শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:৩০ পূর্বাহ্ন

সুতা ও ক্রুশের মিলিত বন্ধনেই নারীরা প্রতিষ্ঠিত

সুতা ও ক্রুশের মিলিত বন্ধনেই নারীরা প্রতিষ্ঠিত

জিএম মিজান, বগুড়া প্রতিনিধি: বগুড়ার দই, মিষ্টির পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রপাতি, মাঠে উৎপাদিত কাঁচামাল যেমন দেশব্যাপী বিখ্যাত হয়েছে তেমনি সাম্প্রতিক সময়ে হস্তশিল্পের কারুকার্যও প্রশংসা কুড়িয়েছে। বগুড়া শহর এবং এর আশেপাশের গ্রামগঞ্জের অনেক পরিবার তাদের উপার্জনের প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন হস্তশিল্পকে। গালিচা,শাড়ি, বিছানার চাদর, টি-শার্ট এর পাশাপাশি নান্দনিক জালিটুপি সবার নজর কেড়েছে। নিপুণ হাতের ছোঁয়া আর সুতা ও ক্রুশের মিলিত বন্ধনেই তৈরি হচ্ছে নানা রংয়ের রকমারি টুপি। এই টুপি দেশের সীমানা পেরিয়ে এখন বিদেশের মাটিতে। যা থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক অর্থ আয় হচ্ছে। ভাগ্যের সঙ্গে দেশীয় অর্থনীতির চাকাও বেশ জোরোসোরেই ঘুরছে।

শুধু তাই নয়, কারিগরদের তৈরি টুপি দেশের গ-ি পেরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। এক সময়ের ফেরি করে বিক্রি হওয়া এ টুপি এখন বিক্রি হচ্ছে দেশ-বিদেশের বড় বড় মার্কেটে। চীন এবং পাকিস্তানের তৈরি টুপির মাঝে আলাদা আসন করে নিয়েছে বগুড়ার শেরপুরের টুপি। ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে বগুড়ার শেরপুরের চকধলি গ্রামের কয়েকজন নারী টুপি তৈরির উদ্যোগ নেন। শেফালি বেগম তাদের অন্যতম একজন। এ দলের নারীরা টুপি তৈরিতে সফল হওয়ার পর আশপাশের গ্রামের নারীরাও আস্তে আস্তে এ হস্ত শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বাণিজ্যিকভাবে প্রথমে শেরপুর উপজেলার কল্যাণী গ্রামের নারীরা টুপি তৈরি শুরু করেন। এতে কর্মসংস্থান হয়েছে লক্ষাধিক নারীর। এসব নারীরা সংসারের অন্যান্য কাজের ফাঁকে টুপি বুননের কাজ করে থাকেন। এ কাজ করে অনেক অসচ্ছল পরিবার অর্থনৈতিক ভাবে সচ্ছল হয়েছেন।

জরিপে দেখা গেছে এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের ৯৫ শতাংশই নারী। এসব নারীদের কোনো একাডেমিক প্রশিক্ষণ নেই। বোহালগাছা গ্রামের কুলসুম বিবি, টুবলি, হ্যাপি, রানা, শিরিন আকতার জানান, তারা জন্মের পর থেকেই নিজেকে টুপি বানানোর পেশার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাদের মতে, বাড়িতে কর্মহীন হয়ে বসে থাকার চেয়ে কিছু একটা করাই ভাল। এমন ভাবনা এবং বংশীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করতে অনেকেই টুপি তৈরির শিল্পের সঙ্গে নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলেছেন।

তারা আরো জানান, গ্রামের স্কুল পড়ুয়া ছোট ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়ার পাশাপাশি টুপি তৈরি করে থাকে। এছাড়া গ্রামের গৃহবধূরা সাংসারিক কাজের ফাঁকে টুপি বানিয়ে থাকেন। তা থেকে বেশ ভাল আয়ও করেন তারা। বিশেষ করে প্রতি বছর রমজানে টুপি তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। তারা জানান, বিভিন্ন এলাকার ব্যাপারীরা বাড়ি গিয়ে সুতা দিয়ে থাকেন। পরে সুতার দাম কেটে রেখে অবশিষ্ট টাকা দিয়ে টুপি কেনেন। তারা আরো জানান, ব্যাপারীরা বাড়িতে গিয়ে সুতার ববিন দিয়ে আসেন এবং টুপি তৈরি শেষ হলে নিজেরাই খরিদ করে থাকেন। ওইসব রকমারি টুপি তারা ঢাকার মহাজনদের নিকট বিক্রি করেন। সেখান থেকে ওইসব টুপি দেশের গ-ি পেরিয়ে বিদেশেও চলে যায়।

ব্যবসায়ীরা জানান, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, নওগাঁ, দিনাজপুর, এবং সর্ব উত্তরের তেঁতুলিয়ার নারীরাও টুপি তৈরির কাজে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছেন।বগুড়ার শেরপুর, শাজাহানপুর, বগুড়া সদর আর রাজধানীর তাঁতী বাজারের টুপি ব্যবসায়ীরা শেরপুর-ধুনটের টুপিকে কেন্দ্র করে জমজমাট ব্যবসা করে যাচ্ছেন। এসব টুপি রাজধানীসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশেও রফতানি হয়।

উদ্যোক্তারা জানান, বগুড়ার গ্রামাঞ্চল থেকে প্রতিটি টুপি ৫০-৬০ টাকা দরে কিনে ঢাকায় ১০০-১৫০ টাকায় বিক্রি করেন। নারী হস্তশিল্পীদের তৈরি এসব টুপির নামকরণ করা হয়েছে বিভিন্নভাবে। যেমন-আনারস টুপি, গাছফুল টুপি, মাকড়সা টুপি, বিস্কুট টুপি, পাঁচ পয়সা এবং কদম ফুল টুপি উল্লেখ যোগ্য। এক সময় তারা ক্রুশকাঠি ও সুতা কিনে টুপি সেলাই করে বিভিন্ন ভাবে বিক্রি করতেন। এজন্য খুব একটা ভালো দাম পেতেন না। এখন তারা সংগঠনের মাধ্যমে টুপি বিক্রি করেন। ফলে পাইকাররা বাড়ি থেকেই টুপি কিনে নিয়ে যায় এবং কাঁচামালও তারাই সরবরাহ করে থাকেন। অনেক অসচ্ছল পরিবারের নারীরাসহ স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েরাও সংসারের খরচ মেটাতে টুপি সেলাইয়ের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। অনেক মেয়েই টুপি বানিয়ে লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন।

এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা বলেন, তারা স্বল্প আয়ের মানুষ। তাই সব সময় কম-বেশি পুঁজির অভাব লেগেই আছে। তাছাড়া সব কিছুর দামও বাড়তি। সুতার দামও আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় যথেষ্ট পুঁজির ব্যবস্থা করা গেলে টুপি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব বলে তারা মনে করেন।

রাজশাহীর সময় ডট কম২৫   মে ২০১৯





© All rights reserved © 2018 rajshahirsomoy.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com