্লাস পানি খাওয়া পড়ে। প্রতি গ্লাস পানির দাম এক টাকা করে হলে দিনে খরচ পড়ছে ১০-১২ টাকা।

আবু মিয়া মাসের ২৭-২৮ দিন রিকশা চালান। অর্থাৎ মাসে তাঁকে ৩০০ টাকার ওপর খরচ করতে হচ্ছে রাস্তায়ই শুধু পানিবাবদ। তিনি রাতে যেখানে ঘুমান সেখানেও বিভিন্ন খরচের সঙ্গে পানির একটি খরচ পরিশোধ করেন। প্রতিদিন রিকশার গ্যারেজের জমাখরচ বাদ দিয়ে তাঁর আয় থাকে ৫০০-৬০০ টাকা। অর্থাৎ মাসে তাঁর আয় হয় ১৪-১৬ হাজার টাকা।

ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আশরাফুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে যতক্ষণ অবস্থান করেন ততক্ষণ পানি নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পানির জোগান দেয়। কিন্তু যখনই বাইরে চা-নাশতা খেতে যান, তখন তিনি পানির বোতল কেনেন। কারণ দোকানের জারের পানির মানের ওপর তাঁর ভরসা কম। মাসে ২০ দিনের মতো ক্লাস করতে হয়। প্রতিদিনই বাইরে থাকাকালীন তিনি অন্তত আধা লিটারের একটি পানির বোতল কেনেন। সে হিসাবে বাড়তি ৩০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এর বাইরে তাঁকে মেসে পানির বিল পরিশোধ করতে হয়। আশরাফুল বলেন, ‘পানির পেছনে বাসার একটা নির্দিষ্ট খরচ আছে। বাইরে বের হলে খরচ আরো বেড়ে যায়। কোনো কোনো দিন তো আধা লিটার করে দুই-তিনবার পর্যন্ত পানি কিনতে হয়।’

বারিধারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি করপোরেট অফিসের এইচআর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের খাওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকার পানির জার কেনা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৬৫০-৭০০ টাকার পানির প্রয়োজন পড়ে অফিসটিতে। নাম প্রকাশ না করে অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বড় অফিস, কর্মীদের খাওয়ার জন্য ভালো মানের পানিই নিতে হচ্ছে। আনুষঙ্গিক অনেক খরচের মধ্যে এটা একটা বড় খরচ।’

ওয়াসার পানির ওপর মানুষের আস্থা কম থাকায় ঢাকায় এখন পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের হরদম বেচাকেনা হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে সারা দেশেই বিস্তার লাভ করছে। বাজারে জমজমাট ব্যবসা করে যাচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পানি। বোতলজাত পানির ব্যবসার ভবিষ্যৎ ভালো দেখে আড়াই বছর আগে নামকরা একটি বহুজাতিক কম্পানি পানির ব্যবসা শুরু করে। বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট) জারে পানি ব্যবসার জন্য বিভিন্ন কারখানার লাইসেন্স প্রদান করলেও এখনো শতভাগ মানের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। দামের বিষয়টিও নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির হাতে নেই। এসব কারণেই মানুষ এক ধরনের জিম্মিদশার মধ্যে রয়েছে।

তবে এর থেকে বের হওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি বেশ পুরনো। কারণ ঢাকার কোথাও সহজলভ্য নয় বিশুদ্ধ খাবার পানি।

এদিকে বছর দুয়েক হলো ঢাকার ১৬০টি পাম্পে ওয়াসা পানির এটিএম বুথ বসিয়েছে। এলাকাভিত্তিক বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন মেটাতে এই এটিএমগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে জানা গেছে। প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে ৪০ পয়সা লিটার হিসাবে পানি কিনছে এসব এলাকার মানুষ।

এটিএম কার্ডের মাধ্যমে এলাকাবাসীর জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থাকে স্বাগত জানিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করব নাকি এটি বাণিজ্যিকভাবে ছেড়ে দেব। অর্থায়নের সময় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-আইএমএফের শর্তই থাকে পানি সেবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার। আর হাজার কোটি টাকা বাজেট নিয়ে ওয়াসা তাদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছে কি না দেখতে হবে। ওয়াসার বোতলজাত পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ওয়াসা নিজেই বোতল পানির ব্যবসা করে নিজেই জানান দিচ্ছে তার ট্যাপের পানি নিরাপদ নয়। হোটেল-রেস্তোরাঁয় আগেই বোতলজাত পানি গছিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আইন দাবি করে এই রাজনীতিক বলেন, গ্রাহককে এমনিতেই নিরাপদ পানি তারা দেবে। যদি কেউ বোতলজাত পানি চায় তাহলেই তাকে দেবে।সূত্র:কালের কণ্ঠ।

ওয়াসার সরবরাহ করা পানির নিম্নমানের কারণে বিশুদ্ধ পানির জন্য জনগণের ব্যয় বেড়ে যাওয়া নিয়ে সংস্থাটির এমডির মন্তব্য পাওয়া যায়নি তিনি ছুটিতে থাকায়। অন্য কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পানির মান নিয়ে ভুল তথ্য রয়েছে অনেকের মধ্যে। তাই অনেকে আশঙ্কার জায়গা থেকে পানি ফুটিয়ে পান করতে চায় বা কিনে খেতে চায়। তবে পানির দাম সীমিত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি আমরা।’

রাজশাহীর সময় ডট কম১১ জুলাই ২০১৯





© All rights reserved © 2018 rajshahirsomoy.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com