শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৯, ১২:১৯ অপরাহ্ন

হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে রাজশাহীতে কৃষি জমিতে পুকুর খননের হিড়িক

হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে রাজশাহীতে কৃষি জমিতে পুকুর খননের হিড়িক

রাজশাহীর সময় ডেস্ক : রাজশাহীতে ফসলি জমিতে অবাধে চলছে পুকুর খনন। মাছ চাষের জন্য উর্বর কৃষিজমি ভাড়া নিয়ে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর-দিঘি খনন করায় একদিকে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে ধানচাষসহ অন্যান্য ফসলের আবাদও কমে গেছে।

এ ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনাও তোয়াক্কা করছে না কেউ। রাজশাহীর প্রশাসনও যেন চোখে আঙুল দিয়ে বসে আছে। মুখে কুলুপ পরিবেশ অধিদফতরেও। ভুক্তভোগীরা বলছেন, জেলার সর্বত্রই চিংড়ি ঘেরের আদলে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী কৃষিজমি খনন করে মাছচাষ করছেন।

রাজশাহী কৃষি বিভাগ বলছে, কয়েক বছর ধরেই রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, তানোর, বাগমারা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, মোহনপুর, বাঘা ও চারঘাট এলাকায় ফসলি জমিতে পুকুর-দিঘি খননের হিড়িক পড়ে গেছে। প্রতি বছরই ছোট বড় এক হাজার পুকুর কাটা হচ্ছে। গত ৮ বছরে নতুন পাঁচ হাজার পুকুর কাটা হয়েছে। এসব পুকুরের কারণে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এছাড়া সহস াধিক ইটভাটায় খেয়ে ফেলেছে আরও সাত হাজার হেক্টর কৃষিজমি। যেটুকু কৃষিজমি রয়েছে তাতে ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও জলাবদ্ধতায় ফসল উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।

কথা হয় রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সামশুল হকের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বেশির ভাগ পুকুর কাটা হয়েছে নিষ্কাশন নালা, জলাধারের ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ করে। ফলে কম বৃষ্টিতেই পুকুর-দিঘি সংলগ্ন কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে হাজার হাজার হেক্টর উর্বর ফসলি জমিতে ফসল ফলাতে পারছে না চাষীরা। এর ফলে ধান, পাট, গম, আলু, সবজি, মরিচ, সরিষা, পেঁয়াজ ও রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী পানেরও উৎপাদনই কমছে না গবাদিপশুর বিচরণ ভূমিও নষ্ট হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন সভায় কৃষি বিভাগ থেকে এসব বিষয়ে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও বন্ধ হয়নি পুকুর কাটা।

এ অঞ্চলে বোরো ও আমনের আবাদ যে কমছে কৃষি তথ্য বিভাগের পরিসংখ্যানেই তার প্রমাণ মিলছে। ২০১৬ সালে ৭৬ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হলেও ২০১৭ সালে ৭৩ হাজার ৯৩৭ হেক্টর এবং ২০১৮ সালে ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয় এবং ২০১৯ সালে কমে ৬৬ হাজার হেক্টরে গিয়ে ঠেকে। অর্থাৎ ৪ বছরেই বোরো আবাদের জামি কমেছে ১০ হাজার হেক্টর। একইভাবে ২০১৬ সালে আমানের আবাদ হয় ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে এবং ২০১৮ সালে তা কমে ৭৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

এ নিয়ে হাইকোর্টের আদেশের পর জেলা-উপজেলা প্রশাসন পুকুর খনন বন্ধে এলাকায় মাইকিং করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে ম্যানেজ করেই সিন্ডিকেট এই কাজ করে যাচ্ছে।

পবা উপজেলার পারিলা ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল বারী বলেছেন, প্রশাসনের মদদেই পুকুর কাটা চলছে। আমার ইউনিয়নের অর্ধেক জমি পুকুরের পেটে চলে গেছে। বাকি যা আছে তাও পুকুরের পেটে যাচ্ছে। খননকারীরা স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে ম্যানেজ করেই এসব করছে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদ নেওয়াজ বলেন, পুকুর কাটা বন্ধে অব্যাহতভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে ঢালাও পুকুর কাটার কুফল সম্পর্কেও জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। এতে প্রশাসনের মদদ নেই বলে দাবি করেন তিনি। হাইকোর্টের আদেশের বিষয়ে পৃথক নোটিশ জারির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। রাজশাহীর জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের বলেন, আমরা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করছি অবৈধভাবে পুকুর কাটা বন্ধে। আমরা এজন্য স্থানীয় এমপিসহ সচেতন মানুষের সহযোগিতা নিচ্ছি। আশা করি অচিরেই অবৈধ পুকুর কাটা বন্ধে সক্ষম হবো।

মানবাধিকার আইনজীবী মেজবাহুল ইসলাম আসিফ বলেন, নির্বিচারে মাছ চাষের জন্য পুকুর কাটার এবং ইটভাটার কারণে এলাকার পরিবেশ হুমকির মুখে। রাজশাহীর সমৃদ্ধ কৃষিক্ষেত্র বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে রাজশাহীতে কৃষিজমি আর অবশিষ্ট থাকবে না।যুগান্তর। 

রাজশাহীর সময় ডট কম১৪ এপ্রিল ২০১৯





© All rights reserved © 2018 rajshahirsomoy.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com